বিএসবি গ্লোবাল নেটওয়ার্কের (ক্যামব্রিয়ান স্কুল অ্যান্ড কলেজ) মালিক এমকে খায়রুল বাশার ৩৩ কোটি টাকার সম্পদ জব্দ করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডি। আদালতের নির্দেশে সিআইডি বাশারের সম্পদ জব্দ করেন। এর আগে খায়রুল বাশারের বিরুদ্ধে উচ্চ শিক্ষার জন্য বিদেশ গমনেচ্ছুক শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে একটি মামলা হয়েছিল।
সিআইডির পুলিশ সুপার (মিডিয়া) মো. জসিম উদ্দীন খান জানান, বিএসবি গ্লোবাল নেটওয়ার্কস মালিক প্রতারক মো. খায়রুল বাশার ও তার সহযোগীদের পারস্পরিক যোগসাজশে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের আমেরিকা, কানাডাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উচ্চ শিক্ষার জন্য স্বল্প খরচে দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রেরণের চটকদার বিজ্ঞাপন দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে প্রতারণার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। এসব অর্থে নিজের নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ সম্পদ গড়ে খায়রুল বাশার। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছিল সিআইডির ফাইন্যান্সিশাল ক্রাইম ইউনিট। অভিযোগের সত্যতা পেয়ে গত বছরের ৪ মে সিআইডির পক্ষ থেকে গুলশান থানায় মানিলন্ডারিং আইনে তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছিল। মামলার পর ১৭ জুলাই ধানমন্ডি এলাকা থেকে খায়রুল বাশারকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি। পরে তাকে আদালতে হাজির করলে আদালত জেলে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
পুলিশ সুপার জসিম জানান, মামলাটির প্রাথমিক তদন্তকালে জানা যায়, অভিযুক্ত ব্যক্তি প্রতারণার মাধ্যমে অর্জিত অপরাধলব্ধ অর্থ দিয়ে বড় স্ত্রীর নামে রাজধানীর ভাটারা এলাকায় ১টি ফ্ল্যাট, ২য় স্ত্রী কানিজ ফাতেমা ওরফে ডোনার নামে শেলটেক বিথীকা প্রকল্পে ১টি ফ্ল্যাট ও নিজ নামে রাজাবাজার এলাকায় ২টি ফ্ল্যাট এবং রাজধানীর আজিজ সড়কে জি+৭তলা ও জি+৬তলা বিশিষ্ট ২টি বাড়িসহ তার নিজ নামে ও প্রতিষ্ঠানের নামে মোট ৩ হাজার ৪৮২.৫ শতাংশ ক্রয় করে। যার দলিল মূল্য প্রায় ৩৩ কোটি টাকা। সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালত আসামির নামে থাকা ওই স্থাবর সম্পত্তি ক্রোকের আদেশ প্রদান করেছে।
অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি মো. খায়রুল বাশার বাহার নিজেকে একজন শিক্ষাবিদ ও ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচয় দিলেও এর আড়ালে তিনি বিএসবি গ্লোবাল নেটওয়ার্ক নামক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের সহযোগিতায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রতারণার মাধ্যমে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় এবং বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হন। মামলাটির তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে এবং অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নামে দেশের বিভিন্ন স্থানে স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির সন্ধান করা হচ্ছে।
এর আগে গত বছরের বিএসবি গ্লোবাল নেটওয়ার্কের স্বত্বাধিকারী খায়রুল বাশার বাহারের প্রায় চার কোটি টাকার দামের তিনটি ফ্ল্যাট ক্রোক করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। গত বছরের অক্টোবর মাসে সিআইডির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ আদালত খায়রুল বাশার বাহারের নামে থাকা ওই ফ্ল্যাট ক্রোক ও রিসিভার নিয়োগের আদেশ দেন।
এর আগে প্রতারণার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে বাশারের বিরুদ্ধে গুলশান থানায় মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা করে পুলিশ। মামলায় গত ১৪ জুলাই ধর্মীয় নেতা তাকে গ্রেপ্তার করে আদালতে তোলে সিআইডি। বাশার বিএসবি গ্লোবাল নেটওয়ার্ক নামক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সংযুক্ত প্রতারক চক্রের সহযোগিতায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রতারণা করে শতকোটি টাকা হাতিয়ে নেন এবং বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হন।
সিআইডির তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে, বিএসবি গ্লোবাল নেটওয়ার্ক গ্রুপের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেমব্রিয়ান স্কুল অ্যান্ড কলেজ। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শাখা রয়েছে। এখানে হাজার হাজার শিক্ষার্থী প্রতিবছর ভর্তি হতো। এ প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের আমেরিকা-ইউরোপে বিভিন্ন নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির স্বপ্ন দেখিয়ে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অন্তত ২০০ কোটি টাকা হাতিয়ে আত্মসাৎ করার অভিযোগে ২০২৪ সালে অনুসন্ধান শুরু করে সিআইডি। এর আগে বাশারের প্রতারণার শিখার শত শত শিক্ষার্থী ও অভিভাবক তাকে গ্রেপ্তার এবং বিচারের দাবিতে মানববন্ধন এবং আন্দোলন শুরু করে। সে সময় অভিযোগ ছিল ক্যামব্রিয়ান এডুকেশন গ্রুপের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান রাজধানীর গুলশান-২ নম্বর সার্কেলের বিএসবি গ্লোবাল নেটওয়ার্ক বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য কানাডা আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া এবং পৃথিবীর উন্নত দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য প্রলোভন দেখিয়ে আমাদের থেকে বিপুল অংকের টাকা গ্রহণ করে। ওইসব কলেজের সেশন ফি বাবদ যে টাকাগুলো দেওয়া হয় তা বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে ওই কলেজের সেশন ফি প্রদান করতে হয়। কিন্তু সেটি না করে মানিলন্ডারিং আইনবহির্ভূত কাজ করে বাশার ও তার সহযোগীরা টাকাগুলো আত্মসাৎ করেছে। মূলত সেই কলেজের টাকাগুলো স্টুডেন্ট অ্যাকাউন্ট করে বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে পাঠানোর নিয়ম। কিন্তু সেটি তারা করেনি এবং বিদেশি কলেজগুলোর ভুয়া অফার লেটার তৈরি করে টাকা না পাঠিয়ে আমাদের সাথে প্রতারণা করেছে। ফলে হাজার হাজার শিক্ষার্থী বাশারকে টাকা দিয়েও বিদেশে পড়তে যেতে পারেনি। তখন ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থী হিসেবে ৮৫০ জনের নাম পাওয়া গেলেও পরে জানা যায় ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থী সংখ্যা কয়েক হাজার। আর প্রতারণা করে হাতিয়ে নেওয়া অর্থের পরিমাণ ২শ কোটি টাকারও বেশি।

