প্রাথমিক স্তরের বিনা মূল্যের পাঠ্যবই ছাপার কাজ দেশের প্রেসের মাধ্যমে করার অনুমোদন দিয়েছে সরকার। কিন্তু সিন্ডিকেট করে প্রেস মালিকদের দরপত্র প্রদান ও নিম্নমানের বই দেওয়ার অভিযোগে মাধ্যমিক স্তরের বই ছাপার কাজ বিদেশের প্রতিষ্ঠানকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারে সরকার। তবে মুদ্রণশিল্পে বিপুল বিনিয়োগ এবং শিল্পসংশ্লিষ্ট অংশীজনদের রুটি-রুজির বিষয়টি ভাবনায় রেখে যে কোনো কঠোর পদক্ষেপ নিয়ে হলেও দেশের প্রেসের মাধ্যমেই বই ছাপার কাজ করার পক্ষে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)।
প্রতি বছর শিক্ষাবর্ষের শুরুতে জানুয়ারির প্রথম দিন সারা দেশের প্রাক-প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের বিনা মূল্যে নতুন পাঠ্যবই দেয় সরকার। গত বছর রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর সৃষ্ট নানা প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও চলতি ২০২৫ শিক্ষাবর্ষে যথাসময়ে বই দেওয়ার চেষ্টা করেছে এনসিটিবি।
এদিকে ২০২৬ শিক্ষাবর্ষ শুরু হতে বাকি আর মাস চারেক। এবার কোনো প্রতিকূল অবস্থা না থাকায় আগামী শিক্ষাবর্ষের জন্য বইয়ের মুদ্রণ প্রক্রিয়া বেশ আগে ভাগেই শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে প্রাথমিকের বই ছাপানোর অনুমোদনও দিয়েছে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ (ক্রয় কমিটি)। তবে সংকট তৈরি হয়েছে মাধ্যমিক স্তরের বই ছাপার কাজ নিয়ে। সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ (ক্রয় কমিটি) ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির বই ছাপার কাজের অনুমোদন দেয়নি।
এ ছাড়া কমিটি উল্লিখিত শ্রেণির দরপত্র বাতিল করেছে বলেও জানা গেছে। পাশাপাশি পিপিআরের (পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা) একটি ধারায় সংশোধন করা হয়েছে। এতে মাধ্যমিক স্তরের ২১ কোটি বই ছাপার কাজ আন্তর্জাতিক টেন্ডারের মাধ্যমে বিদেশের প্রতিষ্ঠান থেকে ছাপানো সহজ হবে। তবে স্থানীয়ভাবে পুনঃদরপত্র করে দেশের প্রেসের মাধ্যমে ছাপার কাজ করার ভাবনাও একেবারে শেষ হয়েছে, তা বলা যাবে না। নিয়ম অনুযায়ী ইচ্ছুক হলে যে কোনো দেশই আন্তর্জাতিক দরপত্রে অংশ নিতে পারে। ফলে ভারতেরও দরপত্রে অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অংশ নিলে কাজ পাওয়ারও সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু ভারত কাজ পেলে বিতর্ক তৈরি হতে পারে। বিষয়টি নিয়ে চিন্তা রয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ অংশীজনদের মধ্যেও।
এদিকে মাধ্যমিকের ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির দরপত্র মূল্যায়নসহ সব কাজ শেষে বই ছাপার কাজটি যখন ক্রয় কমিটির অনুমোদনের অপেক্ষায়, তখন তা না হয়ে উল্টো দরপত্র বাতিল হওয়ার পাশাপাশি বিদেশে কাজ চলে যাওয়ার শঙ্কায় দেশের মুদ্রণশিল্প-সংশ্লিষ্টদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে।
এদিকে যে সভায় দরপত্র বাতিল বা আন্তর্জাতিক দরপত্রের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে আলোচনা হচ্ছে, শুক্রবার(২৯ আগস্ট) পর্যন্ত ক্রয় কমিটির সেই সভার কার্যবিবরণী না পাওয়ায় বই ছাপা নিয়ে কী সিদ্ধান্ত হয়েছে, কোন প্রক্রিয়ায় পরবর্তীতে কাজ হবে, সে বিষয়ে অন্ধকারে রয়েছে এনসিটিবি। তার পরও গত বৃহস্পতিবার প্রেস মালিক ও কাগজ মিল মালিকদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত সভায় নির্দিষ্ট সময়ে মানসম্পন্ন প্রাথমিকের বই ছাপার কাজ শেষ করতে আহ্বান জানিয়েছে এনসিটিবি। পাশপাশি নির্দিষ্ট সময়ে মানসম্পন্ন মাধ্যমিকের বই সরবরাহ নিশ্চিত করার বিপরীতে বই ছাপা নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা যাতে ইতিবাচকভাবে সমাধান করা যায়, সে বিষয়ে এনসিটিবির পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হবে বলে অংশীজনদের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বছরের শুরুতে শিক্ষার্থীদের মানসম্পন্ন বই দেওয়ার ক্ষেত্রে নানা চ্যালেঞ্জ থাকলেও দেশের প্রেসের মাধ্যমেই বই ছাপার কাজ করার পক্ষে এনসিটিবি।
এদিকে প্রাথমিকের বইয়ের অনুমোদন পাওয়া গেলেও ছাপার কাজ এখনো শুরু হয়নি। অন্যদিকে মাধ্যমিকের ছাপার প্রক্রিয়া এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তাই বই ছাপার কাজ দ্রুত শুরু করতে না পারলে ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিন বই পাওয়া নিয়ে শঙ্কা সৃষ্টি হবে।
বই ছাপার প্রক্রিয়া নিয়ে জটিলতার প্রশ্নে এনসিটিবির চেয়ারম্যান প্রফেসর রবিউল কবীর চৌধুরী রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘এনসিটিবি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার জন্য অপেক্ষা করবে। এর বাইরে এনসিটিবির আর খুব বেশি কিছু করার নেই।’
শিক্ষা মন্ত্রণালয় কেন বিদেশে ছাপার কাজের প্রস্তাব দিয়েছে প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা নেই।’ আন্তর্জাতিক দরপত্র হলে ভারতেরও কাজ পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
এতে জটিলতা বাড়বে কি না প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এটি আমার মন্তব্য করার বিষয় নয়।’
স্থানীয়ভাবে পুনঃদরপত্র হলে দেশের প্রেসগুলোর মাধ্যমে সঠিক সময়ে মানসম্পন্ন বই দেওয়া সম্ভব কি না প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘যদি আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হই এবং সর্বোচ্চ আন্তরিকতা, সততা এবং দেশপ্রেমের অনুভূতি ও মনোভাব নিয়ে আমাদের নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করি, তাহলে দেশেই বই ছাপার কাজ করা সম্ভব।’
জানা গেছে, সম্প্রতি ক্রয় কমিটির বৈঠকে বই ছাপাতে আন্তর্জাতিক দরপত্র দিতে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা (পিপিআর) ২০০৮-এর বিধি ৮৩(১)(ক) কিছুটা সংশোধন করা হয়। এতে বই ছাপাতে আন্তর্জাতিক দরপত্র দেওয়ার পথ প্রশস্ত হয়।
এ বিষয়ে এনসিটিবি সূত্র জানিয়েছে, প্রাথমিকের ৯ কোটি বই ছাপার প্রস্তাব অনুমোদন করা হলেও আটকে গেছে মাধ্যমিকের ২১ কোটি বই ছাপার প্রস্তাব। গত ১৯ আগস্ট ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির জন্য ১১ কোটি ৮৯ লাখ ৩২ হাজার ৮০২ কপি বই ছাপানোর জন্য তিনটি প্রস্তাব ক্রয় কমিটিতে উত্থাপন হয়, যার মোট ব্যয় ধরা হয় ৬০৩ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। তবে প্রেস মালিকদের সিন্ডিকেট করে দরপত্র প্রদান ও উল্লিখিত তিন শ্রেণির বইয়ের লটের বিপরীতে তৈরি প্যাকেজের সংখ্যা বেশি কেন, তা নিয়ে আপত্তি তুলে বইয়ের ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন দেয়নি কমিটি।
দরপত্র নিয়ে সিন্ডিকেট হওয়ার বিষয়ে কোনো মন্তব্য না করলেও এনসিটিবি সূত্র জানিয়েছে, লটের বিপরীতে প্যাকেজের সংখ্যা কমালে প্যাকেজগুলো অনেক বড় হয়ে যাবে। তাতে বড় প্রেসগুলো কাজ করতে পারলেও প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতার (কাজ করার সার্টিফিকেট) অভাবে মধ্যম ও ছোট প্রেসগুলো কাজ করতে পারবে না। এতে বই ছাপার পুরো কাজ বড় প্রেসগুলোর কাছে জিম্মি হয়ে পড়বে। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই গত ২৬ আগস্ট ক্রয় কমিটি পিপিআর ৮৩(১)(ক) বিধিতে সংশোধনী আনে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এর আগে একটি গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকেও আগামী শিক্ষাবর্ষের বই ছাপার প্রস্তুতির বিষয়ে প্রতিবেদন নিয়েছে মন্ত্রণলায়।
