দেশের অভ্যন্তরে এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টিপাতের কারণে দেশের প্রধান নদ-নদীগুলোর পানি বাড়ছে। কুড়িগ্রামের দুধকুমার নদী এরইমধ্যে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ ছাড়া তিস্তাসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নদী বিভিন্ন পয়েন্টে সতর্ক সীমায় পৌঁছেছে। আগামী কয়েক দিন ভারি বৃষ্টিপাত হলে উত্তরের নি¤œাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। গতকাল সোমবার বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের প্রকাশিত সর্বশেষ বুলেটিনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এদিকে ভারি বৃষ্টি ও ভারতের গজলডোবা ব্যারাজের ৪০টি গেট খুলে দিয়েছে দেশটি। এতে তিস্তার পানি কখনো বিপৎসীমার উপরে আবার কখনো বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তিস্তার পানি ডালিয়া পয়েন্টে বিপৎসীমার নিচে থাকলেও ভাটিতে পানি বেড়ে নি¤œাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে উত্তরের ৫ জেলার চরাঞ্চলের অন্তত ১৪ হাজার পরিবার বলে জানিয়েছেন রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের রংপুরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আহসান হাবিব।
বুলেটিনে বলা হয়, ২৪ ঘণ্টার নদীর পানি পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কুড়িগ্রামের পাটেশ্বরী স্টেশনে দুধকুমার নদী বিপৎসীমার ২৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। একদিনে সেখানে নদীটির পানি ৯৩ সেন্টিমিটার বেড়েছে। একই সময়ে নীলফামারীর ডালিয়া, রংপুরের কাউনিয়া ও লালমনিরহাটের তারাপুরে তিস্তা নদী সতর্ক সীমায় ছিল। আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী দুই দিন দেশের রংপুর, সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগ এবং তৎসংলগ্ন ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, অরুণাচল ও মেঘালয়ে ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টিপাত হতে পারে। পরবর্তী তিন দিন মাঝারি থেকে ভারি বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে।
বিভাগভিত্তিক পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, রংপুর বিভাগের তিস্তা, দুধকুমার ও ধরলা নদীর পানি আগামী তিন দিনে আরও বাড়তে পারে। এর মধ্যে আগামী ২৪ ঘণ্টায় তিস্তা এবং ৪৮ ঘণ্টায় ধরলা নদী বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। এতে নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর ও গাইবান্ধার নি¤œাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দিতে পারে। একইসঙ্গে কুড়িগ্রামে বিদ্যমান বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কা রয়েছে।
পানিবন্দি চরাঞ্চলের ১৪ হাজার পরিবার : পানির চাপ সামাল দিতে তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি গেট খুলে দেওয়া হয়েছে। এতে নদী তীরবর্তী নি¤œাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছে উত্তরের ৫ জেলার চরাঞ্চলের অন্তত ১৪ হাজার পরিবার। রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের রংপুরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আহসান হাবিব জানান, ভারত গজলডোবা ব্যারাজের ৪০টি গেট খুলে দেওয়ায় বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। রোববার বিকেলের দিকে ভারত গেটগুলো খুলে দেয়। ফলে রাত ১১টা পর্যন্ত পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এতে উত্তরের ৫ জেলা রংপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার চরাঞ্চলের অন্তত ১৪ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের এই কর্মকর্তা। এই কর্মকর্তা বলেন, পানি বাড়ার সাথে সাথে উত্তরের ৫ জেলায় দেখা দিয়েছে ভাঙন।
একাধিক পানিবন্দি পরিবারের সদস্যরা জানান, গত ২ দিন থেকে পানিবন্দি থাকলে কেউ কোনো খোঁজখবর রাখেনি।
গতকাল সোমবার দুপুর ১২ টায় ৫২ দশমিক শূন্য সেন্টিমিট। যা বিপৎসীমার ১৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়। তবে পানি যেকোনো সময় বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে বলে জানিয়েছেন পাউবো।
এদিকে হঠাৎ করে তিস্তা নদীর পানিতে নি¤œাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা করছে তিস্তা পাড়ের বাসিন্দারা। তিস্তার পানি বাড়ায় হাতীবান্ধা উপজেলার গড্ডিমারী, দোয়ানী, সানিয়াজান, নিজ শেখ সুন্দর, বাঘের চর, সিঙ্গীমারি, ধুবনী, সিন্দুর্না, পাটিকাপাড়া, ডাউয়াবাড়ি, কালীগঞ্জের শৈলমারী, চর বৈরাতী, রুদ্রেশ্বর, আদিতমারীর মহিষখোচা, গোবর্ধন ও স্পারবাধ, রংপুরের গঙ্গাচড়া, কাউনিয়া ও পীরগাছা উপজেলা, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার তিস্তা চরাঞ্চলের নদীর তীরবর্তী চরে বাদামক্ষেত, ধানের বীজ তলা, মিষ্টি কুমড়াসহ বিভিন্ন ফসল পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। ঘরবাড়িতে পানি ওঠায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন নদীপাড়ের বাসিন্দারা।
কালীগঞ্জের কাশীরাম এলাকার বাদাম চাষি লোকমান মিয়া জানান, তিস্তার চরে ৭০ শতক জমি লিজ নিয়ে চিনাবাদাম চাষ করেছেন। কয়েকদিন পানি জমে থাকায় বাদামে পচন ধরেছে এবং গাছ হলুদ হয়ে যাচ্ছে। এতে ফলন কমে যাওয়ার পাশাপাশি লোকসানের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
কৃষকরা জানান, রাতে পানি কমলে আবার সকালে পানি পাড়ে। পানি বাড়া-কমার কারণে দুশ্চিন্তায় আছি। চলতি মৌসুমে আমন আবাদে ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত করা অনেক বীজতলাও পানির কারণে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফলে নতুন করে বীজতলা তৈরির প্রয়োজন হতে পারে।
রংপুরের চর চব্বিশ হাজারী গ্রামের কৃষক নজরুল হক বলেন, সোমবার রাত থেকে টানা বৃষ্টির কারণে তিস্তার পানি আরও বাড়ছে। শুনছি ভারত পানি ছেড়ে দিয়েছে। পানি এভাবে বাড়তে থাকলে চরাঞ্চলের ধানের চারা, বাদাম ও মিষ্টিকুমড়াসহ বিভিন্ন ফসলের ক্ষতি হবে। মহিপুর তিস্তার চর এলাকার কৃষক বুলু মিয়া জানায়, উজান থেকে পাহাড়ি ঢলের কারণে ঘরবাড়িতে পানি উঠেছে, গবাদি পশুরসহ সন্তানদের নিয়ে বিপাকে রয়েছি। চর রাজপুরের বাসিন্দা আসাদুল বলেন, গত দুদিন থেকে পানিবন্দি হয়ে আছি, চেয়ারম্যান মেম্বার কেউ কোনো খবর রাখেনি।
ডালিয়া পয়েন্টের পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী বলেন, পানি কখনো বিপৎসীমার উপরে আবার কখনো বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় চরের বাসিন্দাদের সতর্ক থাকতে বলেছি। টানা বর্ষণ ও উজানের ঢলে বেলা বাড়ার সঙ্গে পানি আরও বাড়তে পারে।
রংপুরের বিভাগীয় কমিশনার শহিদুল ইসলাম বলেন, তিস্তার মধ্যবর্তী চরের অন্তত ১৪ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে আছে। চেয়ারম্যানদের তালিকা করতে বলা হয়েছে, তালিকা পেলেই শুকনো খাবার বিতরণ করা হবে।

