ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আয়কর রিটার্ন দাখিলে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে অর্থ আইন-২০২৬ এ। প্রথমবারের মতো আগাম আয়কর রিটার্ন দাখিলের জন্য প্রণোদনার সুযোগ রাখা হয়েছে। অপরদিকে বিলম্বে রিটার্ন দাখিলে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের জরিমানার ক্ষেত্রেও নতুন হার নির্ধারণ করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটি জানায়, গত ১ জুলাই থেকে নতুন অর্থবছরের রিটার্ন দাখিলের সময় শুরু হয়েছে, যা আগামী বছরের ৩০ জুন শেষ হবে। ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে এই সময়ের মধ্যে ২০২৫-২৬ আয়বর্ষের রিটার্ন দাখিল করতে হবে।
আয়কর আইন-২০২৩ এর ২ ধারার ৮০(ক) উপধারায়, রিটার্ন দাখিলের তারিখ নির্দিষ্ট করা হয়েছে। এতে স্বাভাবিক ব্যক্তি ও হিন্দু (অবিভক্ত) পরিবার করদাতার ক্ষেত্রে আয়বর্ষ সমাপ্তির পরবর্তী নভেম্বর মাসের ৩০তম দিন হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। অপরদিকে করপোরেট করদাতার জন্য রিটার্ন দাখিলের সময় আয়বর্ষ সমাপ্তির পরবর্তী নবম মাসের ১৫তম দিন।
সে হিসাবে করপোরেট করদাতার ক্ষেত্রে রিটার্ন দাখিলের নির্ধারিত সময় হচ্ছে ১৫ সেপ্টেম্বর। তবে উল্লেখিত দিন সরকারি ছুটির দিন হয়, তাহলে ওই দিনের অব্যবহিত পরবর্তী কর্মদিবস রিটার্ন দাখিলের শেষ দিন হিসাবে বিবেচিত হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন দাখিলে ব্যর্থ ব্যক্তি বা করপোরেট প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা গুনতে হয়। তবে সরকার প্রয়োজনে রিটার্ন দাখিলে সময় বাড়াতে পারে।
প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, প্রায় প্রতি বছরই নানা কারণে দফায় দফায় রিটার্ন দাখিলের সময় বাড়ানো হয়। গত অর্থবছরেও ব্যক্তি শ্রেণির করদাতার জন্য রিটার্ন দাখিলের মেয়াদ চার দফা বাড়ানো হয়েছে। করপোরেট প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও একাধিকবার রিটার্ন দাখিলের মেয়াদ বাড়ানো হয়। নির্দিষ্ট সময়ের পর রিটার্ন দাখিলের সময় বৃদ্ধির এক ধরনের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। ফলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রিটার্ন দাখিলে করদাতার মধ্যে এক ধরনের ঢিলেমি দেখা যায়। প্রতিবছরই দেখা যায়, শেষ সময়ে এসে সবচেয়ে বেশি রিটার্ন দাখিলের ঘটনা ঘটছে।
এমন পরিস্থিতিতে আগাম রিটার্ন দাখিলে প্রণোদনা চালু করছে এনবিআর। ব্যক্তি করদাতা ও হিন্দু অবিভক্ত পরিবারের আয়কর রিটার্ন দাখিলে পুরো করবর্ষকে ৪টি ভাগে বিভক্ত করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। অপরদিকে করপোরেট প্রতিষ্ঠানের রিটার্ন দাখিলের জন্য করবর্ষকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে।
ব্যক্তি শ্রেণির ক্ষেত্রে : নতুন বিধান অনুযায়ী, ব্যক্তি শ্রেণির করদাতা যদি ২০২৫-২৬ আয়বর্ষের রিটার্ন চলতি করবর্ষের ১ জুলাই থেকে ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে দাখিল করেন তাহলে তিনি করছাড় সুবিধা পাবেন। এ সময়ে যিনি আয়কর রিটার্ন দাখিল করবেন তিনি আদায়যোগ্য করের ৫ শতাংশ কিংবা ২৫ হাজার মধ্যে যেটি কম; সেটি পাবেন।
১ অক্টোবর থেকে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে যেসব ব্যক্তি করদাতা আয়কর রিটার্ন দাখিল করবেন তারা নিয়মিত করদাতা হিসাবে বিবেচিত হবেন। এ সময়ে যারা রিটার্ন দাখিল করবেন তারা করছাড় সুবিধা যেমন পাবেন না, তেমনি জরিমানাও গুনতে হবে না। তবে ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মার্চ সময়ে যেসব করদাতা রিটার্ন দাখিল করবেন তাদের জরিমানা গুনতে হবে।
জরিমানার পরিমাণ হবে আদায়যোগ্য করের ২ শতাংশ কিংবা ৩ হাজার টাকার মধ্যে যেটি সর্বোচ্চ। সবশেষ ১ এপ্রিল থেকে ৩০ জুন সময়ের মধ্যে রিটার্ন দাখিলকারীকে আদায়যোগ্য করের ৫ শতাংশ কিংবা ৫ হাজার টাকার মধ্যে যেটি সর্বোচ্চ তা পরিশোধ করতে হবে। নির্দিষ্ট সময়ে রিটার্ন জমা দিতে ব্যর্থ ব্যক্তি করদাতাদের জন্য আগেও জরিমানার বিধান ছিল। বিলম্বের জন্য ১ হাজার টাকা এবং প্রতিদিনের জন্য ৫০ টাকা হারে জরিমানা ধার্য করা ছিল।
করপোরেট করের ক্ষেত্রে : যদি কোনো করপোরেট প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়ের ২ মাস আগে রিটার্ন দাখিল করে তাহলে পরিশোধযোগ্য করের ৫ শতাংশ বা ২৫ হাজার টাকার মধ্যে যেটি কম, সে পরিমাণ করছাড় সুবিধা পাবে। অপরদিকে নির্ধারিত সময়ের ২ মাসের মধ্যে রিটার্ন দাখিলের জন্য কোনো ধরনের করছাড় সুবিধা বা জরিমানা গুনতে হবে না। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের পর কিন্তু মূল্যায়ন বর্ষের মধ্যে রিটার্ন দাখিল করলে পরিশোধযোগ্য করের ২ শতাংশ কিংবা ২৫ হাজার টাকার মধ্যে যেটি সর্বোচ্চ সে পরিমাণ অর্থ জরিমানা গুনতে হবে।
বাংলাদেশে সাধারণত ব্যাংক, বিমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানবহির্ভূত কোম্পানিগুলোর আয়বর্ষ ৩০ জুনে সমাপ্ত হয়। সে হিসাবে কর প্রণোদনা পেতে হলে কোম্পানিগুলোকে ১ জুলাই থেকে ১৫ জুলাইয়ের মধ্যে আয়কর রিটার্ন দাখিল করতে হবে। ব্যাংক, বিমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আয়বর্ষ সমাপ্ত হয় ৩০ ডিসেম্বর।

