ঢাকা মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২৬

ঘরের শত্রু বিভীষণ

মেহেদী হাসান খাজা
প্রকাশিত: জুন ৩০, ২০২৬, ০৬:০৯ এএম

বিএনপি সরকার গঠনের চার মাসের মাথায় দেশের বিভিন্ন সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদে দলীয় নেতাদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ায় স্থানীয় সরকার নির্বাচন হওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। তবে সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ নিয়ে মুখ খুলেছেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর থেকেই দেশজুড়ে শুরু হতে পারে স্থানীয় সরকার নির্বাচন।

এদিকে বিএনপির দলীয় গুলশান অফিসের একটি সূত্র মতে, অক্টোবরের প্রথম দিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে সরকার। তবে সংসদ সদস্য নির্বাচনের মতোই বিদ্রোহীদের ছাড় দেবে না বিএনপি, প্রয়োজনে তাদের বহিষ্কার করা হবে। তবে এসব বিষয় নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে মাথাব্যথার কারণ হতে পারে বিএনপির বিদ্রোহীরা।  এর কারণ হলো রাজনৈতিক গ্রপিং। এর সমাধান না করতে পারলে বিএনপি সরকার রাজনৈতিক সংকটেও পড়তে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।  

সূত্র মতে, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় শৃঙ্খলার বিষয়ে কঠোর অবস্থান নেবে বিএনপি। বিদ্রোহীদের বিষয়ে নেওয়া হবে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি। দলের হাইকমান্ড থেকে ইতোমধ্যেই বিভিন্ন স্তরে এ বার্তা জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।  বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক সদস্য রূপালী বাংলাদেশকে জানান, সংসদ নির্বাচনের মতো এক্ষেত্রেও দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে কেউ প্রার্থী হলে তার বিষয়ে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

দলীয় প্রতীক ব্যবহারের বিরোধিতা আগে থেকেই : বিএনপি দীর্ঘদিন ধরেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ব্যবহারের বিরোধিতা করে আসছে। আসন্ন নির্বাচনেও দলীয় প্রতীক থাকছে না। তবে মাঠপর্যায়ে একক প্রার্থী নিশ্চিত করতে নির্দিষ্ট প্রার্থীকে সবুজ সংকেত বা অনানুষ্ঠানিক সমর্থন দেওয়া হবে। কেন্দ্র বা স্থানীয় সমন্বয় কমিটি যাকে সমর্থন দেবে, দলের অন্য সব সম্ভাব্য প্রার্থীকে তার পক্ষেই কাজ করতে হবে। এর ব্যত্যয় ঘটলে আজীবন বহিষ্কারের মতো সাংগঠনিক শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।

বড় দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী বেশি, সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই : এসব বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেছেন, জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা, দলের প্রতি ত্যাগ, অবদান এবং এলাকায় গ্রহণযোগ্য জনপ্রিয়তা বিবেচনায় সমর্থন দেওয়া হবে। তবে দলের সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তিনি বলেন, ‘বড় দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী বেশি থাকবে, এটাই স্বাভাবিক।

প্রার্থী হন একাধিক প্রভাবশালী নেতা : অতীতে দেখা গেছে, প্রতীক ছাড়া নির্বাচনে একই এলাকায় দলের একাধিক প্রভাবশালী নেতা প্রার্থী হয়ে থাকেন। এতে ভোট ভাগাভাগি হয় এবং দলীয় কোন্দল চরম আকার ধারণ করে। প্রতিপক্ষ যেন এই সুযোগ নিতে না পারে, সে জন্য আগেভাগেই সম্ভাব্য মনোনয়নপ্রত্যাশীদের কঠোর বার্তা দেওয়ার পথে হাঁটছে দলটি।

স্থানীয় নির্বাচনেও চেইন অব কমান্ড ধরে রাখা হবে : নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির এক ভাইস চেয়ারম্যান জানান, ‘সংসদ নির্বাচনে যেমন দলের সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই, ঠিক তেমনি স্থানীয় নির্বাচনেও চেইন অব কমান্ড ধরে রাখা হবে। দল যাকে যোগ্য মনে করে সমর্থন দেবে, বাকিদের তার পেছনে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। কেউ বিদ্রোহী প্রার্থী হলে বা দলের প্রার্থীর বিপক্ষে কাজ করলে তাকে দল থেকে আজীবন বহিষ্কারের মতো সাংগঠনিক শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।’ বিএনপির শীর্ষ নেতারা জানান, জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশে রাজনৈতিক পট পরিবর্তন এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দল এখন রাষ্ট্র পরিচালনায় ও মাঠ গোছানোয় মনোযোগ দিচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে স্থানীয় সরকার কাঠামোতে শৃঙ্খলা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছে দলটি। মনোপ্রত্যাশীরা যেন এখন থেকেই দলীয় সিদ্ধান্তের প্রতি অনুগত থাকেন, সেটি নিশ্চিতের ওপর জোর দিচ্ছেন নীতিনির্ধারকরা।

সিটি করপোরেশনে প্রার্থী হতে পারেন প্রশাসকরা : স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিএনপি কেন্দ্রীয়ভাবে শুধু সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থীদের সমর্থন দেবে।  বর্তমানে এগুলোর দায়িত্বে থাকা প্রশাসকদের প্রার্থী করার সম্ভাবনা বেশি। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

