ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বসবাসরত জাতিগত বাঙালি, বিশেষ করে মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষকে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। গত মঙ্গলবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সংস্থাটি জানায়, বিএসএফের এ ধরনের পদক্ষেপ এবং বিজিবির বাধার কারণে বহু পরিবার দুই দেশের সীমান্তের মধ্যবর্তী ‘জিরো লাইনে’ আটকা পড়ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১ জুন থেকে বিএসএফের ২১টি পুশইন প্রচেষ্টা প্রতিহত করেছে বিজিবি। এসব ঘটনায় শিশুসহ ২০০ জনের বেশি মানুষকে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় পাঠানোর চেষ্টা করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে মার্চের নির্বাচনে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ‘ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট’ নীতির আওতায় শত শত ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’কে আটক এবং প্রায় ৫ হাজার মানুষকে ফেরত পাঠানোর দাবি করেছেন।
এইচআরডব্লিউর এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ পরিবারগুলোকে নির্মমভাবে বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে বা সীমান্তে আটকে রেখে তাদের মৌলিক অধিকার উপেক্ষা করছে। তার মতে, ভারতকে অবৈধ বহিষ্কার বন্ধ করতে, নাগরিকত্ব যাচাইয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে সমন্বয় করতে এবং মুসলমানদের প্রতি বৈরিতামূলক আচরণের অবসান ঘটাতে হবে।
এইচআরডব্লিউ ৯ জন প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষাৎকার নিয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিএসএফ সদস্যরা গভীর রাতে দলবদ্ধভাবে মানুষকে সীমান্তে এনে কাঁটাতারের ফাঁক দিয়ে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে বিজিবি বাধা দিলে পরে তাদের আবার ভারতে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।
প্রতিবেদনে পঞ্চগড়ের একটি ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে গত ৫ জুন শিশুসহ ১০ জনকে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা হলে প্রায় ৭৫ ঘণ্টার অচলাবস্থা তৈরি হয়। স্থানীয় বাসিন্দা রুবেল হোসেন জানান, দলটি বাংলাদেশের ভেতরে প্রায় ৫০ ফুট ঢুকে পড়েছিল। বিজিবি পৌঁছানোর পর তারা নো ম্যানস ল্যান্ডে অবস্থান নেয়। প্রথম রাতে তারা বজ্রপাত ও ভারি বৃষ্টির মধ্যে খোলা আকাশের নিচে ছিল এবং দ্বিতীয় দিনে বিএসএফ কিছু শুকনো খাবার দেয়। একাধিক পতাকা বৈঠক ব্যর্থ হওয়ার পর বিএসএফ তাদের ফিরিয়ে নেয়।
গত ৬ জুন ভোরে দুই মুসলমান বাঙালি পরিবারের ছয় সদস্যÑ তিন পুরুষ, দুই নারী ও এক শিশুকে তেঁতুলবাড়িয়া সীমান্তে ঠেলে দেওয়া হয়। বিজিবি প্রবেশে বাধা দিলে এবং বিএসএফও ফিরে যেতে না দেওয়ায় তারা রাতভর সীমান্তে আটকে থাকে। পরে তাদের ভারতে ফিরতে দেওয়া হয়। একইভাবে ৮ জুন ঠাকুরগাঁও সীমান্তে ১১ জন, যাদের মধ্যে এক গর্ভবতী নারী ও তার সন্তান ছিলেন, প্রায় ৪৮ ঘণ্টা জিরো লাইনে আটকে থাকার পর বিএসএফ তাদের ফিরিয়ে নেয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধনে ৯০ লাখের বেশি মানুষের নাম বাদ পড়ে, যা আটক ও বহিষ্কারের আশঙ্কা বাড়িয়েছে। এর আগে ২০১৯ সালে আসামের বিতর্কিত নাগরিকত্ব যাচাই প্রক্রিয়ায় ১৯ লাখের বেশি মানুষ রাষ্ট্রহীনতার ঝুঁকিতে পড়ে এবং বহু বাংলা ভাষাভাষী মানুষ আটক ও বহিষ্কারের শিকার হয়।
আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা বারবার বাংলা ভাষাভাষী মুসলমানদের ‘অবৈধ অভিবাসী’ বলে উল্লেখ করেছেন। সম্প্রতি তিনি বলেন, সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় নিয়ে গিয়ে তাদের সীমান্তের ওপারে পাঠানো হচ্ছে এবং এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে অনেকেই নিজেরাই ফিরে যেতে শুরু করেছে।
