ঢাকা শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৬

জলবায়ু সহনশীল শস্য উদ্ভাবনে নতুন সম্ভাবনার আলো

রূপালী ডেস্ক
প্রকাশিত: জুলাই ২৫, ২০২৬, ০৬:২১ এএম

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং অতিরিক্ত খরতাপের মধ্যে গাছপালা কীভাবে নিজেদের বাঁচিয়ে রাখে, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের বহুদিনের গবেষণায় এক যুগান্তকারী তথ্য সামনে এসেছে। বৈজ্ঞানিক জার্নাল ‘মলিকিউলার প্লান্ট’-এ প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, হঠাৎ তীব্র সূর্যালোকের সম্মুখীন হলে নিজেদের ক্ষতির হাত থেকে বাঁচাতে মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যে আত্মরক্ষাব্যবস্থা সক্রিয় করে তোলে উদ্ভিদ। সচরাচর উদ্ভিদ প্রখর আলোতে সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় ওভারলোডের শিকার হয়, যা তাদের বেঁচে থাকার শক্তির উৎস হলেও কোষকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। কিন্তু এই আবিষ্কার প্রমাণ করেছে, প্রকৃতিতে টিকে থাকার জন্য গাছপালার কাছে রয়েছে বিস্ময়কর দ্রুতগতির এক সেলফ-ডিফেন্স মেকানিজম।

প্রচলিত বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব অনুযায়ী ভাবা হতো, প্রখর আলো থেকে বাঁচতে উদ্ভিদের প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা শুরু হতে বেশ কিছুটা সময় লাগে। পূর্বের ধারণায় বিজ্ঞানীরা মনে করতেন, প্রথমে ক্লোরোপ্লাস্ট কোষের প্রধান কেন্দ্র বা নিউক্লিয়াসে বিপৎসংকেত পাঠায়, তারপর নিউক্লিয়াস ধীরে ধীরে আত্মরক্ষার জিনগুলোকে কার্যকর করে তোলে। তবে জার্মানির বিলেফেল্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির গবেষক ড. মার্টেন মুর এবং তার দল এই ধারণা বদলে দিয়েছেন। নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, নিউক্লিয়াসের ধীরগতির জিনগত পরিবর্তনের অনেক আগেই উদ্ভিদ কোষে সরাসরি ও অতিদ্রুত প্রোটিন উৎপাদন ও পুনর্বিন্যাস শুরু হয়ে যায়।

উদ্ভিদের এই দ্রুতগতির সুরক্ষাবলয় তৈরির মূল কারিগর হলো এম১, এম২ ও এম৩ নামে কিছু ছোট আরএনএ ট্যাগ এবং জিএপিডিএইচ নামে একটি বিশেষ এনজাইম। স্বাভাবিক বা কম আলোতে এই জিএপিডিএইচ এনজাইমটি কোষীয় কিছু নির্দেশনা আটকে রাখে। কিন্তু সূর্যের প্রখর আলো কোষ স্পর্শ করার সঙ্গে সঙ্গে এনজাইমটি সেই বাঁধন আলগা করে দেয়। ফলে উদ্ভিদ অতিদ্রুত কিছু বিশেষ প্রোটিন তৈরি করতে শুরু করে, যা সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়াকে আলোর তীব্রতার কারণে পুড়ে যাওয়া বা নষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা করে। বিজ্ঞানীরা সবুজ মিলেট, মস এবং ঘাসসহ প্রায় ১৩টি আলাদা প্রজাতির উদ্ভিদে একই ধরনের প্রতিক্রিয়া লক্ষ করেছেন, যা নির্দেশ করে যে এই প্রতিরক্ষামূলক বৈশিষ্ট্যটি কোনো নির্দিষ্ট প্রজাতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং উদ্ভিদজগতে বহুল প্রচারিত।

পরীক্ষাগারে দেখা গেছে, এই প্রাকৃতিক সুইচ ব্যবহার করে শস্যের ভেতরের প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা বহুলাংশে বাড়ানো সম্ভব। যেমন, সবুজ মিলেটের একটি জিনে ‘এম১’ ট্যাগ যুক্ত করার পর, জিনটিতে বড় কোনো পরিবর্তন না এনেই সালোকসংশ্লেষণ সুরক্ষাকারী গুরুত্বপূর্ণ ‘রিসকে’ প্রোটিনের মাত্রা ২.৩ গুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। এই উদ্ভাবন নির্দেশ করে যে, শস্যের মূল বায়োলজি পরিবর্তন বা সম্পূর্ণ নতুন জটিল জিন তৈরি না করেই এই অতিক্ষুদ্র সুইচগুলোকে টিউন করে প্রতিকূল পরিবেশ সহনশীল ফসল ফলানো সম্ভব।

বর্তমানে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে দীর্ঘমেয়াদি খরা, তীব্র সূর্যালোক এবং তাপপ্রবাহের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। উদ্ভিদের অতিদ্রুত সাড়া দেওয়ার এই কৌশল গবেষকদের সামনে এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। এর মাধ্যমে কম পুষ্টি ও তীব্র তাপেও উৎপাদনশীল থাকবেÑ এমন শস্য প্রজাতি উদ্ভাবন সহজ হবে। ফলে বৈশ্বিক আবহাওয়ার অনিশ্চয়তার মধ্যেও শস্যের ফলন বজায় রাখা সম্ভব হবে, যা খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে এবং বাজারের মূল্যবৃদ্ধি সামাল দিতে বড় ভূমিকা রাখবে। গবেষণার প্রধান তত্ত্বাবধায়ক বিলেফেল্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর কার্ল-জোসেফ ডিটজ বলেছেন, এই আবিষ্কার উদ্ভিদ কীভাবে অতিদ্রুত ক্লোরোপ্লাস্ট থেকে সাইটোপ্লাজমে প্রোটিন সংশ্লেষণে প্রভাব ফেলতে পারে তা প্রথমবার দেখাল, যা উদ্ভিদের স্ট্রেস রেসপন্স বা প্রতিকূল পরিবেশ সামলানোর পুরো ধারণাটিকেই নতুন রূপ দিল।