ঢাকা শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৬

ঝুট ব্যবসায় একক আধিপত্য

শোকজের পর বেরিয়ে এলো এমপি বাচ্চুর যত অপকর্ম

নিজস্ব প্রতিবেদক, ময়মনসিংহ
প্রকাশিত: জুলাই ২৫, ২০২৬, ০৬:১৯ এএম

ময়মনসিংহের ভালুকার বিভিন্ন মিল-কারখানার ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চু এবং উপজেলা বিএনপির সাবেক ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক মুহাম্মদ মুর্শেদ আলমের মধ্যে বিরোধ চলছেই। চলমান রয়েছে অস্ত্রের মহড়াসহ গোলাগুলি। গত ১৮ জুন বিএনপি বাচ্চুকে শোকজ করলেও তার নিয়ন্ত্রণেই চলছে কারখানার ঝুট ব্যবসা। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ বলছেন, চাঁদাবাজিতে মনোযোগ কমিয়ে তাদের উন্নয়নে সংস্কার করা হোক রাস্তাঘাট।

সংসদ সদস্য ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চুকে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির শোকজের খবর ছড়িয়ে পড়লে বেরিয়ে আসে তার অপকর্মের ফিরিস্তি। শোকজের পর এমপি বাচ্চু ও তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে জমি দখল, আওয়ামী তোষণ এবং মিল-ফ্যাক্টরি জিম্মি করার আরও বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য বের হয়ে আসে।

ভালুকা এন্টারপ্রাইজের মাধ্যমে চাপ : অনুসন্ধানে জানা গেছে, এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই ভালুকার শিল্পাঞ্চলে একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় মরিয়া হয়ে ওঠেন বাচ্চু। উপজেলার বৃহৎ কারখানাগুলোর সাপ্লাই চেইন, পরিবহন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার (ঝুট) কাজ নিজের লোকদের পাইয়ে দিতে ‘ভালুকা এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের প্যাডে কারখানা মালিকদের ওপর চাপ সৃষ্টি ও স্বাক্ষরসহ সুপারিশ করেন তিনি। কথামতো কাজ না দিলে কারখানার গেটে লরি আটকে দেওয়া ও মালামাল ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। এতে করে হাজার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ হুমকিতে ফেলেছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর এই শিল্প নিয়ন্ত্রণে এমপি বাচ্চুর প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছেন আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের নেতারা, যাদের মধ্যে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নিহত তোফাজ্জল হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি যুবলীগ নেতা খলিলুর রহমান মাসুদ এবং ৪ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মতিউর রহমান (মতি মেম্বার) উল্লেখযোগ্য। ত্যাগী নেতাকর্মীদের বাদ দিয়ে নিজস্ব ‘পোষ্য বাহিনী’ ও আওয়ামী লীগের সুবিধাবাদীদের নিয়ে বাচ্চু একক রাজত্ব কায়েম করেছেন বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন উপজেলা বিএনপির শীর্ষ নেতারা।

জঙ্গি মামলার আসামির মঞ্চে উপস্থিতি : সম্প্রতি ডাকাতিয়া ইউনিয়ন বিএনপির এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বাচ্চুর পক্ষে প্রধান বক্তা ছিলেন ২০১৪ সালে ত্রিশালে পুলিশ হত্যা করে জঙ্গি ছিনতাই মামলার অন্যতম প্রধান আসামি। তিনি এলাকায় ‘যুবরাজ’ নামে খ্যাত যুবলীগ নেতা আতাউর রহমান কামাল।

অভিযোগ আছে, বিগত আওয়ামী শাসনামলে কামালের অত্যাচারে বিএনপির শত শত নেতাকর্মী ঘরছাড়া ছিলেন। তার বিচারের দাবিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া বিবৃতি দিয়েছিলেন।

সেই চিহ্নিত সন্ত্রাসী এমপির পাশে মঞ্চে বক্তব্য রাখায় ত্যাগী নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া, ভালুকার কাঠালী মৌজায় আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘ব্র্যাক’-এর স্বত্ব দখলীয় বাউন্ডারি ওয়াল জোরপূর্বক ভেঙে আনুমানিক দুই একর সরকারি ও ব্র্যাকের জমি অবৈধভাবে দখল করার অভিযোগ উঠেছে বাচ্চুর বিরুদ্ধে।

আওয়ামী আমলে হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য : স্থানীয় প্রবীণ নেতারা জানান, ২০১৪ সালের উপজেলা নির্বাচনে তিনি দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে গিয়ে প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চালান। এছাড়া, ২০০৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী শাসনামলে বাচ্চুর মালিকানাধীন ‘ভাওয়াল কনস্ট্রাকশন’ আওয়ামী লীগের এমপি-মন্ত্রীদের সঙ্গে আঁতাত করে বিভিন্ন সরকারি দপ্তর থেকে ৩ থেকে ৫ হাজার কোটি টাকার টেন্ডার বাণিজ্য করে, যার মধ্যে ত্রিশালের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়েই প্রায় ২০০ কোটি টাকার কাজ অন্তর্ভুক্ত। বর্তমানে জামিরদিয়ার এসকিউ গ্রুপের কালার মাস্টার, স্কয়ার ফ্যাশন, লাবিব, কটন গ্রুপ, ইউনিভার্স ফুটওয়্যার ও এনভয় টেক্সটাইলসহ প্রায় সব মিল-কারখানা বাচ্চুর বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে।

ভালুকা উপজেলা বিএনপির সাবেক ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক মুহাম্মদ মোর্শেদ আলম বলেন, বাচ্চু এমপি হওয়ার পর তার পোষ্য লোকজন আমার ২২ বছরের বৈধ ব্যবসা ‘এইচআরকেএম এন্টারপ্রাইজ’ ছিনিয়ে নিতে গত ১৬ মার্চ সশস্ত্র হামলা চালায় এবং উল্টো আমাদের নামে মিথ্যা মামলা দেয়। সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা এই অত্যাচার থেকে দ্রুত পরিত্রাণ চান।

জেলা বিএনপির এক শীর্ষ নেতা জানান, ভালুকায় বিএনপিপন্থি মালিকদের চারটি ফ্যাক্টরি থেকে বাচ্চু চাঁদাবাজি করায় মালিকেরা বিষয়টি স্থানীয়ভাবে সুরাহা না পেয়ে প্রধানমন্ত্রীকে জানানোর উদ্যোগ নিয়েছেন।

এসব অভিযোগ অস্বীকার করে এমপি ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চু বলেন, ‘আমি কোনো কোম্পানিকে ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করিনি। জঙ্গি ছিনতাই মামলার আসামির উপস্থিতিতে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের কথা নাকচ করে তিনি বলেন, এ ধরনের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের কথা আমার মনে পড়ছে না। ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসঙ্গের কথা টেনে তিনি জানান, ‘ভাওয়াল কনস্ট্রাকশন একটি লিমিটেড কোম্পানি। এই কোম্পানি একমাত্র আমি চালাই না। এর সঙ্গে অনেক লোক জড়িত।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ এনে শোকজ করা হয়েছিল, আমি সশরীরে উপস্থিত হয়ে জবাব দিয়েছি এবং আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয়েছে।’ অচিরেই দল চিঠি দিয়ে বিষয়টি পরিষ্কার করবে বলেও জানান তিনি।

এর আগে কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ নেওয়াকে কেন্দ্র করে ২০২৪ সালে ১ সেপ্টেম্বর দল থেকে বাচ্চুকে বহিষ্কার করা হয়। পরে ২০২৫ সালের ২৫ অক্টোবর তার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষের মনোনয়ন দেওয়া হয়।