× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

রূপালী ডেস্ক

প্রকাশিত: এপ্রিল ৮, ২০২৬, ০৫:২৮ এএম

লাল ফলে সবুজ বিপ্লব

স্ট্রবেরি চাষে বদলে যাচ্ছে জয়পুরহাটের কৃষি

রূপালী ডেস্ক

প্রকাশিত: এপ্রিল ৮, ২০২৬, ০৫:২৮ এএম

স্ট্রবেরি চাষে  বদলে যাচ্ছে জয়পুরহাটের কৃষি

বিদেশি ফলে ভাগ্যবদল হয়ে গেলো উত্তর বঙ্গের জয়পুরহাট জেলার জামালগঞ্জের এক চাষির। দিগন্তজোড়া সবুজ মাঠে লাল রসালো বিদেশি একটি ফল স্বপ্ন দেখাচ্ছে চাষি রবিউলকে। অনেক শখ করে তিনি নীল রঙের নেটের চাদর দিয়ে লাগিয়েছিলেন স্ট্রবেরি, যা এখন তার ভাগ্য বদলের অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। প্রায় লাখ টাকার এই ফল বিক্রি করেছেন শেষ সময়ে। জয়পুরহাটের সফল চাষি রবিউলের হাত ধরে আসা এই স্ট্রবেরি বিপ্লব এখন দেশের কৃষিতে নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। রবিউলের সেই অভিজ্ঞতার গল্প শুনেছেন মিনহাজুর রহমান নয়ন

নতুন স্বপ্নের হাতছানি : প্রথাগত কৃষি থেকে আধুনিকতায় উত্তরণ

বাংলার কৃষক যুগ যুগ ধরে ধান, পাট আর ভুট্টার ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু বিশ্বায়নের এই যুগে উচ্চমূল্যের ফসলের চাহিদা বাড়ছে। জামালগঞ্জের রবিউল ইসলামের মতো কৃষকরা বুঝেছেন যে, কেবল টিকে থাকার জন্য নয়, বরং স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য কৃষিতে বৈচিত্র্য প্রয়োজন। ভিডিওতে ফুটে ওঠা সেই বিশাল স্ট্রবেরি প্রকল্পটি আধুনিক কৃষি ব্যবস্থাপনার এক অনন্য উদাহরণ।  কৃষকের ভাষায়, স্ট্রবেরি চাষের জন্য প্রথম শর্ত হলো সঠিক জমি নির্বাচন। তারা একে বলেন ‘ভিটামাটি’ বা এমন উঁচু জমি যেখানে পানি নিষ্কাশনের সুব্যবস্থা রয়েছে। বৃষ্টির পানি বা অতিরিক্ত সেচের পানি জমে থাকলে স্ট্রবেরি গাছ দ্রুত পচে যায়। রবিউল জানান, মাটির গঠন ও উর্বরতা স্ট্রবেরির মিষ্টতা ও রঙের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। বেলে-দোআঁশ মাটিতে স্ট্রবেরির ফলন সবচেয়ে ভালো হয়।

চারা থেকে ফল : ধৈর্য, নিষ্ঠা ও নিরবচ্ছিন্ন শ্রমের আখ্যান

স্ট্রবেরি চাষ মোটেও শৌখিন বাগান করার মতো সহজ কাজ নয়। এটি এক কঠিন সাধনা। এর শুরুটা হয় মানসম্মত চারা সংগ্রহ দিয়ে। কৃষক জানান, গুণগত মানের নিশ্চয়তার জন্য তারা সাধারণত চাঁপাইনবাবগঞ্জের নার্সারিগুলো থেকে চারা সংগ্রহ করেন। চারা রোপণের সঠিক সময় হলো বাংলা কার্তিক মাসের মাঝামাঝি থেকে অগ্রহায়ণ মাস পর্যন্ত। রোপণের পর শুরু হয় এক নিবিড় পরিচর্যার যুদ্ধ। একটি ছোট্ট চারাকে দুই থেকে আড়াই মাস পর্যন্ত পরম মমতায় আগলে রাখতে হয়। সঠিক সময়ে পানি সেচ, আগাছা পরিষ্কার এবং সুষম সার প্রয়োগ করতে হয়। মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখতে অনেক সময় ‘মালচিং’ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়, যা মাটির তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে এবং ফলকে সরাসরি মাটির স্পর্শ থেকে বাঁচিয়ে রাখে। প্রায় ৭০-৮০ দিন পর যখন গাছে প্রথম ফুল আসে এবং তা থেকে গাঢ় লাল রঙের স্ট্রবেরি পরিক্ব হয়, তখন কৃষকের মুখে ফোটে তৃপ্তির হাসি। একবার ফল ধরা শুরু হলে তা টানা দুই থেকে তিন মাস পর্যন্ত সংগ্রহ করা যায়, যা দীর্ঘমেয়াদি আয়ের পথ প্রশস্ত করে।

নীল জালের রহস্য ও সুরক্ষাকবচ

পুরো স্ট্রবেরি বাগান যখন নীল জালে ঢেকে দেওয়া হয়, তখন পথচারীদের কৌতূহল জাগা স্বাভাবিক। রবিউল ইসলামের মতে, এটি কেবল সৌন্দর্যবর্ধন নয়, বরং ফসলের জীবন রক্ষাকারী বর্ম। 

পাখির আক্রমণ রোধ: স্ট্রবেরি অত্যন্ত উজ্জ্বল এবং মিষ্টি গন্ধযুক্ত হওয়ায় পাখির প্রধান আকর্ষণ হয়ে দাঁড়ায়। নীল জাল না থাকলে কাক, শালিক বা বুলবুলি নিমিষেই পাকা ফলগুলো নষ্ট করে ফেলত। 

