বর্তমান বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে পরিবেশ আজ মহাবিপদাপন্ন। এই বিপর্যস্ত পরিস্থিতিতে নিরাপদ খাদ্যের নিশ্চয়তা এবং মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ‘জৈব কৃষি’ বা ‘অর্গানিক ফার্মিং’ এখন কোনো শৌখিনতা নয়, বরং সময়ের এক জ্বলন্ত দাবি। রাসায়নিকের ভয়াবহতা কমিয়ে বিষমুক্ত পৃথিবী গড়তে জৈব কৃষি ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই।
জৈব কৃষি কী এবং কেন এটি আবশ্যক?
জৈব কৃষি এমন একটি সমন্বিত চাষাবাদ পদ্ধতি যেখানে কৃত্রিম রাসায়নিক সার ও বিষাক্ত বালাইনাশক পুরোপুরি বর্জন করা হয়। এর পরিবর্তে ফসলের অবশিষ্টাংশ, কম্পোস্ট সার, সবুজ সার এবং প্রাকৃতিক উপায়ে পোকা দমনের মাধ্যমে মাটির উর্বরতা ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা হয়। আধুনিক কৃষিতে উৎপাদন বাড়লেও উচ্চমাত্রার রাসায়নিক ব্যবহারে মাটির প্রাণশক্তি কমছে এবং জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়ছে। পরবর্তী বংশধরদের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যেতেই জৈব কৃষির প্রবর্তন জরুরি।
জৈব সারের শক্তি ও বৈচিত্র্য
রাসায়নিক সারের বিকল্প হিসেবে জৈব কৃষিতে মাটির গঠনশৈলী ঠিক রাখতে নানা ধরনের প্রাকৃতিক উৎস ব্যবহৃত হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোÑ
খামারজাত সার ও কম্পোস্ট, হাঁস-মুরগির বিষ্ঠা ও হাড়ের গুঁড়া, সবুজ সার ও অ্যাজোলা, পচানো তরল গোবর ও ছাই।
প্রকৃতিতেই আছে নিরাময় : ভেষজ বালাইনাশক
পোকামাকড় দমনে বিষাক্ত কীটনাশকের বদলে আমাদের চারপাশের গাছপালাই হতে পারে প্রধান অস্ত্র। ধুতরা, নিম, নিশিন্দা, অড়হর, তুলসী পাতা, বিশকাটালি এবং মেহগনির ফলের রস ব্যবহার করে কার্যকরভাবে ফসল রক্ষা করা সম্ভব। এমনকি পশুর চর্মরোগ বা উকুন দমনেও বন্য তামাক ও গ্লিরিসিজিয়া পাতার ব্যবহার দারুণ কার্যকর।
আইপিএম ও আইসিএম : বালাই দমনে আধুনিক হাতিয়ার
সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা ও সমন্বিত ফসল ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি কৃষকদের মধ্যে বিপ্লব ঘটিয়েছে। এই পদ্ধতিতে উপকারী ‘বন্ধু পোকা’ (যেমনÑ ব্রাকন, লেডিবার্ড বিটল) ব্যবহার করে ক্ষতিকর পোকা ধ্বংস করা হয়। এ ছাড়া ‘সেক্স ফেরোমন’ ফাঁদ ব্যবহার করে পুরুষ পোকাকে প্রজনন থেকে বিরত রেখে প্রাকৃতিকভাবে বংশবিস্তার রোধ করা হয়। কৃষকরা বর্তমানে একে ভালোবেসে ‘জাদুর ফাঁদ’ নামে ডাকছেন।
সাফল্যের কিছু বাস্তব চিত্র
বগুনের কলম চারা : ব্যাকটেরিয়াল উইল্ট রোগ দমনে সাধারণ চারার বদলে কলম চারা ব্যবহার করে কৃষকরা ২ থেকে ৪ গুণ বেশি ফলন ও ৩ গুণ বেশি মুনাফা পাচ্ছেন।
মাছি পোকা দমন : মিষ্টি কুমড়া, করলা ও শসা চাষে ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহার করে ফসলের ৫০-৬০ শতাংশ ক্ষতি রোধ করা সম্ভব হচ্ছে।
মাটির রোগ নির্মূল : মুরগির বিষ্ঠা ও সরিষার খৈল ব্যবহারে মাটিবাহিত রোগ ও কৃমি দমন হচ্ছে ৫০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত।
অর্থনৈতিক ও বৈশ্বিক গুরুত্ব
অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের ফলে বিদেশে বাংলাদেশের সবজি রপ্তানিতে নানা বাধার সৃষ্টি হয়। জৈব পদ্ধতিতে উৎপাদিত বিষমুক্ত সবজি কেবল দেশের চাহিদা মেটাবে না, বরং আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চমূল্যে রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পথ সুগম করবে। এটি যেমন উৎপাদন খরচ কমায়, তেমনি কৃষকের শারীরিক সুস্থতাও নিশ্চিত করে।
‘সমন্বিত বালাই দমন গুণের নাইকো শেষ, কম খরচে অধিক ফলন সুস্থ পরিবেশ।Ñএই স্লোগানকে ধারণ করেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং টেকসই কৃষির জন্য জৈব কৃষি আন্দোলনকে আরও বেগবান করা প্রয়োজন। কৃষিই সমৃদ্ধি, আর সেই সমৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হোক পরিবেশবান্ধব নিরাপদ চাষাবাদ।
লেখক : উপ-পরিচালক
ময়মনসিংহ কৃষি অধিদপ্তর

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন