বাংলাদেশে শিক্ষাপ্রযুক্তি (ঊফঞবপয) খাত দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর (এআই) শিক্ষা প্ল্যাটফর্মগুলো শিক্ষার্থীদের শেখার পদ্ধতিতে নতুন মাত্রা যোগ করছে। এই পরিবর্তনের অগ্রভাগে উঠে এসেছে রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) শিক্ষার্থীদের প্রতিষ্ঠিত স্টার্টআপ ‘চর্চা’। বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির একটি সীমাবদ্ধতা থেকে যাত্রা শুরু করা এই প্ল্যাটফর্ম এখন দেশের লাখো শিক্ষার্থীর নির্ভরতার নাম। সর্বশেষ জাতীয় পর্যায়ের ‘তারুণ্য, স্টার্টআপ ও সম্ভাবনার বাংলাদেশ’ প্রতিযোগিতায় একাধিক বিভাগে সাফল্য অর্জনের মধ্য দিয়ে ‘চর্চা’ শুধু একটি স্টার্টআপ হিসেবে নয়, বরং দেশের উদ্ভাবনী শিক্ষাব্যবস্থার নতুন সম্ভাবনার প্রতীক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। সম্প্রতি প্রতিযোগিতার সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ‘চর্চা’র প্রতিনিধিদের হাতে ১০ লাখ টাকার অনুদানের চেক তুলে দেন।
যেভাবে এলো ‘চর্চা’ : ২০২১ সালে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় অনলাইন অনুশীলনের কার্যকর প্ল্যাটফর্মের অভাব অনুভব করেছিলেন রুয়েটের শিক্ষার্থী রায়হান উল ইসলাম ও নাফিস রায়হান। সেই অভিজ্ঞতাই তাদের নতুন কিছু করার অনুপ্রেরণা দেয়। সহপাঠীদের নিয়ে তারা গড়ে তোলেন ‘চর্চা’Ñ যেখানে শুধু প্রশ্ন অনুশীলন নয়, শিক্ষার্থীর শেখার ধরন বিশ্লেষণ করে ব্যক্তিগতভাবে প্রস্তুতির সুযোগ তৈরি করা হয়।
প্রতিষ্ঠার পর থেকেই প্ল্যাটফর্মটি নিয়মিত গবেষণা, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং ব্যবহারকারীর চাহিদা অনুযায়ী নতুন ফিচার সংযোজনের মাধ্যমে দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করে। বর্তমানে রাজশাহী থেকেই অর্ধশতাধিক প্রযুক্তিকর্মী প্ল্যাটফর্মটির উন্নয়ন ও পরিচালনায় যুক্ত রয়েছেন।
ব্যক্তিকেন্দ্রিক শেখার প্ল্যাটফর্ম : ‘চর্চা’র সবচেয়ে বড় শক্তি এর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি। এটি শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবই ও নির্ভরযোগ্য তথ্যভা-ারের ভিত্তিতে তথ্যসূত্রসহ উত্তর প্রদান করে। একই সঙ্গে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর দুর্বল অধ্যায় শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় অনুশীলনের পরামর্শ দেয়। এসএসসি, এইচএসসি, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি এবং বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য প্ল্যাটফর্মটিতে রয়েছে ৩০ লাখেরও বেশি প্রশ্ন, সীমাহীন মডেল টেস্ট, লাইভ পরীক্ষা, তাৎক্ষণিক প্রতিযোগিতা, ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ এবং মেধাতালিকার সুবিধা। ফলে একজন শিক্ষার্থী নিজের প্রস্তুতির অগ্রগতি নিয়মিত মূল্যায়নের সুযোগ পেয়ে থাকেন।
সংখ্যাতেই জনপ্রিয়তার প্রমাণ : বর্তমানে ‘চর্চা’র নিবন্ধিত ব্যবহারকারী ১৫ লাখেরও বেশি। প্রতি মাসে ৫ লাখের বেশি শিক্ষার্থী নিয়মিত প্ল্যাটফর্মটি ব্যবহার করেন। এ ছাড়া মডেল পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করছেন এবং ২০ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী। শিক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এত অল্প সময়ে এত বড় ব্যবহারকারী ভিত্তি তৈরি হওয়া প্রমাণ করে যে, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যক্তিকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি দেশের শিক্ষার্থীদের আগ্রহ ও আস্থা দ্রুত বাড়ছে।
জাতীয় প্রতিযোগিতায় সাফল্য : এ বছর ‘তারুণ্য, স্টার্টআপ ও সম্ভাবনার বাংলাদেশ’ প্রতিযোগিতায় সারা দেশ থেকে মাত্র ছয়টি স্টার্টআপ ১০ লাখ টাকা অনুদান লাভ করেছে। এ ছাড়া ১৫টি স্টার্টআপ প্রদর্শনীর জন্য স্টল স্থাপনের সুযোগ পায় এবং মাত্র চারটি স্টার্টআপ জাতীয় মঞ্চে নিজেদের সফলতার গল্প উপস্থাপনের সুযোগ অর্জন করে।
এই তিনটি স্বীকৃতির প্রতিটি ক্ষেত্রেই নির্বাচিত হয়েছে ‘চর্চা’। অর্থাৎ প্রদর্শনী স্টল, সরকারি অনুদান এবং জাতীয় মঞ্চে সাফল্যের গল্প উপস্থাপনÑ তিনটি বিভাগেই একসঙ্গে স্থান পাওয়া একমাত্র স্টার্টআপ এটি। প্রতিযোগিতায় এই অর্জন ‘চর্চা’কে অন্যদের তুলনায় আলাদা অবস্থানে নিয়ে গেছে।
রাজশাহীর জন্য গর্ব : দীর্ঘদিন ধরেই তথ্যপ্রযুক্তি ও প্রকৌশল শিক্ষায় রুয়েট দেশের অন্যতম শীর্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। সেই ধারাবাহিকতায় ‘চর্চা’র জাতীয় স্বীকৃতি প্রমাণ করেছে, গবেষণা ও উদ্ভাবনের উপযুক্ত পরিবেশ পেলে রাজধানীর বাইরে থেকেও আন্তর্জাতিক মানের প্রযুক্তি উদ্যোগ গড়ে তোলা সম্ভব। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক গবেষণা, স্টার্টআপ সহায়তা এবং উদ্ভাবনী উদ্যোগে বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে ভবিষ্যতে রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আরো অনেক সফল প্রযুক্তি উদ্যোক্তা উঠে আসবেন।
নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা : একটি ছোট সমস্যা চিহ্নিত করে তার প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান তৈরির মধ্য দিয়ে ‘চর্চা’র যাত্রা শুরু হয়েছিল। আজ সেই উদ্যোগ জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃত। এটি প্রমাণ করে, সঠিক পরিকল্পনা, উদ্ভাবনী চিন্তা এবং অধ্যবসায় থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ থেকেই জন্ম নিতে পারে আগামী দিনের সফল প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান। ‘চর্চা’র এই অর্জন তাই শুধু একটি স্টার্টআপের সাফল্যের গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের তরুণ উদ্ভাবকদের আত্মবিশ্বাস, সম্ভাবনা এবং প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যতের এক শক্তিশালী প্রতীক।