পোকামাকড় দমন : নেটের কারণে ক্ষতিকর পোকামাকড়ের উপদ্রব অনেক কম হয়, যা পরোক্ষভাবে বিষাক্ত কীটনাশকের ব্যবহার কমাতে সাহায্য করে। 

আবহাওয়ার ভারসাম্য : এই জাল সরাসরি রোদের তীব্রতা থেকে ফলকে রক্ষা করে এবং কুয়াশার ক্ষতিকর প্রভাব থেকেও কিছুটা সুরক্ষা দেয়।

তবে এই সুরক্ষার আড়ালে চ্যালেঞ্জও কম নয়। স্ট্রবেরি খুব সংবেদনশীল হওয়ায় প্রচুর পরিমাণ সার এবং রোগবালাই দমনে নিয়মিত ওষুধের প্রয়োজন হয়। সামান্য অবহেলায় পুরো মাঠের ফলন নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

বিনিয়োগ ও মুনাফা : লাখ টাকার অর্থনীতির সমীকরণ

বর্তমানে কৃষি কেবল পেট চালানোর মাধ্যম নয়, এটি একটি শক্তিশালী বাণিজ্যিক খাত। রবিউল ইসলাম যে হিসাব দিলেন, তা সাধারণ যে কোনো ব্যবসা থেকে অনেক বেশি আকর্ষণীয়। এক বিঘা (৩৩ শতাংশ) জমিতে স্ট্রবেরি চাষের জন্য আনুমানিক খরচ হয়:

চারা ক্রয় : প্রায় ১ লাখ টাকা।

সার, ওষুধ ও জাল : ৫০-৭০ হাজার টাকা।

শ্রমিক ও সেচ : ৪০-৫০ হাজার টাকা।

মোটামুটি ২ থেকে ২.৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে একজন কৃষক সঠিক পরিচর্যা করলে এক মৌসুমেই ৪ থেকে ৫ লাখ টাকার ফল বিক্রি করতে পারেন। অর্থাৎ মাত্র ৪-৫ মাসের ব্যবধানে বিনিয়োগের দ্বিগুণ লাভ করা সম্ভব। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অন্য কোনো প্রথাগত ফসলে এত অল্প সময়ে এত বড় অংকের মুনাফা অর্জন প্রায় অসম্ভব। এই উচ্চ মুনাফাই জয়পুরহাটের জামালগঞ্জসহ আশপাশের এলাকার শত শত তরুণকে স্ট্রবেরি চাষে উদ্বুদ্ধ করছে।

ক্রপ রোটেশন : জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার ও টেকসই কৃষি

স্ট্রবেরি একটি নির্দিষ্ট মেয়াদি ফসল। শীতের বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে এর উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু রবিউল ইসলামের মতো দূরদর্শী কৃষকরা জমি ফেলে রাখেন না। তারা ব্যবহার করেন ‘ক্রপ রোটেশন’ বা ফসল আবর্তন পদ্ধতি। স্ট্রবেরি মৌসুম শেষ হওয়ার পর ওই একই উন্নত মানের তৈরি জমিতে তিনি চাষ করেন শসা, কদু (লাউ), ধান, ভুট্টা কিংবা পাট।

স্ট্রবেরি চাষের সময় জমিতে যে বিপুল পরিমাণ জৈব সার ও পুষ্টি উপাদান দেওয়া হয়, তা পরবর্তী ফসলের জন্য আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়ায়। এর ফলে পরের ফসলে সার খরচ অনেক কমে যায় এবং ফলনও হয় চমৎকার। এই পদ্ধতি কেবল জমির উর্বরতা বজায় রাখে না, বরং কৃষকের ঘরে সারা বছর অর্থপ্রবাহ সচল রাখে। এটিই আধুনিক টেকসই কৃষির মূল চাবিকাঠি।

আগামীর সম্ভাবনা : চড়াই-উতরাই ও সমাধানের পথ

বাংলার মাটিতে স্ট্রবেরি এখন আর ‘বিদেশি’ নেই, তা পুরোপুরি দেশীয় সম্পদে পরিণত হয়েছে। তবে এই উজ্জ্বল সম্ভাবনার পথে কিছু কাঁটাও রয়েছে:

সংরক্ষণাগারের অভাব : স্ট্রবেরি অত্যন্ত পচনশীল। সঠিক হিমাগার বা কোল্ড স্টোরেজ না থাকায় কৃষককে দ্রুত ফল বিক্রি করতে হয়। অনেক সময় মধ্যস্বত্বভোগীরা এর সুযোগ নিয়ে দাম কমিয়ে দেয়।

উপকরণের চড়া মূল্য : সার ও কীটনাশকের দাম বেড়ে যাওয়ায় প্রান্তিক চাষিদের জন্য প্রাথমিক বিনিয়োগ জোগাড় করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাব : স্ট্রবেরি চাষে রোগের লক্ষণ চেনা এবং সঠিক মাত্রায় ওষুধের ব্যবহার অত্যন্ত জরুরি। সরকারি পর্যায়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা গেলে ফলন আরও বাড়ানো সম্ভব।

বাংলার মাটিতে সোনার স্বপ্ন

জয়পুরহাটের রবিউলের মতো কৃষকদের হাত ধরে বাংলার গ্রামগুলো আজ অর্থনৈতিক মুক্তির পথ খুঁজছে। ভিডিওতে দেখা সেই হাসিখুশি মুখটি কেবল একজন সফল চাষির নয়, এটি লড়াকু বাংলাদেশের প্রতিকৃতি। যে মাটিতে সোনা ফলে, সেই মাটিতে আধুনিক প্রযুক্তির স্পর্শ লাগলে কী অসাধ্য সাধন করা যায়, স্ট্রবেরি চাষ তার জীবন্ত প্রমাণ।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!