দেশজুড়ে প্রায় ৩২ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নিয়োগের বাধা দূর করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের বেঞ্চ গতকাল বৃহস্পতিবার একটি আপিল আবেদনের নিষ্পত্তি করে এই আদেশ দেন।
‘অধিগ্রহণকৃত বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক (চাকরির শর্তাবলি) বিধিমালার জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতি-সংক্রান্ত কিছু বিধান অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্ট যে রায় দিয়েছিলেন, তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ এই আপিল আবেদনটি করেছিল। গতকাল আপিল বিভাগ হাইকোর্টের সেই রায় বাতিল করে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনটি গ্রহণ করেন। রায় ঘোষণার পর সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে নিজ কার্যালয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল সাংবাদিকদের জানান, রায়টি সরকার ও রাষ্ট্রপক্ষের পক্ষে দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, এই রায়ের ফলে হাইকোর্টের দেওয়া আগের রায়টি আর কার্যকর থাকল না। বর্তমান আইন অনুযায়ী, সরাসরি নিয়োগ পাওয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা জাতীয়করণ হওয়া বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকদের চেয়ে পদমর্যাদায় জ্যেষ্ঠ (সিনিয়র) হিসেবে গণ্য হবেন। আজকের রায়ের মাধ্যমে আইনি সেই অবস্থানটিই নিশ্চিত করা হলো। অ্যাটর্নি জেনারেল আরও বলেন, আইনি এই বিরোধের কারণে দীর্ঘদিন ধরে সারা দেশের প্রায় ৩২ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া যাচ্ছিল না। অনেক স্কুলেই শিক্ষকেরা ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। কিন্তু মামলা চলমান থাকায় সরকার প্রধান শিক্ষক নিয়োগ বা বদলি করতে পারছিল না, যার কারণে পদগুলো শূন্যই পড়ে ছিল। মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, আপিল বিভাগের এই রায়ের মাধ্যমে আইনি বাধাগুলো দূর হলো। এর ফলে সরকার এখন প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দিতে পারবে এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ফিরে আসবে।
এ মামলার আইনজীবীদের দেওয়া তথ্যমতে, ২০১৩ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর ‘অধিগ্রহণকৃত বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক (চাকরির শর্তাবলি) বিধিমালা’ তৈরি করা হয়। এর আগে সরকার বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ কাঠামো তৈরির জন্য একটি কমিটি গঠন করে। ওই কমিটির সুপারিশে প্রথমে ২৬ হাজার ১৯৩টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নির্বাচন করা হয় এবং পরে এগুলো সরকারি করা হয়।
কিন্তু জাতীয়করণ হওয়া ওই বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকেরা জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতি নিয়ে তৈরি করা ২০১৩ সালের বিধিমালার ৯(১) উপবিধির কিছু অংশকে চ্যালেঞ্জ করে ২০১৭ সালে একটি রিট আবেদন করেন। প্রাথমিক শুনানির পর হাইকোর্ট একটি রুল জারি করেন। পরে চূড়ান্ত শুনানির পর ২০১৯ সালের ১১ মার্চ আদালত ওই বিধানটিকে অসাংবিধানিক বলে ঘোষণা করেন।
এরপর রাষ্ট্রপক্ষ হাইকোর্টের ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার অনুমতি চেয়ে (লিভ টু আপিল) সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করে। ২০২২ সালের ২০ নভেম্বর আপিল বিভাগ লিভ টু আপিল মঞ্জুর করেন এবং হাইকোর্টের রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত করেন। অনুমতি পাওয়ার পর রাষ্ট্রপক্ষ ২০২৩ সালে আপিল দায়ের করে। সরাসরি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকেরাও আপিল বিভাগে আবেদন করেন। গতকাল চূড়ান্ত শুনানির পর আপিল বিভাগ এসব আপিল গ্রহণ করে রায় দেন।
আদালতে আপিলকারীদের পক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক, আইনজীবী মুনতাসীর উদ্দিন আহমেদ এবং আইনজীবী অজিত শীল।
রিটকারীদের পক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মো. সালাহ উদ্দিন দোলন এবং মো. মিফতাহ উদ্দিন চৌধুরী। এ ছাড়া সরাসরি নিয়োগ পাওয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী রমজান আলী সিকদার।

