ঢাকা শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাটডাউন কর্মসূচিতে  ক্যাম্পাস ছাড়ছেন  শিক্ষার্থীরা

রাবি প্রতিনিধি
প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৫, ১১:৩১ পিএম

দুর্গাপূজা উপলক্ষে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) আগামী ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে ছুটি শুরু হচ্ছে। এর আগে ২৬ ও ২৭ সেপ্টেম্বর শুক্র ও শনিবার হওয়া, পোষ্য কোটা ইস্যুতে ক্যাম্পাসে অস্থিতিশীলতা ও শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের টানা চার দিনের ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচির কারণে ক্যাম্পাস ছাড়ছেন শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপচেপড়া ভিড়ের স্থানগুলো এখন প্রায় জনমানবশূন্য। এদিকে শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মসূচির প্রতিবাদে গতকাল বুধবার ১১টার দিকে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে শাখা ইসলামী ছাত্রশিবির। পরে দুপুরে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ৭ দিনের জন্য শাটডাউন স্থগিত করেছেন। তবে কর্মসূচি বহাল রেখেছেন বিএনপিপন্থি শিক্ষকরা।

এর আগে গত শনিবার বিকেলে উপ-উপাচার্য, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে ঘটে যাওয়া হাতাহাতির ঘটনার বিচারের দাবিতে পরদিন রোববার এক দিনের কর্মবিরতির কর্মসূচি দেওয়া হয়। একই দিনে উদ্বুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে একটি জরুরি সিন্ডিকেট সভা ডাকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। সিন্ডিকেট সভায় ওই ঘটনার তদন্তে একটি কমিটি গঠন এবং পোষ্য কোটায় ভর্তি কার্যক্রম স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ সিদ্ধান্তের পরেই পোষ্য কোটা পুনর্বহাল ও উপ-উপাচার্যকে হেনস্তায় জড়িতদের বিচারের দাবিতে শাটডাউন কর্মসূচির ঘোষণা দেন শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তবে গতকাল দুপুর ১২টার দিকে ৭ দিনের জন্য কর্মসূচি স্থগিত করেছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

শাটডাউন প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়ে অফিসার্স সমিতির সভাপতি মোক্তার হোসেন বলেন, ‘প্রশাসনের আমন্ত্রণে আমরা আলোচনায় বসেছিলাম। তারা আমাদের আশ্বস্ত করেছিলেন এবং আহ্বান করেছিলেন প্রশাসন ও একাডেমিক কার্যক্রম সচল রাখার স্বার্থে কয়েকদিন যেন সময় দেওয়া হয়। সেই বিবেচনায় সাত দিন সময় দিতে চাই। এ সময়ের দাবি পূরণ না হলে কঠিন কর্মসূচি গ্রহণ করব’।

তিনি আরও বলেন, ‘প্রশাসনের অনুরোধেই আজ (গতকাল) বেলা ১টা থেকে শাটডাউন কর্মসূচি স্থগিত ঘোষণা করছি।’

কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কর্মসূচি প্রত্যাহার করলেও অনড় রয়েছেন বিএনপিপন্থি শিক্ষকরা। শিক্ষক লাঞ্ছনার ঘটনার বিচার না হওয়া পর্যন্ত শিক্ষকদের পূর্ণদিবস কর্মবিরতি চলবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সভাপতি অধ্যাপক আব্দুল আলিম। 

তিনি বলেন, ‘চার দিন ধরে আমাদের কর্মবিরতি চলছে। প্রশাসনের ওপর আস্থা রাখার মতো কিছু পাইনি। শিক্ষকরা ওই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চায়। সেই দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই আমাদের আন্দোলন চলছে’। 

তবে জামায়াতপন্থি শিক্ষকরা ‘শাটডাউন’ কর্মসূচিতে নেই বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন। তিনি বলেন, ‘ উপ-উপাচার্যের হেনস্তার ঘটনার বিচারের দাবিতে আমরা এক দিন কর্মবিরতি পালন করেছিলাম এবং সোমবার মানববন্ধনেও সবাই একসঙ্গে ছিলাম। বিএনপিপন্থি শিক্ষকরা আমাদের কথা দিয়েছিলেন, শিক্ষার্থীদের রাকসু নির্বাচন সম্পন্ন করতে তারা সহযোগিতা করবেন এবং কর্মবিরতি প্রত্যাহার করবেন। তবে তারা সেটি না করে শাটডাউন কর্মসূচিতে গেছেন। তাদের এই কর্মসূচিতে আমাদের সংহতি নেই। গত সোমবার বিকেলেই ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী শিক্ষকদের পক্ষ থেকে কর্মবিরতি কর্মসূচি প্রত্যাহার করা হয়েছে। আমাদের শিক্ষকরা ক্লাস-পরীক্ষা রুটিন মোতাবেক চলমান রেখেছেন’।

সরেজমিনে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ভবনের বেশির ভাগ দপ্তরে তালা ঝুলছে। পরিবহন মার্কেট, টুকিটাকি চত্বর ও ক্যাম্পাসের অধিকাংশ দোকানই ছিল বন্ধ। খোলা হয়নি ক্যাম্পাসের বেশির ভাগ ভ্রাম্যমাণ খাবার ও চায়ের দোকান। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ একাডেমিক ভবনসহ অনেক ভবনের ফটকের তালাও খোলা হয়নি।

