ঢাকা মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২৬

এমসিসির ভারী যন্ত্রপাতি কেনার টেন্ডারে গুরুতর অনিয়ম

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: জুন ৩০, ২০২৬, ০৬:১১ এএম

ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের (এমসিসি) ভারী যন্ত্রপাতি কেনাকে ঘিরে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। জানা গেছে, টেন্ডারে কম দরদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাদ দিয়ে উচ্চ দরদাতাকে কাজ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সংক্ষুব্ধ দরদাতাদের অভিযোগ নিষ্পত্তির আগেই চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে গভীর রাতে। ঘটনাটি ঘটেছে প্রধান প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম মিঞার অবসরের মাত্র দুদিন আগে।

নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, চলতি বছরের শুরুতে ভারী যন্ত্রপাতি কেনার জন্য দরপত্র আহ্বান করে এমসিসি। একটি লটে দুটি চেইন এক্সক্যাভেটর ও একটি চেইন ডোজার সরবরাহের জন্য চারটি প্রতিষ্ঠান দরপত্র জমা দেয়। এর মধ্যে প্রায় ১৫ কোটি ৪৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা দরপ্রস্তাব দিয়ে তৃতীয় সর্বোচ্চ অবস্থানে ছিল সোহেল ইঞ্জিনিয়ারিং। কিন্তু বিস্ময়করভাবে সর্বনিম্ন ও দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতাকে অযোগ্য ঘোষণা করে গত ২৫ জুন সোহেল ইঞ্জিনিয়ারিংকে যন্ত্রপাতি সরবরাহের ছাড়পত্র দেওয়া হয়। এরপরই ক্ষুব্ধ দুই প্রতিষ্ঠান লিখিতভাবে প্রকল্প পরিচালকের কাছে অভিযোগ করে।

অভিযোগকারীদের দাবি, সরকারি ক্রয়বিধি অনুযায়ী অভিযোগ নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচিত ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদনের সুযোগ নেই। কিন্তু সেই বিধান উপেক্ষা করে তড়িঘড়ি সোহেল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন করা হয়েছে। আরও বিস্ময়ের বিষয় হলোÑ অভিযোগকারী একটি প্রতিষ্ঠানকে তাদের আবেদনের জবাব দেওয়া হয় গত রোববার অফিস সময় শেষ হওয়ার পর। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, কার্যত আপিলের সুযোগ সংকুচিত করতেই এমন কৌশল নেওয়া হয়েছে। অভিযোগের জবাব পাঠানোর পরপরই নির্বাচিত ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়।

এ নিয়ে প্রধান প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম মিঞার সঙ্গে কথা বলতে গেলে তিনি প্রথমে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। পরে সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, নিম্ন দরদাতাদের পণ্যের মান টেন্ডারের চাহিদা পূরণ করেনি। কিন্তু কোন কোন কারিগরি শর্ত পূরণ হয়নি, তার সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেননি তিনি। বরং বিষয়টি জানতে সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। একইভাবে নির্বাচিত সোহেল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রস্তাবিত যন্ত্রপাতি টেন্ডারের সব শর্ত পূরণ করেছে কি নাÑ সে প্রশ্নেরও কোনো স্পষ্ট উত্তর মেলেনি।

পুরো ঘটনাকে ঘিরে আরেকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে। প্রধান প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম মিঞার শেষ কর্মদিবস ৩০ জুন। অর্থাৎ অবসরের ঠিক আগে কেন এত দ্রুত টেন্ডার ছাড়পত্র দেওয়া, অভিযোগ নিষ্পত্তির আগেই চুক্তি সম্পাদন এবং পুরো প্রক্রিয়া শেষ করার প্রয়োজন হলো? সংশ্লিষ্টদের মতে, এ প্রশ্নের জবাবই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

বঞ্চিত দরদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর একটির প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা অভিযোগ করে বলেন, নির্দিষ্ট একটি ব্র্যান্ডের যন্ত্রপাতি কেনার জন্যই পরিকল্পিতভাবে নিম্ন দরদাতাদের বাদ দেওয়া হয়েছে। তাদের ভাষ্য, টেন্ডার মূল্যায়নে সমান মানদ- অনুসরণ করা হয়নি। তিনি বলেন, প্রথমে সিটি প্রশাসকের কাছে আপিল করা হবে। সেখানে প্রতিকার না মিললে উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

সরকারি ক্রয়ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য হলো, প্রতিযোগিতার মাধ্যমে সর্বনিম্ন ব্যয়ে সর্বোচ্চ মানের পণ্য বা সেবা নিশ্চিত করা। কিন্তু অভিযোগ নিষ্পত্তির আগেই চুক্তি সম্পাদন, উচ্চ দরদাতাকে নির্বাচন এবং অবসরের প্রাক্কালে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঘটনাগুলো এমসিসির ক্রয়প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।

সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি এখন সিটি প্রশাসনের দিকে। অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হবে কি না, নাকি পুরো বিষয়টি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের আড়ালেই থেকে যাবে, সেটিই দেখার অপেক্ষা।