পঞ্চগড় সদর উপজেলার ইউপি সদস্য হাসিবুল ইসলাম জানান, পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ির একটি পরিবারের সঙ্গে তার কথা হয়েছে, যাদের কাছে আধার কার্ড ছিল। পরিবারের সবচেয়ে বয়স্ক সদস্য চারবার ভোটও দিয়েছেন। কিন্তু ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ায় তারা ভোট দিতে পারেননি। পরে পুলিশ তাদের আটক করে বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করে এবং বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা করে। তিন দিন সীমান্তে আটকে থাকার পর তারা ভারতে ফিরে যেতে সক্ষম হন।
এইচআরডব্লিউর তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন আটককেন্দ্রে শত শত কথিত অনিয়মিত বাংলাদেশি অভিবাসীকে রাখা হয়েছে। তাদের অধিকাংশ মুসলমান হলেও কিছু হিন্দুও রয়েছেন। এক ভারতীয় অধিকারকর্মীর দাবি, সীমান্তবর্তী আটক কেন্দ্রগুলোতে প্রায় ৪০০ মানুষ আটক আছেন এবং তাদের অনেককে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার পর আটক করা হয়েছে। তার মতে, ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া এখন গ্রেপ্তার, আটক ও বহিষ্কারের অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে।
ভারতীয় কর্তৃপক্ষ বলছে, অবৈধভাবে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের স্বেচ্ছায় দেশে ফেরার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। তবে এইচআরডব্লিউর মতে, স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসন গ্রহণযোগ্য হলেও জোরপূর্বক বহিষ্কার আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতির পরিপন্থি। সংস্থাটি আরও বলেছে, কয়েকজন ভুক্তভোগীর অভিযোগ অনুযায়ী তাদের পরিচয়পত্র, অর্থ ও ব্যক্তিগত সামগ্রীও কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ সরকার জানিয়েছে, আইনগত প্রক্রিয়া ছাড়া সীমান্ত দিয়ে ঠেলে পাঠানো কাউকে গ্রহণ করা হবে না। পরিচয় যাচাই ও বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই কাউকে ফেরত পাঠাতে হবে। এইচআরডব্লিউ বলেছে, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে এ ধরনের ব্যবস্থা থাকলেও তা উপেক্ষা করায় বহু মানুষ দুই সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মাঝখানে আটকা পড়ে মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
সংস্থাটির মতে, আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদ এবং জাতিগত বৈষম্য বিলোপবিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদের অধীনে ভারত সবার অধিকার রক্ষায় বাধ্য। যথাযথ প্রক্রিয়া ছাড়া আটক বা বহিষ্কার মানবাধিকার লঙ্ঘন। একইভাবে খাদ্য, পানি, আশ্রয় বা চিকিৎসাসেবা ছাড়া মানুষকে সীমান্তে ফেলে রাখা নিষ্ঠুর ও অমানবিক আচরণের শামিল হতে পারে।
এইচআরডব্লিউ বলেছে, বহিষ্কারের মুখে থাকা ব্যক্তিদের কারণ জানার অধিকার, আইনজীবীর সহায়তা এবং সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। শিশুদের বহিষ্কার বা সীমান্তে আটকে রাখাও জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদের পরিপন্থি। প্রতিবেদনের শেষাংশে মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, কোনো মানুষকে তার জাতীয়তা যাই হোক না কেন, দুই দেশের সশস্ত্র সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মাঝখানে খোলা মাঠে রাত কাটাতে বাধ্য করা উচিত নয়। ভারতকে এ ধরনের বহিষ্কার বন্ধ করতে হবে এবং দুই দেশকেই নিশ্চিত করতে হবে যে সীমান্ত ব্যবস্থাপনার কারণে মানুষের মৌলিক মর্যাদা যেন ক্ষুণœ না হয়।

