বাংলাদেশের মানুষ খেলা দেখতে ভীষণ পছন্দ করে। সেটা হোক ক্রিকেট কিংবা ফুটবল খেলা। বিশ্বকাপ, এশিয়া কাপ কিংবা বিপিএলÑ সব খেলায় দারুণ আগ্রহ থাকে দেশবাসীর। আর ফুটবল বিশ্বকাপ মানে তো পুরো পরিবার কিংবা বন্ধুরা একসঙ্গে বসে খেলা দেখা। সেই সঙ্গে আড্ডায় বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা চলতেই থাকে। তবে প্রিয় দল খেলায় হেরে গেলে সেই উচ্ছ্বাস মুহূর্তেই পরিণত হয় হতাশায়। অনেকে আবার রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না বিপক্ষ দলের জয় দেখে। কেউ আবার বিপক্ষ দলের সমর্থকদের সঙ্গে বিবাদে জড়ান। খেলাকে কেন্দ্র করে ঝগড়া কিংবা আত্মহত্যার ঘটনাও দেখা গেছে এবারের বিশ্বকাপের আসরে। সেই সঙ্গে বুলিং তো আছেই।
প্রিয় দলের পরাজয়ে কষ্ট পাওয়া স্বাভাবিক। আর এই অনুভূতিকে অনেক সময় বলা হয় স্পোর্টস ফ্যান ডিপ্রেশন। অনেকে আবার একে বলেন, স্পোর্টস ফ্যান ব্লুজ। সাধারণত প্রিয় দল হেরে যাওয়ার পর কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক দিন পর্যন্ত মন খারাপ, হতাশা বা বিরক্তি থাকতে পারে। তবে যদি এই অনুভূতি দুই সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হয় এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত করে, তাহলে অবশ্যই মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
প্রিয় দল হারলে যেভাবে নিজেকে ঠিক রাখবেন : আবেগ প্রকাশের সময় নির্ধারণ : প্রিয় দলের পরাজয় মেনে নেওয়া সহজ নয়, বিশেষ করে যদি সেটি যদি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ হয়। হারার পর মন খারাপ, হতাশা বা ক্ষোভ অনুভব করা একেবারেই স্বাভাবিক। খেলার পর ৪৫ থেকে ৬০ মিনিট সময় দিন নিজের অনুভূতিগুলো প্রকাশ করার জন্য। যদি সম্ভব হয় তাহলে অন্য সমর্থকদের সঙ্গে কথা বলুন। আপনার অভিজ্ঞতা তাদের জানান, তারা কী বলে সেটা শুনুন। এটা প্রিয় দল হেরে যাওয়ার কষ্ট কিছুটা স্বাভাবিক করবে।
তবে ৪৫ থেকে ৬০ মিনিট পর চেষ্টা করুন অন্য কোনো কাজে মনোযোগ দিতে কিংবা ভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলুন। একই বিষয় নিয়ে বারবার চিন্তা করা, বিশেষ করে একা একা, আপনার হতাশা ও নেতিবাচক অনুভূতিকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে। এ ছাড়া ম্যাচের পর কিছু সময়ের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে দূরে থাকতে পারেন। কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যেম নানাভাবে ট্রল করা হয়, আবার কেউ নিজের হতাশা ভাগ করেন।
শরীর সক্রিয় রাখুন : পরাজয়ের পর মন খারাপ হওয়া স্বাভাবিক। এ সময় ব্যায়াম বা শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকার চেষ্টা করুন; কারণ এটা মন ভালো রাখতে সাহায্য করে। এর ফলে নেতিবাচক ভাবনা নিয়ন্ত্রণে আনা সহজ হয়। ২০১৮ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র ১০ থেকে ৩০ মিনিটের ব্যায়াম মন ভালো করতে পারে। এটি ডোপামিনের মাত্রাও বাড়াতে সাহায্য করে। ডোপামিন এমন হরমোন, যা আমাদের মন ভালো রাখে।
প্রিয় দলের হার দেখার পর অনেক সমর্থকের শরীরে কর্টিসল বা স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়। আর এ সময় মানসিক চাপ সামাল দেওয়া কষ্টের। তবে নিজেকে কাজে ব্যস্ত রাখলে বিষয়টা সহজ হতে পারে। তাই নিজেকে সামাল দিতে যেসব কাজ করতে পারেনÑ হাঁটতে বের হওয়া, গান বা পডকাস্ট শোনা, চাইলে নাটক বা সিনেমা দেখতে পারেন, বই পড়তে পছন্দ করলে পড়–ন, নিজের অনুভূতি লেখা, পাজল সমাধান, ছবি আঁকা কিংবা শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণের ব্যায়াম করা।
এসব অভ্যাস শুধু খেলায় হারের হতাশাই নয়, দৈনন্দিন জীবনের অন্যান্য মানসিক চাপও কমাতে সাহায্য করতে পারে।
প্রিয় দলের খেলা দেখা অবশ্যই আনন্দের। তবে যদি সেই দলের পরাজয় না মানতে পারেন, তাহলে নিজের পছন্দের দিকে নজর দেওয়া দরকার। আপনার প্রিয় কাজ কোনগুলো কিংবা আপনার কোনো শখ আছে কি না, সেসবে নজর দিন। যেমন অনেকে রান্না করতে ভালোবাসেন, আবার কেউ বাগান করতে পছন্দ করেন। এসব শখ হতাশা কমায়। পাশাপাশি নতুন কিছু করার আনন্দ আপনাকে প্রিয় দলে পরাজয়ের কষ্ট কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করবে।
আর কিছুদিন পর বিশ্বকাপ ফুটবল শেষ হতে যাচ্ছে। একে একে অনেক দল বাদ গেছে আর সামনে তো স্বাভাবিকভাবেই যাবে। তাই যদি আপনার প্রিয় দল বাদ যাওয়ার কষ্ট সামাল দিতে না পারেন, তাহলে একটু সময় নিন আর নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে চেষ্টা করুন। খেলায় জয়-পরাজয় থাকবেই, তাই প্রিয় দল হেরে যাওয়ায় নেতিবাচক ভাবনায় থাকা যাবে না।

