দেশে সাম্প্রতিক সময়ের অতিবৃষ্টির কারণে সৃষ্ট বন্যা ও পাহাড় ধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৮। আর দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ১২ লাখ ছাড়িয়ে যাওয়ার তথ্য দিয়েছে দুর্যোগ ব্যবাস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। এদিকে, চলমান বন্যায় চট্টগ্রাম জেলার সড়কগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পানি নেমে যাওয়ার পরও যোগাযোগ ও যাতায়াত নিয়ে চরম ভোগান্তির মধ্যে পড়েছেন এ অঞ্চলের গ্রামীণ জনপদের মানুষ।
গতকাল বৃহস্পতিবার মন্ত্রণালয়ের বন্যা সম্পর্কিত সবশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের ৫৭টি উপজেলার ৩৬২টি ইউনিয়ন ও আটটি পৌরসভা এখন বন্যাকবলিত। এতে মোট ১২ লাখ ১৬ হাজার ৮০৫ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং পানিবন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে ৫২ হাজার ৪৯৩টি পরিবার। গত ৫ জুলাই রাত থেকে টানা পাঁচ দিনের অতিভারি বর্ষণে দেশের ৪৩টি জেলার বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়। বন্যার কবলে পড়ে চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের সাত জেলা। এ ছাড়া চট্টগ্রাম বিভাগে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রাকৃতিক এই দুর্যোগে এখন পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে ৫৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৩২ জনের মৃত্যু হয়েছে কক্সবাজারে, যার মধ্যে ১৯ জন স্থানীয় বাসিন্দা এবং ১৩ জন রোহিঙ্গা শরণার্থী। এ ছাড়া চট্টগ্রামে ১৫ জন, বান্দরবানে সাতজন, রাঙামাটিতে তিনজন এবং মৌলভীবাজারে একজনের প্রাণহানি ঘটেছে। একই সঙ্গে দুর্যোগে খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম মিলিয়ে মোট ৪০ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে এবং কক্সবাজারে একজন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। আহতদের মধ্যেও সবচেয়ে বেশি কক্সবাজারের, ২৫ জন। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর মধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগে ১৬টি উপজেলায় আংশিক জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে, যেখানে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ও মৃত্যুর হার উদ্বেগজনক। দুর্গত মানুষদের সহায়তার জন্য ৮৭টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে, যেখানে বর্তমানে ৮৪৯ জন গৃহহীন মানুষ অবস্থান করছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারের পক্ষ থেকে দুর্গত সাতটি জেলাসহ সারা দেশে এ পর্যন্ত ৫ কোটি ১৫ লাখ টাকা নগদ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ৯ হাজার ৫০ টন চাল এবং ৪ হাজার ২০০ বান্ডিল ঢেউ টিনসহ গৃহনির্মাণ মঞ্জুরি হিসেবে এক কোটি ২৬ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। একই সঙ্গে খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম জেলায় প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকেও বিশেষ আর্থিক সহায়তা (প্রতি জেলায় ২০ লাখ টাকা করে) দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, জেলার ১৫ উপজেলার অন্তত ৫৮২ গ্রামীণ সড়কের প্রায় ৩৯১ কিলোমিটার অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া প্রায় ১৮০ সেতু, কালভার্ট, স্লুইসগেট ও অন্যান্য কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে দক্ষিণ চট্টগ্রামের উপজেলাগুলোতে। সেখানে বন্যার পানির তীব্র স্রোতে সড়কগুলোর নিচের মাটি পর্যন্ত ধুয়ে গেছে। এতে অনেক গ্রাম যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
এলজিইডির তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলার মধ্যে রয়েছে সাতকানিয়া, বাঁশখালী, চন্দনাইশ, আনোয়ারা ও লোহাগাড়া। ২৯টি স্থানে সড়ক ভেঙে যাওয়ার পর জরুরি মেরামত কাজ শুরু করা হয়। সাতকানিয়ায় ৪০টি সড়কের প্রায় ২৫ কিলোমিটার অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি সড়কের কিছু অংশ ধসে পড়ায় ৬টি সড়ক এখনো ব্যবহারের অনুপযোগী। বাঁশখালীতে প্রাথমিক পরিদর্শনে ৬০টি সড়কের প্রায় ১১০ কিলোমিটারজুড়ে ক্ষতিগ্রস্তের তথ্য পাওয়া গেছে।
এদিকে সম্প্রতি সাতকানিয়া উপজেলার মৌলভীর দোকান-ত্রিমোহনী সড়ক এবং দস্তিজার হাট-কেঁওচিয়া উচ্চ বিদ্যালয় সড়ক ঘুরে দেখা যায়, বন্যার ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন হিসেবে সড়কের অনেক জায়গায় বিশাল গর্ত তৈরি হয়েছে। অনেক স্থানে সড়কের ধসে পড়া অংশ, হেলে পড়া সেতু, গ্রামীণ সড়কের উপড়ে থাকা ইট ও ক্ষতিগ্রস্ত পিচঢালা রাস্তা দেখা গেছে।
সাতকানিয়ার কেঁওচিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা বেলাল উদ্দিন বলেন, বন্যার পানি নেমে গেছে। কিন্তু যাতায়াত এখনো বেশ কঠিন অবস্থায় রয়েছে। আমাদের ভাঙা সড়ক হেঁটে পার হতে হচ্ছে। বাজার কিংবা হাসপাতালে যেতে দীর্ঘ পথ ঘুরতে হচ্ছে। মোটরসাইকেলেও কিছু সড়কে যাওয়া যাচ্ছে না। পরিবহন শ্রমিকরা জানান, রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় মানুষ ও পণ্যবাহী যানবাহন খুবই ধীরগতিতে চলছে।
বাঁশখালী ও আনোয়ারায় চলাচলকারী পিকআপ ভ্যানচালক আল আমিন বলেন, রাস্তাঘাট মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। এ কারণে গাড়িতে পণ্যের পরিমাণ কমাতে হচ্ছে। কিছু রাস্তা তো বন্ধ। আবার যেগুলো চালু আছে, সেগুলোর অবস্থা এতই খারাপ যে আমাদের খুব ধীরে গাড়ি চালাতে হচ্ছে। যে পথ পাড়ি দিতে আগে ৩০ মিনিট লাগত, এখন সেখানে এক ঘণ্টার বেশি সময় লাগছে।
এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন বলেন, বন্যার পর এ পর্যন্ত সড়কের যে ক্ষতি হয়েছে টাকায় তার ক্ষতির পরিমাণ হবে প্রায় ১৮০ কোটি। এখনো পর্যন্ত আমরা ৫৮২ সড়কের ৩৯১ কিলোমিটার অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হিসেবে চিহ্নিত করেছি। এটি আরও বাড়তে পারে, কারণ বন্যাদুর্গত কিছু এলাকার রাস্তা এখনো পানির নিচে। পুরো এলাকার খবর নেওয়া এখনো সম্ভব হয়নি। ইতোমধ্যে মেরামত কাজ শুরু হয়েছে। আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া সড়কগুলো সচল করা। এরপর স্থায়ী পুনর্নির্মাণের কাজ শুরু হবে।
বন্যায় জাতীয় ও আঞ্চলিক সড়কও ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ) সূত্রে জানা গেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছে চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক বিভাগের সড়কগুলো। সেখানে প্রায় ৭৪ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম সড়ক বিভাগের অন্তত ৫২ কিলোমিটার ক্ষতিগ্রস্তের কথা জানা গেছে। চট্টগ্রাম সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোসলেম উদ্দিন চৌধুরী বলেন, সড়ক যোগাযোগ সচল রাখা এখন জেলার অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। দ্রুততম সময়ের মধ্যে যোগাযোগ সচল করতে কাজ শুরু করা হয়েছে।
স্কুল-কলেজে ক্ষয়ক্ষতি : বন্যায় জেলার ৩৮৭ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, কিছু স্কুলের শ্রেণিকক্ষ ও সীমানা প্রাচীর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, আবার কিছু স্কুল বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
চট্টগ্রামের সহকারী জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা সৈয়দ মোহাম্মদ আব্দুল মান্নান বলেন, স্থানীয় স্কুল কর্তৃপক্ষকে তাদের এলাকার পরিস্থিতি বিবেচনা করে ক্লাস ও পরীক্ষা কবে থেকে শুরু করা যাবে তা নির্ধারণ করতে বলা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানভেদে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ভিন্ন এবং বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক অবস্থার কথাও আমাদের বিবেচনা করতে হবে।
কৃষি-মৎস্য খাত : কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম জেলায় ১৫ হাজার ৯১০ হেক্টর কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৯ হাজার ৪৩ হেক্টর আউশ ধান, ৫ হাজার ৯০৭ হেক্টর গ্রীষ্মকালীন সবজি এবং ৯৬০ হেক্টর আমন বীজতলা রয়েছে। চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য অফিস জানিয়েছে, এবারের বন্যায় ৩২০ বাণিজ্যিক মৎস্য খামারসহ ১২ হাজার ২৫১ জলাশয় প্লাবিত হয়েছে। এতে আনুমানিক ১০৯ কোটি ২৩ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।

