সমুদ্রের অতল গভীরে রাজত্ব করা হাঙরকে আমরা সাধারণত রক্তপিপাসু ও হিংস্র শিকারি হিসেবেই চিনি। কিন্তু বিজ্ঞান বলছে, এই প্রাচীন জলজ প্রাণীদের সম্পর্কে আমাদের ধারণা খুবই সীমিত। কোটি কোটি বছরের বিবর্তনের মধ্য দিয়ে হাঙর এমন কিছু অদ্ভুত ও বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছে, যা শুনলে চমকে উঠতে হয়। মানুষের মতোই এদের কিছু অদ্ভুত পছন্দ ও শারীরিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। সম্প্রতি বিজ্ঞানীদের গবেষণায় হাঙর সম্পর্কে ৯টি অসাধারণ তথ্য সামনে এসেছে :
পৃথিবী ধ্বংসের মুখে পড়লেও টিকে থাকে হাঙর : পৃথিবীর ইতিহাসে পাঁচটি বড় গণবিলুপ্তির সব কটি থেকেই বেঁচে ফিরেছে হাঙর। এমনকি ‘পার্মিয়ান-ট্রায়াসিক’ বিলুপ্তির মতো ভয়াবহ দুর্যোগ, যা পৃথিবীর প্রায় ৯০ শতাংশ সামুদ্রিক জীবনকে ধ্বংস করে দিয়েছিল, তা থেকেও নিজেদের টিকিয়ে রেখেছে এরা।
হাঙর গণিত বোঝে : হাঙর মোটেও বুদ্ধিহীন শিকারি নয়। এরা বিভিন্ন জ্যামিতিক আকার ও অপটিক্যাল ইলিউশন প্রায় এক বছর পর্যন্ত মনে রাখতে পারে। শুধু তাই নয়, এরা প্রাথমিক গণিতও বোঝে। যেমনÑ ৩ ও ৫ কিংবা ৪ ও ৭-এর মতো সংখ্যার পরিমাণের পার্থক্য এরা সহজেই বুঝতে পারে।
জ্যাজ সংগীতের প্রতি অনুরাগ : ‘পোর্ট জ্যাকসন’ প্রজাতির হাঙরের ওপর গবেষণা চালিয়ে সিডনির ম্যাককুয়ারি ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা দেখেছেন, এদের জ্যাজ সংগীতের প্রতি বিশেষ দুর্বলতা রয়েছে। জ্যাজ মিউজিক বাজানো হলে এরা নির্দিষ্ট খাবারের জায়গায় চলে আসে, যা ক্লাসিক্যাল মিউজিকের ক্ষেত্রে এরা করতে পারেনি।
হাঙরেরও নাভি আছে : মানুষের মতোই কিছু প্রজাতির হাঙর (যেমন : বুল শার্ক ও হ্যামারহেড) ডিম না পেড়ে সরাসরি বাচ্চা জন্ম দেয়। মায়ের জরায়ুতে থাকার সময় এগুলো আম্বিলিক্যাল কর্ড বা নাভিরজ্জুর মাধ্যমে পুষ্টি পায়। জন্মের পর কিছুদিন মানুষের মতোই এদের পেটে নাভির দাগ বা ‘বেলি বাটন’ দেখা যায়।
মায়ের পেটে থাকতেই ভাই-বোনদের খেয়ে ফেলে : ‘স্যান্ড টাইগার শার্ক’-এর জীবনসংগ্রাম শুরু হয় জন্মের আগেই। মায়ের জরায়ুতে থাকা অবস্থায় ভ্রƒণগুলো পুষ্টির জন্য নিজেদের ভাই-বোনদেরই খেয়ে ফেলে। একে বলা হয় ‘ইন্ট্রায়ুটেরিন ক্যানিবালিজম’। শেষ পর্যন্ত যে শক্তিশালী বাচ্চাটি টিকে থাকে, সেটিই জন্ম নেয়।
হাঙরেরও ‘বেস্ট ফ্রেন্ড’ থাকে : হাঙর সব সময় একা ঘোরে না। ‘গ্রে রিফ শার্ক’ বছরের পর বছর নির্দিষ্ট কিছু বন্ধুর সঙ্গে দল বেঁধে কাটায়। এমনকি ‘সাইমন’ ও ‘জেকিল’ নামে দুটি গ্রেট হোয়াইট শার্ককে কোনো রকম বিচ্ছিন্ন হওয়া ছাড়াই একসঙ্গে প্রায় ৬ হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে দেখা গেছে।
শরীরজুড়ে হাজারো ছোট দাঁত : হাঙরের গায়ে কোনো সাধারণ আঁশ থাকে না। এদের ত্বক আসলে 'ডেন্টিকল' নামের অসংখ্য ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র দাঁত দিয়ে ঢাকা। এই বিশেষ ত্বক সাঁতার কাটার সময় পানির প্রতিরোধ কমিয়ে গতি বাড়িয়ে দেয়। আঠারো শতকে ইতালির কারিগরেরা বেহালা মসৃণ করতে হাঙরের চামড়া ব্যবহার করতেন।
মানুষের হৃৎস্পন্দন টের পায় হাঙর : আমাদের পাঁচটি ইন্দ্রিয় থাকলেও হাঙরের রয়েছে আটটি ইন্দ্রিয়। এদের মাথায় ‘অ্যাম্পুলি অব লরেঞ্জিনি’ (অসঢ়ঁষষধব ড়ভ খড়ৎবহুরহর) নামক বিশেষ সেন্সর থাকে। এর মাধ্যমে এরা পানির ভেতরের বৈদ্যুতিক তরঙ্গ এবং অন্য প্রাণীর পেশির সংকোচন, এমনকি হৃৎস্পন্দনও টের পেয়ে যায়। ফলে ঘুটঘুটে অন্ধকারে বা বালুর নিচে লুকিয়ে থাকা শিকারও এরা সহজেই ধরে ফেলে।
গাছের চেয়েও প্রাচীন প্রাণী হাঙর : হাঙর এই পৃথিবীতে ডাইনোসর, গাছপালা, এমনকি শনির বলয়ের (স্যাটার্ন’স রিং) চেয়েও পুরোনো! জীবাশ্মের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৪৫ কোটি বছর আগে পৃথিবীতে হাঙরের পূর্বপুরুষদের অস্তিত্ব ছিল। অর্থাৎ, পৃথিবীর বুকে প্রথম গাছ জন্মানোরও প্রায় ৬০ মিলিয়ন (৬ কোটি) বছর আগে থেকে সাগরে রাজত্ব করছে হাঙর।

