ঢাকা শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৬

বাংলাদেশি পণ্যে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ যুক্তরাষ্ট্রের

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: জুলাই ২৫, ২০২৬, ০৬:২৪ এএম

বাংলাদেশি পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা যথাযথভাবে কার্যকর না করার অভিযোগে এই শুল্ক আরোপ করা হয় বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে প্রতিযোগী ভারত, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, কম্বোডিয়া, পাকিস্তানসহ ৬০ দেশের ওপর ১০ ও সাড়ে ১২ শতাংশ শুল্ক বসেছে। যেটিকে ‘জোরপূর্বক শ্রম শুল্ক’ বলা হচ্ছে।

এই দেশগুলো থেকে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে নিয়মিত শুল্কের অতিরিক্ত হিসেবে নতুন এই শুল্ক আদায় করবে যুক্তরাষ্ট্র কাস্টমস, যেমন বাংলাদেশের পণ্যে গড় শুল্ক ১৫ শতাংশ। তার সঙ্গে নতুন শুল্ক যুক্ত হয়ে মোট শুল্ক দাঁড়াবে ২৫ শতাংশ। অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রেও এভাবেই শুল্কের হিসাব হবে। সাধারণত যে প্রতিষ্ঠান পণ্য আমদানি করে, তাকেই শুল্ক দিতে হয়। তবে কোনো দেশের পণ্যে বেশি শুল্ক থাকলে, সেখান থেকে পণ্য কিনতে নিরুৎসাহিত হয় প্রতিষ্ঠান।

তবে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর (ইউএসটিআর) বলছে, পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে জোরপূর্বক শ্রম বন্ধে বাংলাদেশ যথেষ্ট পদক্ষেপ নিতে পারেনি। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বাণিজ্য আইনের আওতায় এই শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। ঘোষণা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ৬০টি বাণিজ্য অংশীদার দেশ ও অঞ্চলের (ইউরোপীয় ইউনিয়ন) ওপর এই শুল্ক কার্যকর হচ্ছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করা বেশিরভাগ পণ্যের ওপর এই শুল্ক বসবে। তবে নির্দিষ্ট কিছু পণ্য আওতামুক্ত থাকবে। আবার শর্ত সাপেক্ষে ট্যারিফ রেট কোটা (টিআরকিউ) বা নির্দিষ্ট পরিমাণ পণ্যকে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ঘোষণা অনুযায়ী, যখন কোনো ব্যক্তিকে প্রতারণা বা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজ বা সেবা দিতে বাধ্য করা হয়, তখন সেটি জোরপূর্বক শ্রম হিসেবে গণ্য হবে। সংস্থাটির অনুমান অনুযায়ী, ২০২২ সাল পর্যন্ত বিশ্বে প্রায় ২ কোটি ৭৬ লাখ মানুষ জোরপূর্বক শ্রমের শিকার হন।

গতকাল শুক্রবার সংস্থাটির ওয়েবসাইটে দেখা গেছে, ৬৩ শতাংশ জোরপূর্বক শ্রমই সংঘটিত হয় বেসরকারি খাতে। এর মাধ্যমে প্রতি বছর কোম্পানিগুলো ২৩৬ বিলিয়ন (২৩ হাজার ৬০০ কোটি) ডলার অবৈধ মুনাফা অর্জন করে। বর্তমানে ৬০টির মতো দেশ আইএলও’র শ্রম প্রোটোকল অনুমোদন দিয়েছে। যার মধ্যে বাংলাদেশও আছে।

আইএলও’র প্রটোকলটি যুক্তরাষ্ট্রের ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ফলে এই আইনের ৩০১ নম্বর ধারার আওতায় গত মার্চ মাসে একটি তদন্ত শুরু করে দেশটি। সেখান থেকে এই নতুন শুল্ক ধারণার উৎপত্তি। ৩০১ নম্বর ধারাটি মার্কিন সরকারকে অন্য কোনো দেশের বাণিজ্য পদ্ধতি জবরদস্তিমূলক, অযৌক্তিক বা বৈষম্যমূলক কি না তা তদন্ত করার ক্ষমতা দেয়। এই তদন্তের পর প্রয়োজন হলে দেশটি অন্যদের সঙ্গে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে শাস্তিমূলক শুল্ক ব্যবস্থা আরোপ করতে পারে।

সম্প্রতি এই তদন্ত শেষে শুক্রবার মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর তাদের ওয়েবসাইটে একটি চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে ৬০টি দেশ ও অঞ্চলের ওপর জোরপূর্বক শ্রম শুল্ক আরোপের কথা আছে।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ৩০১ ধারা প্রয়োগ করে আরোপ করা শুল্কের মেয়াদ শেষের কোনো নির্দিষ্ট তারিখ নেই। তদন্ত শেষে সিদ্ধান্ত ঘোষণার সময় মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার বলেছেন, অন্যায্য বাণিজ্য পদ্ধতি ও মানবাধিকার সংক্রান্ত উদ্বেগ থেকে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। গ্রিয়ার বলেন, আজকের এই পদক্ষেপ মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং অন্যায্য বাণিজ্য পদ্ধতির সংশোধন শুরু করবে। এটি শ্রমিকদের কল্যাণ ও উন্নয়নের জন্য জরুরি।

কোন খাত বেশি প্রভাবিত হবে : নতুন শুল্কের কারণে বাংলাদেশের বস্ত্র ও পোশাক খাত সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা আছে। তবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, নির্দিষ্ট পরিমাণ বস্ত্র ও পোশাক শুল্কমুক্তভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের জন্য ‘ট্যারিফ-রেট কোটা (টিআরকিউ)’ ব্যবস্থা চালু করা হতে পারে। এটি নির্ভর করবে বাংলাদেশ কতটুকু মার্কিন তুলা ও টেক্সটাইল কাঁচামাল আমদানি করছে সেটির ওপর।

ইউএসটিআর বলেছে, এই ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হলো- জোরপূর্বক শ্রমের ঝুঁকি আছে এমন অন্য উৎস থেকে কাঁচামাল আমদানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বাংলাদেশ যেন মার্কিন কাঁচামাল ব্যবহার করে। তবে যতদিন এই কোটা ব্যবস্থা চালু না হচ্ছে, ততদিন বস্ত্র ও পোশাকের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর থাকবে। বাংলাদেশের পাশাপাশি ‘টিআরকিউ’ সুবিধা পাওয়ার উপযোগী হিসেবে কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার নামও উল্লেখ করা হয়েছে।

বাংলাদেশের প্রতিযোগীদের ওপর শুল্কহার কত : যুক্তরাষ্ট্র মূলত দুটি বিষয় বিবেচনা করে পৃথক হারে শুল্ক আরোপ করেছে। যেসব দেশ দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্য আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তাদের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে যেসব দেশকে বাংলাদেশের প্রতিযোগী হিসেবে বিবেচনা করা হয়, সেগুলোর মধ্যে ভারত, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা ১০ শতাংশ শুল্কের আওতায় থাকবে।

অন্যদিকে যেসব দেশ জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্য আমদানির ওপর কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি, তাদের ওপর ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। এই তালিকায় আছে বাংলাদেশের অত্যন্ত শক্তিশালী দুই প্রতিযোগী দেশ- চীন ও ভিয়েতনাম। এছাড়া, থাইল্যান্ড, তুরস্ক ও ফিলিপাইনের ওপরও ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হবে।