ঢাকা শুক্রবার, ১৭ জুলাই, ২০২৬

বিষাক্ত বাতাসে মৃত্যুর মিছিল

হাসান মাহমুদ
প্রকাশিত: জুলাই ১৭, ২০২৬, ০৩:১০ এএম

বাংলাদেশে বায়ুদূষণ এখন আর কেবল ধুলোবালি বা ধোঁয়ার সমস্যা নয়, বরং এটি নাগরিকদের জন্য একটি ‘নীরব ঘাতক’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে, বায়ুতে বিদ্যমান ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র ধূলিকণার (পিএম ২.৫) কারণে বছরে দেশে প্রায় ৮৮ হাজার ২৪০ জনের অকালমৃত্যু ঘটছে। অর্থাৎ, প্রতিদিন গড়ে ২৪২ জন বায়ুদূষণের কারণে প্রাণ হারাচ্ছে। একই সঙ্গে বায়ুদূষণের কারণে বছরে প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা (২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে, যা বাংলাদেশের মোট জিডিপির প্রায় ৫ শতাংশের সমান। এই পরিস্থিতি শুধু জনস্বাস্থ্যকেই হুমকির মুখে ফেলছে না, বরং দেশের অর্থনীতিতেও ফেলেছে বড় ধরনের ধস।

গবেষণার নাম ও বিষয়বস্তু : গবেষকেরা গবেষণাটির শিরোনাম দিয়েছেন ‘দ্য ইকোনমিক কস্ট অব এয়ার পলিউশন ইন বাংলাদেশ : আ হেলথ অ্যান্ড ইকোনমিক ইমপ্যাক্ট অ্যানালাইসিস’। সম্প্রতি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত জার্নাল ‘পলিউশন’-এ প্রকাশিত এই গবেষণার মূল লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের প্রধান ছয়টি শহরের বায়ুর মান, দূষণজনিত মৃত্যু এবং এর ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক ক্ষতির একটি সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরা। গবেষণাটি বায়ুদূষণকে কেবল পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে নয়, বরং একটি জাতীয় অর্থনৈতিক বিপর্যয় হিসেবে বিশ্লেষণ করেছে।

গবেষণা দল ও নেতৃত্ব : জাবি পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগের ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ, এয়ার কোয়ালিটি অ্যান্ড হেলথ রিসার্চ (সি২এএইচআর) ইউনিট’ এই গবেষণা পরিচালনা করেছে। গবেষণা দলের নেতৃত্বে ছিলেন বিভাগের চেয়ারম্যান ও সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. সাখাওয়াত হোসেন। তার সঙ্গে গবেষক দলে ছিলেনÑ সায়েদ মোহাম্মদ রাসেল, আফসানা আক্তার, তারেকুল ইসলাম, মো. জিয়াউল হক, মো. ইকবাল কবির, কুই গুও, জেমস এ হল, সুজানে ই বার্টিংটন এবং জংবো শি।

তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি : গবেষণাটি ২০১৩ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৯ বছরের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট ও বরিশালÑ এই ছয়টি প্রধান শহরের বায়ুর গুণমান পর্যবেক্ষণ এবং স্বাস্থ্যগত পরিসংখ্যানের সমন্বয়ে এ তথ্য সংগ্রহ করা হয়। মূলত পিএম ২.৫-এর ঘনত্ব এবং এর কারণে সৃষ্ট বিভিন্ন রোগের প্রকোপের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেই অকালমৃত্যু ও অর্থনৈতিক ক্ষতির এই পরিসংখ্যান নির্ধারণ করা হয়েছে।

গবেষণার নতুন পরিভাষা : গবেষণার প্রধান আলোচিত বিষয়বস্তু হলো পিএম ২.৫। এটি হলো বাতাসের এমন এক ধরনের সূক্ষ্ম কণা, যার ব্যাস ২.৫ মাইক্রোমিটারের চেয়ে কম। সাধারণ ধূলিকণার চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতিকর এই কণাগুলো মানুষের ফুসফুসের গভীরে প্রবেশ করতে পারে এবং সরাসরি রক্তপ্রবাহে মিশে যেতে পারে। গবেষণায় একে ‘অদৃশ্য ঘাতক’ বলা হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদি হৃদরোগ, শ্বাসকষ্ট ও ফুসফুসের ক্যানসারের প্রধান নিয়ামক।

