দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। তবে ক্ষমতার মসনদে বসার পর থেকেই রাজপথের দীর্ঘদিনের মিত্র বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে দলটির দূরত্ব ও বিরোধ এখন স্পষ্ট। নির্বাচনে জোটবদ্ধ না হয়ে জামায়াত এককভাবে অংশ নেওয়ায় সংসদ এবং সংসদের বাইরে দল দুটির অবস্থান এখন মুখোমুখি। বিএনপি যেখানে একক শক্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে উন্মুখ, জামায়াত সেখানে সংসদের প্রধান বিরোধী দল হিসেবে নিজেদের শক্ত অবস্থান জানান দিচ্ছে। মাঠের পুরোনো এই দুই মিত্রের বর্তমান ‘শীতল যুদ্ধ’ ও মনস্তাত্ত্বিক সংঘাত দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন সবচেয়ে আলোচিত বিষয়।
বিরোধের নেপথ্যে নির্বাচনি মেরূকরণ ও আদর্শিক দ্বন্দ্ব : রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই বিরোধের বীজ রোপিত হয়েছিল নির্বাচনের আগেই, যখন বিএনপির পক্ষ থেকে জাতীয় ঐক্য সরকার বা জামায়াতের সঙ্গে প্রাক-নির্বাচনি জোটের প্রস্তাব নাকচ করে দেওয়া হয়। ৫ আগস্টের পট পরিবর্তনের পর জামায়াতে ইসলামী নিজেদের রাজনৈতিক শক্তি ও জনসমর্থন ব্যাপকভাবে বাড়াতে সক্ষম হয়েছে, বিশেষ করে তরুণ ভোটার এবং ‘জেন জেড’ প্রজন্মের একটি বড় অংশকে নিজেদের বলয়ে টেনেছে। সংসদের ভেতরে ও বাইরে সরকারের বিভিন্ন নীতি, সংস্কার প্রক্রিয়া এবং একাত্তরের ভূমিকা নিয়ে দুই দলের বাগ্বিত-া এখন নিয়মিত রূপ নিয়েছে।
জামায়াতের মাঠপর্যায়ের নেতাদের অভিযোগ, বিএনপি সরকার গঠনের পর তাদের ওপর নানামুখী প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক চাপ তৈরি করা হচ্ছে। অপরদিকে, বিএনপির দাবিÑ জামায়াত বিরোধী দলের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে সরকারকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে।
এদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকের দৃষ্টিতে ‘ক্ষমতার ভারসাম্য ও একাত্তর কার্ড’ বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বিশাল শূন্যতা তৈরি করেছে।
বিএনপি ও জামায়াতের এই ক্রমবর্ধমান বিরোধকে কীভাবে দেখছেন দেশের জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. রমিজ উদ্দিন। তিনি এই সম্পর্কের রসায়নকে ব্যাখ্যা করে বলেন : ‘‘আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বিশাল শূন্যতা তৈরি করেছে। এতদিন বিএনপি ও জামায়াতের শত্রু ছিল সাধারণ, তাই তাদের কৌশলগত বন্ধুত্ব টিকে ছিল। কিন্তু এখন বিএনপি ক্ষমতায় এবং জামায়াত প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। জামায়াত এখন আর বিএনপির ‘ছোট ভাই’ বা জুনিয়র পার্টনার হিসেবে থাকতে রাজি নয়। তারা নিজস্ব ভোটব্যাংক (যা এবারের নির্বাচনে ৩১.৭৬ শতাংশে উন্নীত হয়েছে) দিয়ে প্রমাণ করেছে তারা একক শক্তি।
বিএনপি সরকার গঠনের পর জামায়াতকে কিছুটা কোণঠাসা করার চেষ্টা করবেÑ এটাই স্বাভাবিক ক্ষমতার রাজনীতি। তবে এখানে সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো ‘একাত্তর কার্ড’। বিএনপি যখনই জামায়াতের চাপের মুখে পড়ছে, তখনই তারা জামায়াতের একাত্তরের বিতর্কিত ভূমিকাকে সামনে আনছে। এটি আসলে আদর্শিক বিরোধ নয়, বরং পিওর পাওয়ার পলিটিক্স (ক্ষমতার রাজনীতি)। এই দ্বন্দ্ব আগামী দিনে আরও তীব্র হবে, কারণ দুই দলই এখন ২০৩১ সালের পরবর্তী নির্বাচনের জন্য নিজেদের মাঠ গোছাচ্ছে।”
বিএনপির অবস্থান : জামায়াতের সঙ্গে তৈরি হওয়া এই দূরত্ব এবং সরকারের অবস্থান নিয়ে কথা বলেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির দুই প্রভাবশালী সদস্য। এসব বিষয়ে দলের প্রবীণ নেতা অর্থমন্ত্রী এবং স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “আমরা পরিষ্কার করে বলতে চাই, দেশের মানুষ ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে রায় দিয়ে বিএনপিকে এককভাবে সরকার গঠনের ম্যান্ডেট (জনগণের রায়) দিয়েছে। আমরা জনগণের আকাক্সক্ষা অনুযায়ী রাষ্ট্র সংস্কার এবং অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য কাজ করছি। জামায়াতে ইসলামী দীর্ঘদিন আমাদের সঙ্গে আন্দোলনে ছিল, তাদের প্রতি আমাদের সম্মান আছে। কিন্তু সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে কোনো আপস করা হবে না। জামায়াত যদি বিরোধী দল হিসেবে গঠনমূলক সমালোচনা করে, তাকে আমরা স্বাগত জানাই। কিন্তু রাজপথে বা সংসদের ভেতরে যদি সরকারকে অস্থিতিশীল করার কোনো চেষ্টা করা হয়, তবে আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। আমরা কোনো নির্দিষ্ট দলের চাপের কাছে নতি স্বীকার করব না।”
