বর্ষা বাংলাদেশের প্রকৃতিকে যেমন নতুন প্রাণ দেয়, তেমনি জনজীবনে নিয়ে আসে নানা দুর্ভোগ, স্বাস্থ্যঝুঁকি। গত কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা। ফলে অনেকেই অফিস, স্কুল, কলেজ কিংবা বাজারে যেতে বাধ্য হচ্ছেন হাঁটুপানি মাড়িয়ে। এসব কারণে সর্দি-কাশি থেকে শুরু করে ত্বকের সংক্রমণ, ডায়রিয়া, জ্বর, এমনকি লেপ্টোস্পাইরোসিসের মতো ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। কিন্তু একটু সচেতন থাকলে এসব ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
প্রথমেই বলতে চাই, বৃষ্টিতে ভিজলে যা করবেন। বৃষ্টিতে ভিজে বাড়ি বা অফিসে পৌঁছানোর পর যত দ্রুত সম্ভব ভেজা কাপড় বদলে ফেলতে হবে। শরীর ভালোভাবে মুছে শুকনো কাপড় পরতে হবে। দীর্ঘ সময় ভেজা পোশাক পরে থাকলে শরীরের তাপমাত্রা কমে যেতে পারে এবং ত্বকে ছত্রাক বা ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে।
এবার আসা যাক, জলাবদ্ধতায়। এই পানিতে নর্দমার ময়লা, আবর্জনা, বিভিন্ন রাসায়নিক বর্জ্য, ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও পরজীবী জীবাণু মিশে থাকতে পারে। এই পানি পায়ের ক্ষতস্থান বা ত্বকের মাধ্যমে শরীরে সংক্রমণ ঘটাতে পারে। বিশেষ করে লেপ্টোস্পাইরোসিস, ত্বকের সংক্রমণ, ফাঙ্গাল ইনফেকশন এবং বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। বাধ্য হয়ে এই পানি মাড়াতে হলে ঘরে ফিরে যত দ্রুত সম্ভব পায়ের ক্ষতস্থান পরিষ্কার পানি দিয়ে ধুয়ে জীবাণুনাশক ব্যবহার করে শুকনো ব্যান্ডেজ লাগানো উচিত।
নিরাপদ খাবার ও বিশুদ্ধ পানি রাখুন হাতের নাগালে। বর্ষায় ডায়রিয়া, আমাশয়, টাইফয়েড ও হেপাটাইটিস-এ’র মতো পানিবাহিত রোগ বেড়ে যায়। তাই অবশ্যই ফোটানো বা নিরাপদ বিশুদ্ধ পানি পান করতে হবে। রাস্তার খোলা খাবার, কাটা ফল, অপরিষ্কার শরবত বা দীর্ঘ সময় বাইরে রাখা খাবার এ সময় এড়িয়ে চলাই ভালো। রান্না করা খাবার দীর্ঘ সময় বাইরে রেখে খাবেন না। ফল ও সবজি ভালোভাবে ধুয়ে খেতে হবে।
আরেকটি কথা এই বৃষ্টির মৌসুমে না বললেই নয়। বৃষ্টির কারণে বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকায় মশার প্রজনন বেড়ে যায়। ফলে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়। বাড়ির ছাদ, বারান্দা, ফুলের টব, এসির ট্রে বা আশপাশে কোথাও যেন তিন দিনের বেশি পানি জমে না থাকে, সেদিকে লক্ষ্য রাখুন।
শিশু ও বয়স্কদের বিশেষ যতœ নিন এই সময়টাতে। শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী এবং ডায়াবেটিস, হৃদরোগ বা কিডনি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তুলনামূলক কম থাকে। তাই বিনা প্রয়োজনে তাদের বৃষ্টিতে বাইরে না যাওয়াই শ্রেয়। কোনো কারণে বাইরে গিয়ে ভিজে গেলে দ্রুত শুকনো কাপড় পরানো এবং শরীর গরম রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।
এবার বলব কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন? বৃষ্টিতে ভেজা বা জলাবদ্ধতার সংস্পর্শে আসার পর যদি তিন দিনের বেশি জ্বর থাকে, শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়, তীব্র ডায়রিয়া বা বমি হয়, পায়ে লালচে ফোলা, পুঁজ বা ব্যথা বাড়ে অথবা চোখ লাল হয়ে যায় বা প্রস্রাব কমে যায়, তাহলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। নিজের ইচ্ছামতো অ্যান্টিবায়োটিক বা অন্য ওষুধ সেবন করা উচিত নয়।
বর্ষাকালের স্বাস্থ্যঝুঁকি পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব না হলেও সচেতনতা ও ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখলে অধিকাংশ সংক্রমণ প্রতিরোধ করা সম্ভব।
অনেকের ধারণা, বৃষ্টিতে ভিজলেই সর্দি-কাশি হয়। বাস্তবে সর্দি-কাশির মূল কারণ ভাইরাস। তবে দীর্ঘ সময় ভেজা অবস্থায় থাকলে শরীরের তাপমাত্রা কমে যায় এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা সাময়িকভাবে দুর্বল হতে পড়ে। ফলে ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের সুযোগ বেড়ে যায়। তাই বৃষ্টিতে ভিজে বাড়ি বা কর্মস্থলে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে ভেজা কাপড় বদলে শুকনো কাপড় পরা জরুরি।
মনে রাখতে হবে, রোগের চিকিৎসার চেয়ে রোগ প্রতিরোধ অনেক সহজ ও কম ব্যয়বহুল। তাই বর্ষায় নিজের পাশাপাশি পরিবারের সদস্য, বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সবাইকে আরও সচেতন হতে হবে।
এমবিবিএস
এমপিএইচ
প্রভাষক, গ্রীন লাইফ মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হসপিটাল, ঢাকা