একাধিক প্রার্থী থাকলেও সমস্যা হবে না, প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়বে : দলের ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেছেন, ‘একাধিক প্রার্থী থাকলেও সমস্যা হবে না, প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়বে। অনেকে নির্বাচন করার মাধ্যমে পরিচিতি বাড়াতে চান। এগুলো নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। তিনি বলেন, তবে দলীয়ভাবে নির্বাচন হবে না। ফলে নির্বাচনের জন্য অনেকে প্রস্তুতি নিতে পারেন, তাদের আশা থাকতে পারে। বিশেষ করে নির্বাচন যখন আসে, তখন বড় দলগুলোর প্রার্থীর অভাব হয় না।

বিএনপির এক সহসাংগঠনিক সম্পাদক রূপালী বাংলাদেশকে জানান, যেহেতু স্থানীয় নির্বাচন দলীয় প্রতীক ছাড়া হওয়ার সম্ভাবনা বেশি, তাই প্রতিটি এলাকা থেকে যোগ্য ও গ্রহণযোগ্য একক প্রার্থী ঠিক করা চ্যালেঞ্জিং। এখানে ব্যর্থ হলে দলীয় প্রার্থীদের মধ্যে বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। কারণ বেশি প্রার্থী থাকলে কোন্দলও বেশি হবে। 

বিএনপির কেন্দ্রীয় যুবদলের আরেক নেতা জানান, ‘স্থানীয় নির্বাচনকে বিএনপি তাদের মাঠ পর্যায়ের সাংগঠনিক ভিত্তি পুনর্গঠন ও গতিশীল করার একটি বড় সুযোগ হিসেবে দেখছে। তবে এর পেছনে কিছু বড় সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জ ও কৌশল রয়েছে।

মাঠে বিএনপির প্রতিপক্ষ বিএনপি, আসছে কঠিন সিদ্ধান্ত : এদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দাবি, এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দলের মনোনয়ন বঞ্চিতদের বিদ্রোহী প্রার্থী ছিল একাধিক কিন্তু স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও তেমনটা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আর এরাই এখন বিএনপির মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। জানা গেছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এবার যেসব জায়গায় বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন তারা অনেকটা শক্ত অবস্থানেই আছেন। অনেকের ধারণা, দল যাকে মনোনয়ন দিবে তার চেয়ে তিনি বিদ্রোহী প্রার্থীরা জনপ্রিয় হতে পারে। সে জন্য তারা হয়তো মাঠ ছাড়তে চাইবেন না। যার কারণে বিএনপিকে আরও কৌশলী হয়ে এই সময়ের মধ্যে কাজ করতে হবে বলে পরামর্শ রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের। 

অক্টোবরে নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসি : আগামী অক্টোবরে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্য নিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।  এই নির্বাচন আয়োজনে ব্যালট বাক্স, প্রিসাইডিং অফিসার ও পোলিং অফিসার প্রস্তুত আছে। ভোটার তালিকাও চূড়ান্ত হয়ে আছে। তবে নির্বাচন আয়োজনে বাজেট কিছুটা কমানো যায় কি নাÑ সেটা নিয়েও ভাবছে সাংবিধানিক এই সংস্থাটি। সম্প্রতি ইসির স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতিবিষয়ক অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে এসব আলোচনা হয়ে। 

বৈঠকে অংশ নেওয়া একাধিক কর্মকর্তা জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আইন-কানুন ও আচরণবিধির খসড়া নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এ সময় প্রণয়নের অপেক্ষায় থাকা আচরণবিধির খসড়া চূড়ান্ত করতে রাজনৈতিক দলসহ অংশীজনদের মতামত পাওয়ার ১৫ দিনের মতো সময় লাগতে পারে বলে জানানো হয়। 

বাড়তে পারে ভোটকেন্দ্র ও কক্ষের সংখ্যা : স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতিবিষয়ক অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র ও কক্ষের সংখ্যা বাড়বে বলে জানানো হয়। বেসরকারি ও এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ভোটগ্রহণের দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়। তবে সবকিছুই রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনার পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে মত দেওয়া হয়। এ ছাড়া ভোটগ্রহণের আনুষঙ্গিক প্রস্তুতি হিসেবে ভোটার তালিকা ও নির্বাচনি সরঞ্জামসহ অন্যান্য পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা হয়। ভোটগ্রহণের ব্যয় যথাসম্ভব কমানোর ওপর জোর দেন নির্বাচন কমিশনাররা।

রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, দল রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর স্থানীয় সরকারের এই নির্বাচনগুলোতে একক প্রার্থী নিশ্চিত করা এবং সংগঠনের শৃঙ্খলা বজায় রাখা বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক ও সমাজ এবং অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, বিএনপির অনেকেই দলের বাইরে গিয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করেছে। এবার ও অনেকের ধারণা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে মাথাব্যথার কারণ হতে পারে বিএনপির বিদ্রোহীরা! তবে দলের বিপক্ষে গেলেই বহিষ্কারও হতে পারে। তিনি বলেন, বিএনপিকে আরও সতর্ক থেকে এসব মোকাবিলা করতে হবে বলে পরামর্শ দেন এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক।