মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থী ও বাংলাদেশের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর চলতি বছরের জরুরি চাহিদা মেটাতে ৭১ কোটি ৫ লাখ মার্কিন ডলারের সহায়তা চেয়েছে জাতিসংঘ ও এর অংশীদাররা। গতকাল বুধবার জাতিসংঘের প্রকাশিত যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনায় (জেআরপি) ২০২৬ সালের জন্য এই সহায়তার আহ্বান জানানো হয়।
পরিকল্পনার বিস্তারিত তুলে ধরে জাতিসংঘের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, নতুন এই পরিকল্পনা ‘অত্যন্ত অগ্রাধিকারভিত্তিক এবং সীমিত পরিসরের’। এর মাধ্যমে শরণার্থী এবং বাংলাদেশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীসহ প্রায় ১৫ লাখ ৬০ হাজার মানুষের কাছে সহায়তা পৌঁছানো হবে। ‘৭১ কোটি ৫ লাখ মার্কিন ডলারের এই আবেদনটি ২০২৫ সালের তুলনায় ২৬ শতাংশ কম, এটি জীবন রক্ষাকারী সহায়তা বজায় রাখার জন্য শুধু ন্যূনতম প্রয়োজনটুকু মেটাবে বলে জানানো হয়েছে।
৭১ কোটি ৫ লাখ মার্কিন ডলারের মধ্যে খাদ্যের জন্য ২৪ কোটি ৭৩ লাখ, বাসস্থানের জন্য ১২ কোটি ৮ লাখ কোটি, পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধির জন্য ৬ কোটি ১২ লাখ, শিক্ষার জন্য ৫ কোটি ২৭ লাখ, স্বাস্থ্যের জন্য ৪ কোটি ৯৯ লাখ এবং জীবিকা ও দক্ষতা উন্নয়নের জন্য ৩ কোটি ৫১ লাখ মার্কিন ডলার রাখার কথা বলেছে জাতিসংঘ। এই সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সহায়তায় সব খাত মিলিয়ে ৩ কোটি ৬২ লাখ ডলার খরচের পরিকল্পনা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে জেআরপিতে। এই আবেদনে ৫২টি বাংলাদেশি সংস্থাসহ ৯৮টি মানবিক অংশীদার সমর্থন জানিয়েছে।
সহায়তার আহ্বান জানিয়ে বলা হয়, রোহিঙ্গা সংকটের সবচেয়ে কাক্সিক্ষত ও টেকসই সমাধান হলো শরণার্থীদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদে, মর্যাদার সাথে এবং টেকসইভাবে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন। এই সহায়তা কেবল মানবিক দায়িত্বই নয়, বরং মানবাধিকার রক্ষা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং শরণার্থী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠী যেন অবহেলিত না হয় তা নিশ্চিত করার জন্যও জরুরি।
২০১৭ থেকে ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রোহিঙ্গা সংকটে মানবিক সহায়তা হিসেবে প্রায় ৫৪২ কোটি মার্কিন ডলার দিয়েছে। যেখানে যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বড় দাতা হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে।
জেআরপি প্রকাশের অনুষ্ঠানে জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) ডেপুটি হাই কমিশনার কেলি টি. ক্লেমেন্টস বলেন, ‘যেহেতু সম্পদ সীমিত হয়ে আসছে, তাই শরণার্থীদের দক্ষতা ও সহনশীলতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করা আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ’।
তিনি আরও বলেন, ‘রোহিঙ্গারা নিরাপদে নিজ দেশে ফিরে গিয়ে সেখানে নিজেদের সমাজ নতুন করে গড়তে পারার আগ পর্যন্ত, তারা এখন যেখানে আছে সেখানেই তাদের নিরাপত্তা, যতœ এবং মর্যাদা প্রদান আমাদের অব্যাহত রাখতে হবে।’
ঢাকার জাতিসংঘ ভবনে এই পরিকল্পনা উপস্থাপন অনুষ্ঠানে ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্র সচিব এম ফরহাদুল ইসলাম, জাতিসংঘের অন্তর্বর্তীকালীন আবাসিক সমন্বয়কারী ক্যারল ফ্লোর, জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) পার্টনারশিপ অ্যান্ড ইনোভেশনবিষয়ক অ্যাসিস্ট্যান্ট এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর রানিয়া দাগাশ-কামারা এবং ইউএন উইমেনের ডেপুটি এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর নিয়ারাদজাই গুম্বনজভান্দা উপস্থিত ছিলেন।
রোহিঙ্গাদের শিগগির ফেরার আশা ‘ম্লান হয়ে যাচ্ছে’ : মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর অভিযানের মুখে ২০১৭ সালের ২৫ অগাস্ট বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী রাখাইন রাজ্য থেকে রোহিঙ্গাদের ঢল শুরু হয়। বাংলাদেশ সীমান্ত খুলে দেওয়ার পর থেকে কক্সবাজার ও উখিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে বাঁশ আর প্লাস্টিকের খুপড়ি ঘরে বসবাস শুরু করে রোহিঙ্গারা। উখিয়ার কুতুপালং পরিণত হয় বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী শিবিরে। প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা এখন সেখানে বসবাস করছে। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে রাজি হলেও সেখানকার পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় প্রত্যাবাসন শুরু করা যায়নি।
জাতিসংঘের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, রাখাইন রাজ্যের ভেতরে সংঘাত অব্যাহত থাকায়, খুব শিগগিরই তাদের মিয়ানমারে ফেরার আশা ম্লান হয়ে যাচ্ছে। পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় আরও বেশি শরণার্থী মরিয়া হয়ে নানা পথ বেছে নিচ্ছেন।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন