বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষি দীর্ঘকাল ধরেই প্রকৃতির সঙ্গে সংগ্রাম করছে। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং মানবসৃষ্ট নানা কারণে এ অঞ্চলের আবাদযোগ্য বিশাল এলাকা লবণাক্ত। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে (নভেম্বর থেকে মে) বৃষ্টির অভাব দেখা দিলে মাটির নিচের লবণ কৈশিক প্রক্রিয়ায় উপরে উঠে আসে। ফলে এক সময়ের শস্যশ্যামল ভূমি পরিণত হয় তথাকথিত অগুন মাটিতে, যেখানে ধান বা ডাল জাতীয় কোনো প্রচলিত ফসলই টিকতে পারে না। তবে গত কয়েক বছরের কৃষিচিত্র বলছে, এই অনুর্বরতার সমীকরণ বদলে দিচ্ছে হলুদ ফসল সূর্যমুখী। সূর্যমুখীর চাষ কীভাবে উপকূলের কৃষি বদলে দিচ্ছে, তাই জানবো আজ
বর্তমান কৃষি সংকট
সয়েল রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট-এর তথ্যমতে, বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ৫৩ শতাংশ জমি প্রত্যক্ষভাবে লবণাক্ততায় আক্রান্ত। দেশের মোট আবাদযোগ্য জমির একটি বিশাল অংশ কেবল লবণাক্ততার কারণে বছরের অর্ধেকেরও বেশি সময় পতিত থাকে। এই সংকট নিরসনে উপকূলীয় জেলা যেমন পটুয়াখালী, বরগুনা বা সাতক্ষীরায় সূর্যমুখী চাষ একটি টেকসই সমাধান হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। সূর্যমুখী একটি উচ্চ লবণাক্ততা সহনশীল এবং দ্রুত বর্ধনশীল ফসল। ধান বা মুগডাল লবণাক্ততার তীব্রতায় পুড়ে গেলেও সূর্যমুখী মাটির প্রতিকূল রসায়নের সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে ভালো ফলন দিতে সক্ষম।
ভোজ্যতেলের অর্থনীতি
বাংলাদেশে ভোজ্যতেলের চাহিদার একটি বিশাল অংশ আমদানিনির্ভর। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর ভোজ্যতেলের স্থানীয় উৎপাদন চাহিদার মাত্র ১০ থেকে ১২ শতাংশ পূরণ করতে পারে। বাকি চাহিদার জন্য পাম ও সয়াবিন তেলের আমদানিতে রাষ্ট্রকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাক্কলন অনুযায়ী, উপকূলীয় পতিত জমিগুলোকে যদি পরিকল্পিতভাবে সূর্যমুখী চাষের আওতায় আনা যায়, তবে স্থানীয় ভোজ্যতেলের উৎপাদন বিদ্যমান ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৬ শতাংশে উন্নীত করা সম্ভব। সূর্যমুখী বীজে ৪০-৪৫ শতাংশ তেল থাকে, যা পুষ্টিগুণে সরিষা বা সয়াবিনের চেয়ে অনেক এগিয়ে এবং হৃদরোগীদের জন্য অধিক স্বাস্থ্যকর।
সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ
২০০৭ সালের সিডর এবং ২০০৯ সালের আইলার পর উপকূলীয় কৃষিতে যে ধস নেমেছিল, তা কাটিয়ে উঠতে ব্র্যাকসহ বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা এবং সরকারি কৃষি বিভাগ নিরলস কাজ করছে। বর্তমানে কৃষকদের বিনা মূল্যে উচ্চফলনশীল বীজ, আধুনিক সার এবং উন্নত প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে। ব্র্যাকের জলবায়ু পরিবর্তন কর্মসূচির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সূর্যমুখী চাষ কেবল কৃষকের আয় বাড়াচ্ছে না, বরং এটি উপকূলের মাটির স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারেও পরোক্ষ ভূমিকা রাখছে। মাঠপর্যায়ে এখন ছোট ছোট তেল নিষ্কাশন যন্ত্র বা ঘানি স্থাপনের মাধ্যমে কৃষকরা নিজেরাই সূর্যমুখী তেলের বাজারজাতকরণের স্বপ্ন দেখছেন।
চ্যালেঞ্জ
সূর্যমুখী চাষ উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষদের জন্য অনেক সম্ভাবনা তো এনেছে ঠিকই, তবে এই অগ্রযাত্রার পথে কিছু চ্যালেঞ্জও বিদ্যমান। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
বিপণন ব্যবস্থা : উৎপাদিত বীজের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে শক্তিশালী বাজারজাতকরণ চেইন প্রয়োজন।
বীজ সংরক্ষণ : আর্দ্র আবহাওয়ায় সূর্যমুখী বীজ সংরক্ষণ করা কৃষকদের জন্য একটি প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ।
গবেষণা : ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়া লবণাক্ততার সঙ্গে পাল্লা দিতে আরও উচ্চ সহনশীল জাত উদ্ভাবন জরুরি।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন