ওজন কমানোর ক্ষেত্রে কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা জাতীয় খাবারকে সবসময় ভিলেন হিসেবে দেখানো হলেও গবেষক ও পুষ্টিবিদরা বলছেন ভিন্ন কথা। নিউইয়র্ক নিউট্রিশন গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা লিসা মস্কোভিৎসের মতে, শর্করা খেলেই তা সরাসরি চর্বিতে রূপান্তর হয় না। এটি আমাদের শরীরের মূল জ্বালানি, তবে প্রয়োজনের অতিরিক্ত খেলে তখন তা চর্বি হিসেবে জমা হয়। অন্যদিকে ভিডা’র ক্লিনিক্যাল ডায়েটেটিক্সের সিনিয়র ডিরেক্টর লরা আইজ্যাকসন জানান, পেটের মেদ কমানোর মূল চাবিকাঠি শর্করা পুরোপুরি বর্জন করা নয়, বরং সঠিক ও পুষ্টিকর শর্করা বেছে নেওয়া। পুষ্টিবিদরা বলেছেন, পেটের মেদ রাতারাতি কমিয়ে দেবে এমন কোনো জাদুকরী খাবার পৃথিবীতে নেই, বরং সঠিক খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনযাত্রার কিছু পরিবর্তনই কেবল এই ভিসেরাল ফ্যাট বা পেটের ভেতরের বিপজ্জনক চর্বি কমাতে সাহায্য করতে পারে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের খাদ্যাভ্যাস (মেডিটেরেনিয়ান ডায়েট) মেনে চলেন এবং শারীরিক পরিশ্রম বাড়ান, তাদের শরীরের সামগ্রিক চর্বি ও পেটের মেদ অন্য যেকোনো ডায়েটের তুলনায় অনেক দ্রুত কমে।
পেটের মেদ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুষ্টিবিদরা প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় বেশকিছু সাধারণ কিন্তু কার্যকরী খাবার রাখার পরামর্শ দেন। এর মধ্যে রয়েছে শসা, পালং শাক, ব্রকলি ও ফুলকপির মতো কম ক্যালোরিযুক্ত এবং উচ্চ ফাইবার সমৃদ্ধ নন-স্টার্চি বা শ্বেতসারহীন সবজি, যা শরীরকে হাইড্রেটেড রাখতেও সাহায্য করে। এ ছাড়া মসুর ডাল ও শিমের মতো ডাল জাতীয় খাবার রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ বেড়ে যাওয়া রোধ করে এবং দীর্ঘ সময় পেট ভরিয়ে রাখে। বাদামি চাল, ওটস ও লাল আটার মতো গোটা শস্যে থাকা ফাইবার পেটের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার যতœ নেয়, যা মেদ জমার প্রক্রিয়াকে ধীর করে দেয়। পাশাপাশি গ্রিক ইয়োগার্টের মতো প্রোবায়োটিক সমৃদ্ধ খাবার হজমশক্তি বাড়ায় এবং পেট ফাঁপা কমায়। কাঠবাদাম, আখরোট ও চিয়া সিডের মতো বাদাম ও বীজ জাতীয় খাবার ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে এবং পেটের মেদ সৃষ্টিকারী প্রদাহ কমায়। ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডসমৃদ্ধ চর্বিযুক্ত মাছ যেমনÑ স্যামন বা টুনা পেশি গঠনে ও মেদ পোড়াতে অত্যন্ত কার্যকরী। গ্রিন টি’তে থাকা বিশেষ অ্যান্টিঅক্সিডেন্টও মেদ জমার প্রক্রিয়াকে কিছুটা ধীর করতে ভূমিকা রাখে।
খাদ্যাভ্যাসের পাশাপাশি জীবনযাত্রার কিছু গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাস পেটের জেদি মেদ কমাতে সমানভাবে ভূমিকা রাখে। নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, বিশেষ করে হাই-ইনটেনসিটি ইন্টারভাল ট্রেনিং কিংবা প্রতিদিন নিয়ম করে হাঁটা পেটের চর্বি কমাতে দারুণ কার্যকর। অতিরিক্ত মানসিক চাপ ও কম ঘুমের কারণে শরীরে কর্টিসল নামক হরমোন বৃদ্ধি পায়, যা সরাসরি পেটে চর্বি জমার জন্য দায়ী; তাই দৈনিক পর্যাপ্ত ঘুম এবং মানসিক চাপ মুক্ত থাকা অত্যন্ত জরুরি। অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণ চর্বি পোড়ানোর প্রক্রিয়াকে ধীর করে দেয় এবং ক্যালোরির পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়, তাই এটি এড়িয়ে চলাই শ্রেয়। শরীর থেকে চর্বি ভেঙে শক্তি উৎপাদনের প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার জন্য প্রচুর পানি পান করা আবশ্যক। পুষ্টিবিদরা নতুনদের জন্য পরামর্শ দিয়ে বলেন, সব পরিবর্তন একসঙ্গে না করে শুরুতে সকালে প্রোটিন ও পানির পরিমাণ বাড়ানো, রাতে খাবারে ফাইবার যুক্ত করা, নিয়মিত হাঁটা এবং মিষ্টি জাতীয় পানীয় পুরোপুরি বর্জন করার মাধ্যমেই পেটের অতিরিক্ত মেদ কমানোর যাত্রা শুরু করা সম্ভব।