এদিকে গত ২৩ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ইফতিখারুল আলম মাসউদ স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, রাকসু নির্বাচন পেছানোর কারণে ২৪ ও ২৫ সেপ্টেম্বরে ছুটি বাতিল করা হয়েছে এবং দুর্গাপূজার ছুটি শুরু হচ্ছে আগামী ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে। এ দিকে আগামী ২৬ ও ২৭ সেপ্টেম্বর শুক্র ও শনিবার। ফলে শাটডাউন কর্মসূচিতে ক্যাম্পাসের অচলাবস্থা ও আসন্ন দুর্গাপূজার ছুটির কারণে বিভিন্ন হল থেকে ব্যাগপত্র নিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাস ছাড়তে দেখা গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন মার্কেট, টুকিটাকি চত্বরসহ বিভিন্ন জায়গায় শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিও ছিল খুবই সীমিত। প্রাণচঞ্চল এসব জায়গা অনেকটাই প্রাণহীন ছিল। তবে এর মাঝেও সমাজকর্ম বিভাগে গত দুদিনে দুটি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে জানিয়েছে বিভাগটির শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা।

গতকাল ক্যাম্পাস সংলগ্ন বিনোদপুর এলাকায় কথা হয় শিক্ষার্থী আশিকুর রহমানের সঙ্গে। ব্যাগ গুছিয়ে তিনি বাসের অপেক্ষায় ছিলেন। তার সঙ্গে আরও কয়েকজন ছিলেন। আশিকুর বলেন, ‘ক্যাম্পাসে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি। ক্লাস-পরীক্ষা হচ্ছে না। তাই চলে যাচ্ছি।’

গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বাতিল হওয়া পোষ্য কোটা ১০ শর্তে ফিরিয়ে আনে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এর প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের মধ্যেই গত শনিবার জুবেরী ভবনে শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের হাতাহাতি হয়। এরপর পোষ্য কোটা পুনর্বহাল ও শিক্ষক লাঞ্ছনাকারীদের শাস্তির দাবিতে এক দিনের কর্মবিরতি পালন করেন শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। একই দাবিতে পরদিন সোমবার থেকে তারা অনির্দিষ্টকালের ‘শাটডাউন’ কর্মসূচি শুরু করেন। 

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন গত মঙ্গলবার অফিসার্স সমিতির প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা সভা করেছে। গতকাল সকাল ১০টায় উপাচার্য সালেহ্ হাসান নকীব সম্প্রতি স্থায়ীকরণকৃত সহায়ক ও সাধারণ কর্মচারীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। সেখানে তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থে কর্মবিরতি থেকে সরে আসার আহ্বান জানানো হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতেই গতকাল দুপুরে আল্টিমেটাম দিয়ে কর্মসূচি স্থগিত করেছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

ছাত্রশিবিরের বিক্ষোভ : এদিকে শাটডাউনের প্রতিবাদে গতকাল বেলা ১১টায় মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে শাখা ইসলামী ছাত্রশিবির। এ সময় সংগঠনটির সেক্রিটারি মুজাহিদ ফয়সাল বলেন, ‘টানা তৃতীয়বারের মতো পেছানো হয়েছে রাকসু নির্বাচন। সিন্ডিকেট মিটিংয়ে পোষ্য কোটা আপাতত স্থগিত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তার মানে আবারও ১৬ অক্টোবরের আগে পোষ্য কোটার মতো একটা মীমাংসিত ইস্যুকে সামনে নিয়ে এসে রাকসু নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র হতে পারে। আর সেই হালে বাতাস দিচ্ছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও বাম সংগঠনগুলো। কিন্তু সাধারণ শিক্ষার্থীরা এই ষড়যন্ত্র আর মেনে নেবে না। রাকসু নির্বাচন যদি না হয় তাহলে এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত সেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন, শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং যারা রাকসু পেছানোর আন্দোলনের ফাঁদে পা দিয়েছিল, তাদের কাউকেই সাধারণ শিক্ষার্থীরা ক্ষমা করবে না’।

ছাত্রশিবিরের সভাপতি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ বলেন, ‘এতকিছু হয়ে যাওয়ার পরেও তারা পোষ্য কোটা ফিরিয়ে আনতে চায়। কতিপয় শিক্ষকরা যারা নির্দিষ্ট একটা দলের প্রতিনিধিত্ব করে, যাদের পৃষ্ঠপোষকতা করা ছাত্রসংগঠন রাকসু নির্বাচনে হেরে যাবে এই ভয়ে তারা পোষ্য কোটা ইস্যু সামনে আনতে চায়। তারা মূলত শিক্ষার্থীদের সার্বিক অধিকার, একাডেমিক কার্যক্রম, পড়াশোনার পরিবেশকে বাধাগ্রস্ত করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুষ্ঠু পরিবেশকে বিনষ্ট করতে চায়। তাদের আরেকটা এজেন্ডা হলো, রাকসু নির্বাচন পেছানোর অপরাজনীতি করে রাকসুকে বানচাল করা। এই ষড়যন্ত্র গত ৩৫ বছর ধরেই হয়ে আসছে। এই ষড়যন্ত্রকারীদের আমরা বলে দিতে চাই, সবকিছু মনে রাখা হবে।’