চট্টগ্রাম নগরীতে ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল ডট নেটের (ডিডিএন) কার্যালয়ে দিনদুপুরে সংঘটিত হামলা, ভাঙচুর ও ৩৫ লাখ টাকা লুটের ঘটনার নেপথ্যে শীর্ষ সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ‘ডেভিড ইমনে’র সম্পৃক্ততার তথ্য পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। র্যাব ও পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে, ডেভিড ইমনের নির্দেশেই তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী মাইকেল, সানি ও রাজুর নেতৃত্বে পরিকল্পিতভাবে এই হামলা চালানো হয়। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ২২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, গত ১১ জুলাই ডিডিএনের স্বত্বাধিকারী আদিল বিন মামুনের ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপে বিদেশি নম্বর ব্যবহার করে ‘ডেভিড ইমন’ পরিচয়ে এক ব্যক্তি ফোন দেন। তিনি এককালীন দুই কোটি টাকা এবং প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানো হলে ১৩ জুলাই দুপুরে ৩০ থেকে ৪০ জনের একটি সশস্ত্র দল নগরীর বাকলিয়া এক্সেস রোডে অবস্থিত ডিডিএনের কার্যালয়ে হামলা চালায়।
হামলাকারীরা অফিসের আসবাবপত্র, কম্পিউটার, সার্ভার, মনিটর ও ল্যাপটপ ভাঙচুরের পাশাপাশি কর্মচারীদের বেতন পরিশোধের জন্য রাখা ৩৫ লাখ টাকা লুটে নিয়ে যায়। প্রকাশ্য দিবালোকে সংঘটিত এ হামলার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়।
ঘটনার পর ডিডিএনের ব্যবস্থাপক চকবাজার থানায় ৩০ থেকে ৪০ জন অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করে মামলা করেন। এরপর র্যাব, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যৌথভাবে অভিযান শুরু করে। এ পর্যন্ত বিভিন্ন অভিযানে মোট ২২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। হামলায় ব্যবহৃত চারটি দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার, একটি অ্যাম্বুলেন্স জব্দ এবং এর চালককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
র্যাব-৭-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ হাফিজুর রহমান জানান, মাইকেল, সানি ও রাজুই হামলার মূল সংগঠক। ডেভিড ইমনের নির্দেশে তারা বাকলিয়া, চকবাজার, বহদ্দারহাট, রাউজান ও হবিগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা থেকে ৩০ থেকে ৪০ তরুণকে জড়ো করে হামলায় অংশ নিতে নিয়ে আসে। হামলায় অংশ নেওয়া প্রত্যেককে ৫০০ টাকা করে দেওয়া হয়। তাদের অনেকেই কোথায় এবং কেন হামলা করতে যাচ্ছেÑ সে বিষয়েও অবগত ছিল না।
র্যাবের হাতে থাকা একটি ভিডিও ক্লিপে দেখা যায়, ঘটনার দিন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে হামলাকারীরা একত্রিত হয়। সেখানে মাইকেল হামলার কৌশল, প্রবেশ ও নিরাপদে ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা সম্পর্কে তাদের ব্রিফ করেন। পরে সিসিটিভি ফুটেজ এবং ওই ভিডিও বিশ্লেষণ করে হামলায় সরাসরি অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের শনাক্ত করা হয়।
র্যাব জানায়, হামলার জন্য ভাড়া করা তরুণদের প্রথমে বহদ্দারহাটে জড়ো করা হয়। পরে তাদের তিন ভাগে ভাগ করে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়। একটি দল আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণের দায়িত্বে ছিল, আরেকটি দল ব্যাকআপ হিসেবে আশপাশে অবস্থান নেয়। মূল দলটি ডিডিএনের কার্যালয়ে ঢুকে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। হামলা শেষে সানি প্রত্যেক অংশগ্রহণকারীকে ৫০০ টাকা করে পরিশোধ করেন।
এ ঘটনায় র্যাব সর্বশেষ মাইকেল রোহেন মিয়াসহ ৯ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। তারা হলেনÑ তুহিন, আকবর হোসেন, আব্দুল মুমিন, মাসাদ মিয়া, দিদার মিয়া, সানজাত হাসান, সৈকত হোসেন ও সাইফুদ্দিন। এর আগে পুলিশও একই ঘটনায় আটজনকে গ্রেপ্তার করে।
তদন্তকারী সংস্থার একাধিক সূত্র জানায়, মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমন দীর্ঘদিন ধরে হোয়াটসঅ্যাপ কল ও বার্তার মাধ্যমে ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করে আসছেন। দাবি পূরণ না হলে হামলা ও গুলিবর্ষণের মতো সহিংস ঘটনার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। চলতি বছরের শুরুতে চন্দনপুরা এলাকায় একটি ব্যবসায়ী গ্রুপের বাসা এবং স্মার্ট গ্রুপের কার্যালয়ে গুলিবর্ষণের ঘটনায়ও তার সম্পৃক্ততার তথ্য পেয়েছে তদন্তকারী সংস্থাগুলো। এদিকে তার কয়েকজন সহযোগী গ্রেপ্তার হলেও ডেভিড ইমন পলাতক।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের জনসংযোগ কর্মকর্তা আমিনুর রশিদ বলেন, ডিডিএন কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় ডেভিড ইমনের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। গ্রেপ্তারদের দেওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তদন্তে যার সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে, তাকে আইনের আওতায় আনা হবে।

