ঢাকা শনিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৫

থাই প্রধানমন্ত্রী পেতংতার্ন শিনাওয়াত্রাকে বরখাস্ত করলেন আদালত

রূপালী ডেস্ক
প্রকাশিত: আগস্ট ৩০, ২০২৫, ১১:২৮ এএম
থাই প্রধানমন্ত্রী

ফাঁস হওয়া ফোনালাপ কেলেঙ্কারিতে পদচ্যুত হলেন থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী পেতংতার্ন শিনাওয়াত্রা, আদালতের রায়ে ভেঙে গেল তার মন্ত্রিসভা। ২০০৮ সালের পর এ নিয়ে পঞ্চমবার কোনো প্রধানমন্ত্রীকে দেশটির সাংবিধানিক আদালত বরখাস্ত করল।

গতকাল শুক্রবার আদালত তার রায়ে বলেন, নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে তাকে এ সাজা দেওয়া হচ্ছে। কম্বোডিয়ার নেতা হুন সেনের সঙ্গে এক ফোনালাপকে কেন্দ্র করে হওয়া অভিযোগের ভিত্তিতে এ রায় থাইল্যান্ডের সিনাওয়াত্রা পরিবারের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে; এটি দেশটিতে নতুন রাজনৈতিক অস্থিরতার সূচনাও করতে পারে।

থাইল্যান্ডের সর্বকনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া পায়েতংতার্ন তার মেয়াদের মাত্র এক বছর কাটানোর পরই ক্ষমতাচ্যুত হলেন। 

গত শুক্রবারের থাইল্যান্ডের সাংবিধানিক আদালতের বিচারকরা ৬-৩ ভোটে পায়েতংতার্নের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। তারা বলেন, জুনে ফাঁস হওয়া ফোনালাপে পায়েতংতার্নের নৈতিকতা ভঙ্গের প্রমাণ পাওয়া গেছে। সীমান্ত ঘিরে সশস্ত্র সংঘাতের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাওয়ার পর কম্বোডিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী হুন সেনের সঙ্গে ওই ফোনালাপে পেতংতার্নকে নতজানু মনে হয়েছে। দুই দেশ কয়েক সপ্তাহ পর সত্যি সত্যিই সংঘাতে লিপ্ত হয়, যা ৫ দিন ধরে চলে।

৩৯ বছর বয়সি পায়েতংতার্নকে জুলাইয়ে অস্থায়ীভাবে তার পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এদিকে গতকাল স্থায়ীভাবে তার পদ চলে যাওয়ায় এখন থাইল্যান্ডের পার্লামেন্টকে নতুন প্রধানমন্ত্রীর খোঁজে নামতে হবে। পায়েতংতার্নের দল ফেউ থাই পার্টির জন্য এ যাত্রায় মিত্রদের সমর্থন জোগাড় করা বেশ কষ্টসাধ্যই হওয়ার কথা। নতুন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার আগ পর্যন্ত উপপ্রধানমন্ত্রী ফুমথাম ওয়েচায়াচাই ও মন্ত্রিসভার বাকি সদস্যরা সরকার চালাবেন।

আপাতত পাঁচজনকে পায়েতংতার্নের উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তার মধ্যে আছে ফেউ থাইয়ের ৭৭ বছর বয়সি চাইকাসেম নিতিসিরি। সাবেক এ অ্যাটর্নি জেনারেলের মন্ত্রিসভা অভিজ্ঞতা সীমিত এবং তাকে রাজনীতিতে খুব বেশি সক্রিয়ও কখনো দেখা যায়নি।

এর বাইরে নাম আছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রায়ুথ চান-ওচার। ২০১৪ সালে ফেউ থাইয়ের সরকারকে উৎখাত করে তার নেতৃত্বেই সামরিক বাহিনী ক্ষমতা নিয়েছিল, তিনি কিছু দিন আগে রাজনীতি থেকে অবসর নিয়েছিলেন।

আরেক সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী আনুতিন চার্নভিরাকুল। ফোনালাপ ফাঁসকে কেন্দ্র করে পেতংতার্নের জোট সরকার থেকে তার দল নিজেদের প্রত্যাহার করে নেওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি উপপ্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন।

চুলালংকর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্টিথর্ন থানানিথিচট বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, নতুন প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দেওয়া কঠিন হবে এবং বেশ সময় লেগে যেতে পারে। সব পক্ষের স্বার্থ এক করা সহজ নয়, ফেউ থাই-ই সবচেয়ে বেশি অসুবিধায় থাকবে।

থাইল্যান্ডের রাজনীতিতে গত দুই দশক ধরে একটি নাম সবচেয়ে আলোচিত শিনাওয়াত্রা পরিবার। ধনকুবের ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন শিনাওয়াত্রার মেয়ে পেতংতার্ন থাইল্যান্ডের ও যুক্তরাজ্যের সারের অভিজাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা শেষে পারিবারিক ব্যবসায় মনোনিবেশ করেন।

‘উং ইং’ নামে পরিচিত পেতংতার্ন ২০২১ সালে পেউ থাই পার্টিতে যোগ দেন এবং ২০২৩ সালে দলের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। পরে থাই পার্লামেন্ট তাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত করে, যখন তার পূর্বসূরি স্রেত্থা থাভিসিনকে মন্ত্রিসভা নিয়োগে বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে আদালত বরখাস্ত করে।

পেতংতার্নকে জানতে হলে যেতে আরও কয়েক বছর পেছনে ২০০১ সালে। সে বছর থাইল্যান্ডের টেলিকম খাতের ধনকুবের ও পেতংতার্নের বাবা থাকসিন শিনাওয়াত্রা নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয় পেয়ে প্রধানমন্ত্রী হন। তিনি ছিলেন প্রথম থাই নেতা যিনি একটি নির্বাচিত সরকারকে পূর্ণ মেয়াদে নেতৃত্ব দেন।

গ্রামাঞ্চলের দরিদ্র ভোটার ও শহরের ব্যবসায়ীদের সমর্থন আদায় করে থাকসিন দ্রুতই জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। কিন্তু ২০০৬ সালে সেনাবাহিনীর অভ্যুত্থানে তাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এরপর ২০০৮ সালে তিনি স্বেচ্ছায় নির্বাসনে চলে যান।

পরবর্তী সময়ে ২০১১ সালে থাকসিনের ছোট বোন ইংলাক শিনাওয়াত্রা প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। তবে ২০১৪ সালে একটি বদলি নিয়ে বেআইনি ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে তাকে সাংবিধানিক আদালত বরখাস্ত করে।

শিনাওয়াত্রা পরিবারের সঙ্গে থাইল্যান্ডের সামরিক বাহিনীর সম্পর্ক বরাবরই উত্তেজনাপূর্ণ। সেনাবাহিনী অতীতে তাদের দুটি সরকারকে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করেছে। রাজতন্ত্রপন্থি গোষ্ঠীর সঙ্গেও তাদের সম্পর্ক জটিল ছিল।