ঢাকা সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২৬

বন্যায় স্বাস্থ্যঝুঁকি ও করণীয়

রূপালী ডেস্ক
প্রকাশিত: জুলাই ১৩, ২০২৬, ০৬:১৫ এএম

টানা অতিবৃষ্টি এবং পাহাড়ি ঢলের কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তাতে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। এই সময়ে সুস্থ থাকার প্রথম শর্ত হলো বিশুদ্ধ পানির ব্যবহার। যেকোনো গৃহস্থালি কাজ ও পানের জন্য পানি অন্তত ৩০ মিনিট ফুটিয়ে ঠান্ডা করে নিতে হবে। বন্যার পানিতে টিউবওয়েল তলিয়ে গেলে এক কলস পানিতে তিন-চার চা চামচ ব্লিচিং পাউডার মিশিয়ে তা টিউবওয়েলের ভেতর ঢেলে দিতে হবে এবং আধা ঘণ্টা পর একটানা আরও আধা ঘণ্টা চেপে পানি বের করে ফেলে দিতে হবে। যদি পানি ফোটানোর কোনো সুযোগ না থাকে, তবে প্রতি দেড় লিটার খাবার পানিতে ৭.৫ মিলিগ্রাম, তিন লিটার পানিতে ১৫ মিলিগ্রাম অথবা ১০ লিটার পানিতে ৫০ মিলিগ্রাম হ্যালোজেন বা হ্যালো ট্যাব আধা থেকে এক ঘণ্টা ভিজিয়ে রেখে পানি পানের উপযোগী করতে হবে।

বন্যাদুর্গত এলাকায় সবচেয়ে বড় স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখা দেয় ডায়রিয়া। এই রোগ থেকে বাঁচতে খাওয়ার আগে এবং মলত্যাগের পর সাবান বা ছাই দিয়ে হাত ভালোভাবে পরিষ্কার করা বাধ্যতামূলক। ডায়রিয়া দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরিমাণমতো খাওয়ার স্যালাইন খেতে হবে। দুই বছরের কম বয়সি শিশুকে প্রতিবার পাতলা পায়খানার পর ১০-১২ চা চামচ এবং ২ থেকে ১০ বছরের শিশুকে ২০ থেকে ৪০ চা চামচ খাওয়ার স্যালাইন দিতে হবে। ঘরে স্যালাইন না থাকলে বিকল্প হিসেবে লবণ-গুড়ের শরবত, ভাতের মাড় কিংবা চিঁড়ার পানি খাওয়ানো যেতে পারে। সেই সঙ্গে শিশুদের পুষ্টিহীনতা রোধে খিচুড়ি এবং চিকিৎসকের পরামর্শে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো উচিত। তবে বমি ও পাতলা পায়খানার মাত্রা অতিরিক্ত বেড়ে গেলে রোগীকে দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যেতে হবে।

বন্যায় রান্নার সংকটের কারণে অনেকেই বাসি বা পচা খাবার খেতে বাধ্য হন, যা পরিপাকতন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি করে। এই সময়ে পুষ্টিকর ও সহজে প্রস্তুতযোগ্য খাবার হিসেবে খিচুড়ি খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে উপযোগী। খাবার গ্রহণের আগে প্লেট ও বাসনপত্র অবশ্যই সাবান ও নিরাপদ পানি দিয়ে ধুয়ে নিতে হবে। অনেকে পানি বাঁচানোর জন্য প্রথমে সাধারণ বা নোংরা পানিতে থালা-বাসন ধুয়ে পরে ফুটানো পানি দিয়ে তা পরিষ্কার করেন, যা একেবারেই ঠিক নয়। এই ভুল অভ্যাসের কারণে বাসনপত্রে উল্টো আরও নানা ধরনের জীবাণু ছড়িয়ে পড়ে। তাই সব সময় থালা-বাসন ধোয়ার ক্ষেত্রে শুরু থেকেই নিরাপদ পানি ব্যবহার করা উচিত।

বন্যার দিনগুলোতে চারদিকে পানি থইথই করায় বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনা, পানিতে ডুবে যাওয়া এবং বিষাক্ত পোকামাকড় বা সাপের কামড়ের মতো বড় বড় দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। কোথাও কোনো বৈদ্যুতিক তার ছিঁড়ে পানিতে পড়ে থাকতে দেখলে ভুলেও তা স্পর্শ করা যাবে না এবং দ্রুত বিদ্যুৎকর্মীদের জানাতে হবে। অন্যদিকে বন্যার কারণে সাপ ও ইঁদুর নিজেদের আবাসন হারিয়ে শুকনো স্থানে মানুষের সঙ্গে আশ্রয় নেয়, ফলে এদের কামড়ানোর ঝুঁঁকি বেড়ে যায়। যদি কোনো বিষধর সাপে কাটে, তবে আক্রান্ত স্থানের কিছুটা ওপরে মোটা কাপড় বা রশি দিয়ে শক্ত করে গিঁট দিয়ে রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে এবং জরুরি ভিত্তিতে অ্যান্টিভেনম দিতে হবে। ইঁদুরে কাটলেও কোনো ধরনের অবহেলা না করে দ্রুত ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি।

বন্যাদুর্গত অঞ্চলে স্যানিটেশন-ব্যবস্থার চরম বিপর্যয় ঘটে, যার ফলে অনেকে যেখানে-সেখানে মলত্যাগ করেন। এই অভ্যাস পেটের পীড়া ও কৃমির সংক্রমণ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। তাই কষ্ট হলেও একটি নির্দিষ্ট ও নিরাপদ স্থানে মলত্যাগ করতে হবে এবং এরপর সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নিতে হবে। খালি পায়ে মলত্যাগ করতে গেলে বক্রকৃমির জীবাণু সহজে শরীরে প্রবেশ করতে পারে, তাই সব সময় পায়ে জুতা বা স্যান্ডেল থাকা আবশ্যক। বন্যা চলাকালে এবং বন্যা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাওয়ার পর পরিবারের সবাইকে (দুই বছরের নিচের শিশু ছাড়া) এবং নিজেদের গবাদি পশুকে নিয়মিত কৃমিনাশক ওষুধ খাওয়াতে হবে। পাশাপাশি চারপাশের পরিবেশ ও পরজীবীর বিস্তার রোধে প্রতি চার থেকে ছয় মাস পর পর এই কৃমিনাশক ব্যবহারের অভ্যাস বজায় রাখা জরুরি।