প্রতিবেদনে গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষে বলা হয়েছে, পুনঃদরপত্র করে বই ছাপার কাজ করতে গেলে যথাসময়ে বই দেওয়া কঠিন হবে।
বিধিতে সংশোধনীর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক দরপত্রের পথ সহজ করার সিদ্ধান্তের বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে বই ছাপার কাজে জড়িত প্রেস মালিক ও মুদ্রণশিল্প সমিতিসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মধ্যে কাজ হাতছাড়া হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়। যদিও গত শুক্রবার পর্যন্ত সরকারের এমন সিদ্ধান্তের কোনো রেজল্যুশন এনসিটিবিতে আসেনি। তার পরও দেশের মুদ্রণশিল্পের সঙ্গে নানাভাবে জড়িত প্রায় ২০ লাখ মানুষ তাদের রুটি-রুজি নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। সত্যিই যদি এমন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয়, তাতে ভয়ংকর সর্বনাশ দেখছেন তারা।
জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর মতিঝিলে এনসিটিবির অডিটোরিয়ামে বই ছাপার সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রেস মালিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয় এনসিটিবি কর্তৃপক্ষের। সভায় এনসিটিবি চেয়ারম্যান বই ছাপার সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরেন। এ সময় চেয়ারম্যান দেশে ছাপার কাজ করা হলে যথাসময়ে মানসম্পন্ন বই দেওয়া সম্ভব কি না, প্রেস মালিকদের কাছে প্রতিশ্রুতি চান।
জবাবে প্রেস মালিকেরা বলেছেন, যে কোনো মূল্যে এবার তারা যথাসময়ে মানসম্পন্ন বই দিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।
গত বছরের ১ জানুয়ারি রাজধানীর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে বিনা মূল্যের বইয়ের অনলাইন ভার্সন উদ্বোধন করে তৎকালীন শিক্ষা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেছিলেন, শিক্ষার্থীদের জন্য বিনা মূল্যের বই এখন থেকে আর বিদেশে ছাপানো হবে না। বই ছাপা বাণিজ্য বা একচেটিয়া ব্যবসাকে উন্মুক্ত করে আরও সুশৃঙ্খল করার চেষ্টা থাকবে মন্তব্য করে সে সময় উপদেষ্টা বলেছিলেন, উন্নতমানের ছাপা, কাগজ ও মলাটের ব্যবস্থা করা হবে।
সাবেক শিক্ষা উপদেষ্টার এমন বক্তব্যের কথা স্মরণ করিয়ে মুদ্রণ শিল্প সমিতির একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, দেশের ১১৭টি প্রেস বই ছাপার কাজ করে। এর মধ্যে কিছুসংখ্যক প্রেস অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িত। প্রয়োজনে সেসব প্রেসকে চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। কিছু প্রেসের অপরাধে পুরো শিল্পকে দোষারোপ করে বিদেশে কাজ দেওয়া হলে সার্বিকভাবে দেশের বিকশিত মুদ্রণশিল্পই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এতে প্রেসের ধনী মালিকদের কোনো সমস্যা না হলেও বিপুলসংখ্যক শ্রমিক-কর্মচারী জীবিকা হারিয়ে ভয়ংকর অবস্থায় পড়বেন।
আগামী শিক্ষাবর্ষের জন্য ৩০ কোটির বেশি পাঠ্যবই ছাপাতে কাজ করছে এনসিটিবি। এর মধ্যে প্রাক-প্রাথমিক থেকে প্রাথমিকের বই রয়েছে ৯ কোটি। আর মাধ্যমিক স্তরে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত বই রয়েছে ২১ কোটি।
আপনার ফেসবুক প্রোফাইল থেকে মতামত লিখুন