রাজনীতিতে চিরস্থায়ী কোনো শত্রু বা মিত্র থাকে না : একই বিষয়ে সুর মিলিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, “রাজনীতিতে চিরস্থায়ী কোনো শত্রু বা মিত্র থাকে না। আমরা যুগপৎ আন্দোলন করেছি স্বৈরাচার পতনের জন্য, তার অর্থ এই নয় যে, আমরা আজীবন ক্ষমতা ভাগাভাগি করব। জামায়াত নিজেদের একক রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, সেটি তাদের অধিকার। কিন্তু ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখতে গিয়ে তারা যদি জাতীয় স্বার্থে আঘাত করে, কিংবা একাত্তরের অমীমাংসিত ইতিহাস নিয়ে জলঘোলা করতে চায়, তবে বিএনপি চুপ থাকবে না। সরকার কোনো প্রতিশোধের রাজনীতিতে বিশ্বাসী নয়, তবে প্রশাসনের ওপর প্রভাব বিস্তারের যেকোনো চেষ্টা কঠোর হস্তে দমন করা হবে।”
বিএনপি মসনদে বসে জামায়াতকে প্রতিপক্ষ ভাবছে : জামায়াতের আমির : বিএনপি সরকারের নীতি এবং জামায়াতের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও আপত্তি প্রকাশ করেছেন জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ দুই নেতা। দলের আমির ডা. শফিকুর রহমান এই বিরোধের বিষয়ে সরাসরি বলেন, ‘আমরা চেয়েছিলাম ছাত্র-জনতার রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে যে নতুন বাংলাদেশ তৈরি হয়েছে, সেখানে একটি জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠিত হোক। কিন্তু ক্ষমতার অহংকারে বিএনপি সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। আজ ক্ষমতার মসনদে বসে তারা জামায়াতকে প্রতিপক্ষ ভাবছে। সারা দেশে আমাদের নেতাকর্মীদের ওপর স্থানীয় পর্যায়ে নানাভাবে হয়রানি করা হচ্ছে, প্রশাসনিক কাজে বাধা দেওয়া হচ্ছে। আমরা স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই, পনেরো বছর বুক পেতে গুলি খেয়েছি স্বৈরাচার ভাঙতে, এখন নতুন কোনো ফ্যাসিবাদের উত্থান আমরা মেনে নেব না। জামায়াতকে চাপ দিয়ে, কিংবা পুরোনো একাত্তরের ভাঙা রেকর্ড বাজিয়ে স্তব্ধ করা যাবে না। আমরা সংসদের ভেতরে এবং রাজপথে জনগণের অধিকার আদায়ে আপসহীন ভূমিকা পালন করব।”
জামায়াতকে বিএনপি সরকার ভয় পাচ্ছে : জামায়াতের নায়েবে আমির এবং জ্যেষ্ঠ নেতা ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করে বলেন, “বিএনপি সরকার ভাবছে তারা একাই সব অবদান নিয়ে নিয়েছে। অথচ জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে আমাদের শত শত কর্মী শহিদ হয়েছেন। এখন সরকার গঠনের পর জামায়াতের শক্তি বৃদ্ধি দেখে তাদের মধ্যে এক ধরনের রাজনৈতিক ভীতি তৈরি হয়েছে। প্রশাসন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্তরে জামায়াতপন্থিদের সরিয়ে দেওয়ার একটা গোপন প্রক্রিয়া চলছে। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। আমরা সরকারকে সহযোগিতা করতে চাই, কিন্তু আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেলে দেশের তৌহিদি জনতাকে সাথে নিয়ে রাজপথে কীভাবে অধিকার আদায় করতে হয়, তা জামায়াত ভালো করেই জানে। বিরোধ আমরা বাড়াচ্ছি না, বিরোধ বাড়াচ্ছে বিএনপির একাংশের অদূরদর্শী নেতৃত্ব।”
ভবিষ্যৎ রাজনীতি কোন দিকে যাচ্ছে : বিএনপি ও জামায়াতের এই মুখোমুখি অবস্থান বাংলাদেশের রাজনীতিকে এক নতুন মেরূকরণের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই দুই দলের বিরোধের ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ইসলামপন্থি দলগুলোর একটি নতুন মোর্চা বা ব্লক তৈরি হতে পারে, যার নেতৃত্ব দেবে জামায়াত। অন্যদিকে, বিএনপি নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষ ও মধ্যপন্থি গণতান্ত্রিক দল হিসেবে আন্তর্জাতিক মহলে উপস্থাপন করতে জামায়াতের সাথে দূরত্ব বজায় রাখাকেই শ্রেয় মনে করছে।
আপাতত সংসদের ভেতরে তর্ক-বিতর্ক এবং মাঠপর্যায়ে আধিপত্য বিস্তারের এই লড়াই কতটা শান্তিপূর্ণ থাকে, নাকি তা আবারও পুরোনো সংঘাতের রূপ নেয়Ñ তা নির্ধারণ করবে বিএনপি সরকারের আগামী দিনগুলোর রাজনৈতিক কৌশল এবং জামায়াতের ধৈর্যের পরিমাপ। তবে এ কথা নিশ্চিত, দীর্ঘদিনের ‘বিএনপি-জামায়াত’ অক্ষের যে চেনা সমীকরণ ছিল, তা বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে চিরতরে বিদায় নিয়েছে।