গবেষণার ফলাফল : গবেষণার তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৮৮ হাজার ২৪০ জনের অকালমৃত্যুর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে ৩৭ হাজার ৫১৯ জন হৃদরোগে, ৮ হাজার ৩৪৪ জন দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের রোগে এবং ৮১১ জন ফুসফুসের ক্যানসারে মারা গেছেন। তবে অকালমৃত্যুর এই তালিকার বাকি প্রায় ৪১ হাজার ৫৬৬ জনের মৃত্যু মূলত বায়ুদূষণের কারণে সৃষ্ট অন্যান্য জটিল শারীরিক সমস্যার ফলাফল। সূক্ষ্ম ধূলিকণা পিএম ২.৫ রক্তের মাধ্যমে পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ায় এটি স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়, যা অকালমৃত্যুর অন্যতম বড় কারণ। এ ছাড়া অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, তীব্র নিউমোনিয়াসহ শ্বাসযন্ত্রের বিভিন্ন সংক্রমণ, নবজাতকের জন্মগত জটিলতা, উচ্চ রক্তচাপ এবং বিভিন্ন প্রদাহজনিত হৃদযন্ত্রের ব্যর্থতা ও কিডনি-সংক্রান্ত জটিলতায় আক্রান্ত হয়েও বিপুলসংখ্যক মানুষ অকালে প্রাণ হারাচ্ছে। মূলত, বায়ুদূষণ মানবদেহের রোগ প্রতিরোধক্ষমতাকে এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে যে, অন্যান্য বিদ্যমান স্বাস্থ্যগত ঝুঁকিগুলো দ্রুত প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে, যা সামগ্রিক অকালমৃত্যুর পরিসংখ্যানকে ভয়াবহ পর্যায়ে নিয়ে গেছে।

পিএম ২.৫ দূষণে শহরভিত্তিক অকালমৃত্যুর পরিসংখ্যানে ঢাকা শহর সবচেয়ে ঝুঁকির মুখে, যেখানে অকালমৃত্যুর সংখ্যা ৬৮ হাজার ৭০৩। এ ছাড়া চট্টগ্রামে ১১ হাজার ২০২ জন, রাজশাহীতে ২ হাজার ৮২৭ জন, খুলনায় ২ হাজার ৬২৫ জন, সিলেটে ১ হাজার ৪৮৮ জন এবং বরিশালে ১ হাজার ৩৯৫ জন মৃত্যুর হার উদ্বেগজনক। ঢাকা শহরে প্রতি বছর গড়ে ৩ হাজার ৪৮৪ জনের মৃত্যু এই দূষণের সঙ্গে সম্পর্কিত।

অর্থনৈতিক ক্ষতির চিত্র : গবেষণার সবচেয়ে চমকপ্রদ ও ভীতিজনক তথ্য হলো অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ। বায়ুদূষণের কারণে বছরে প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা (প্রায় ২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের) ক্ষতি হচ্ছে, যা বাংলাদেশের মোট জিডিপির প্রায় ৫ শতাংশ। মূলত স্বাস্থ্যসেবা খাতের ব্যয় বৃদ্ধি, অকালমৃত্যুর কারণে উৎপাদনশীল জনশক্তি হারানো এবং কর্মঘণ্টা কমে যাওয়ায় এই বিপুল আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে।

গবেষকদের বক্তব্য : গবেষণার প্রধান গবেষক ড. মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘আমরা প্রায়ই বায়ুদূষণকে শুধু পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে দেখি। কিন্তু আমাদের গবেষণা বলছে, এর ফলে বছরে ৮৮ হাজার অকালমৃত্যু এবং জিডিপির ৫ শতাংশ সমপরিমাণ অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যগত ও অর্থনৈতিক ক্ষতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। তিনি আরও জানান, এই পরিস্থিতি উন্নয়নের গতিকে স্থবির করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।

উত্তরণের উপায় : গবেষণায় এই বিপর্যয় মোকাবিলায় কয়েকটি কার্যকর সমাধানের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সেগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) বায়ুর গুণগত মান নির্দেশিকা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা; উৎসস্থলে পিএম ২.৫ নির্গমন কমানোর জন্য কঠোর আইন প্রয়োগ করা (যেমনÑ ইটের ভাটা নিয়ন্ত্রণ, শিল্পকারখানার নির্গমন ফিল্টার); নগরাঞ্চলে সমন্বিত ও প্রমাণভিত্তিক বায়ুমান ব্যবস্থাপনা নীতিমালা গ্রহণ করা; জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের সমন্বিত উদ্যোগ।