ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

মাটির প্রাণ ও কৃষকের সমৃদ্ধি

মো. মাশরুফুল আলম
প্রকাশিত: এপ্রিল ১, ২০২৬, ০৬:৫৫ এএম

বাংলাদেশের কৃষিতে টেকসই উন্নয়ন এবং মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ‘ভার্মি কম্পোস্ট’ বা কেঁচো সার এখন এক অবিস্মরণীয় নাম। রাসায়নিক সারের অতি-ব্যবহার যখন মাটির উর্বরতাকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে, তখন বগুড়া সদর উপজেলার মধুমাঝিরা গ্রামের কৃষকরা দেখিয়েছেন কীভাবে সামান্য কেঁচো ব্যবহার করে ভাগ্যবদল করা সম্ভব। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে শুরু হওয়া এই ক্ষুদ্র উদ্যোগ আজ একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রামীণ শিল্পে পরিণত হয়েছে।

সূচনার ইতিহাস ও কৃষি অধিদপ্তরের দূরদর্শী ভূমিকা

বগুড়া সদর উপজেলার লাহিড়িপাড়া ইউনিয়নের মধুমাঝিরা গ্রামে ভার্মি কম্পোস্টের যাত্রা শুরু হয় একটি বিশেষ প্রদর্শনীর মাধ্যমে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বগুড়া সদরের প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় ‘কমন ইন্টারেস্ট গ্রুপ’ বা সিআইজির আওতায় এই প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। শুরুতে মাত্র ২০ জন অগ্রগামী কৃষককে নিয়ে রিং পদ্ধতিতে সার তৈরির হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এই কৃষকদের নিষ্ঠা এবং কৃষি কর্মকর্তাদের সঠিক পরামর্শই আজকের এই ব্যাপকতার মূল ভিত্তি।

পারিবারিক পর্যায় থেকে বাণিজ্যিক বিস্তৃতি

শুরুতে যা ছিল কেবল একটি প্রদর্শনী, আজ তা মধুমাঝিরা গ্রামের প্রতিটি ঘরের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বর্তমানে এই গ্রামের প্রায় সকল পরিবার ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। এটি এখন আর কেবল চাষাবাদের অনুষঙ্গ নয়, বরং একটি লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। গ্রামের কৃষকরা নিজেদের জমিতে পর্যাপ্ত পরিমাণ জৈব সার ব্যবহার করার পর যা অবশিষ্ট থাকে, তা নির্দিষ্ট ‘কালেকশন পয়েন্ট’-এর মাধ্যমে বাজারে সরবরাহ করছেন। এর ফলে গ্রামটি এখন ‘সারের গ্রাম’ হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে।

ভার্মি কম্পোস্টের অর্থনৈতিক মাইলফলক

মধুমাঝিরা গ্রামের কৃষক সংগঠনের অর্থনৈতিক সাফল্যের পরিসংখ্যান সত্যিই বিস্ময়কর ২০১৭-১৮ অর্থবছরের চিত্র : এই সময়ে সংগঠনটি প্রায় ৫০ কেজি উন্নত জাতের কেঁচো (যার বাজারমূল্য প্রায় ৫০ হাজার টাকা) এবং ৫০ মেট্রিক টন উৎপাদিত ভার্মি কম্পোস্ট বিক্রয় করেছে।

বর্তমান প্রত্যাশা : চলতি অর্থবছরে উৎপাদন ও বিক্রয়ের এই লক্ষ্যমাত্রা পূর্বের তুলনায় দ্বিগুণ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। কেঁচো সারের ক্রমবর্ধমান চাহিদা কৃষকদের পকেটে বাড়তি নগদ অর্থ নিশ্চিত করছে।

নারী ক্ষমতায়ন ও গ্রামীণ কর্মসংস্থান

ভার্মি কম্পোস্ট প্রকল্পের সবচেয়ে উজ্জ্বল দিক হলো এতে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ। মধুমাঝিরা গ্রামের নারীরা গৃহস্থালি কাজের পাশাপাশি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে কেঁচো সার উৎপাদন করছেন। এটি তাদের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি করার পাশাপাশি পরিবারে আর্থিক সচ্ছলতা এনে দিয়েছে। বাড়ির আঙিনায় বসানো রিং বা চাড়িতে সার তৈরি করা সহজ হওয়ায় নারীরা কোনো বাড়তি ধকল ছাড়াই এতে সময় দিতে পারছেন। ফলে গ্রামীণ নারী ক্ষমতায়নের এক নতুন অধ্যায় সূচিত হয়েছে।

মাটির স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত প্রভাব

উপজেলা কৃষি অফিসার মো. মাশরুফুল আলমের মতে, এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য কেবল আর্থিক লাভ নয়, বরং মাটির স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার করা। ভার্মি কম্পোস্ট বা কেঁচো সার মাটির পানি ধারণ ক্ষমতা বাড়ায়, বায়ু চলাচল উন্নত করে এবং মাটিতে উপকারী অণুজীবের সংখ্যা বৃদ্ধি করে। এটি রাসায়নিক সারের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে মাটিকে রক্ষা করে এবং বিষমুক্ত ফসল উৎপাদনে সহায়তা করে। এই সার ব্যবহারের ফলে ফসলের গুণগত মান এবং ফলনÑ উভয়ই বৃদ্ধি পাচ্ছে।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও সম্প্রসারণ

মধুমাঝিরা গ্রামের এই মডেল এখন সারা দেশের জন্য একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। জামালগঞ্জ ও সুনামগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এই প্রযুক্তির বিস্তার ঘটছে। যদি প্রতিটি গ্রামে এভাবে ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন শুরু হয়, তবে রাসায়নিক সারের ওপর আমদানি নির্ভরতা অনেকাংশে কমে আসবে এবং বাংলাদেশ একটি সমৃদ্ধ ও টেকসই কৃষিবান্ধব রাষ্ট্রে পরিণত হবে।

লেখক : উপজেলা কৃষি অফিসার

জামালগঞ্জ, সুনামগঞ্জ