× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

তানজিদ শুভ্র

প্রকাশিত: এপ্রিল ২২, ২০২৬, ০৯:০৪ এএম

ক্যাম্পাসে গাছযেন এক জীবন্ত পাঠশালা

তানজিদ শুভ্র

প্রকাশিত: এপ্রিল ২২, ২০২৬, ০৯:০৪ এএম

ক্যাম্পাসে গাছযেন এক জীবন্ত পাঠশালা

কড়া রোদে ক্যাম্পাসের কংক্রিটের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে যখন ক্লান্ত লাগে, তখন পথের ধারের একটি বিশাল রেইনট্রি বা কৃষ্ণচূড়ার ছায়া আমাদের যে প্রশান্তি দেয়, তার দাম কত? আমরা হয়তো একে কেবল একটু শীতল ছায়া বা ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য হিসেবেই দেখি। কিন্তু একজন শিক্ষার্থীর জন্য এই সবুজ চত্বর কি কেবলই সাজসজ্জার অনুষঙ্গ? নাকি এর আড়ালে লুকিয়ে আছে বিশাল অঘোষিত সিলেবাস?

আমরা যারা উদ্ভিদবিজ্ঞান বা প্রকৃতি নিয়ে পড়ি, আমাদের জন্য পুরো ক্যাম্পাসটাই একটা খোলা ল্যাবরেটরি। বইয়ের পাতায় যখন আমরা ট্যাক্সোনমি বা ইকোলজি পড়ি, তখন জানালার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা অর্জুন বা জারুল গাছটিই আমাদের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হয়ে ওঠে। একটি পাতায় কীভাবে সালোকসংশ্লেষণ হচ্ছে বা একটি ফুলে কীভাবে পরাগায়ন ঘটছে, তা বুঝতে দামি মাইক্রোস্কোপের চেয়েও গাছের সান্নিধ্য বেশি কার্যকর। পৃথিবীর নামি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, তারা তাদের ক্যাম্পাসকে কেবল ভবন দিয়ে নয়, বরং একেকটি আর্বোরেটাম বা বৃক্ষ উদ্যান হিসেবে গড়ে তোলে। অক্সফোর্ড বা হার্ভার্ডের মতো বিদ্যাপীঠগুলোতে প্রতিটি গাছের একটি আলাদা পরিচয় নম্বর এবং ইতিহাস সংরক্ষিত থাকে। আমাদের দেশের ক্যাম্পাসগুলোতেও যদি প্রতিটি গাছের গায়ে তার বাংলা ও বৈজ্ঞানিক নামসহ ছোট নেমপ্লেট থাকত, তবে একজন সাধারণ শিক্ষার্থীও হাঁটতে হাঁটতে অবচেতন মনেই চিনে নিতে পারত তার চারপাশের প্রকৃতিকে। এটিই তো শিক্ষার সবচেয়ে শক্তিশালী ধরন-যেখানে শিখতে কোনো ক্লাসরুম লাগে না। আমাদের দেশের অনেক ক্যাম্পাসে ইতোমধ্যে এ ধরনের কার্যক্রম চোখে পড়ে যা খুবই প্রশংসনীয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, সবুজের কাছাকাছি থাকলে মানুষের মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা বাড়ে। মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘ সময় কম্পিউটারে কাজ করার পর মাত্র ৪০ সেকেন্ড যদি কেউ সবুজ প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে থাকে, তবে তার মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা অনেকাংশে বেড়ে যায়। একে বলা হয় ‘এটেনশন রিস্টোরেশন থিওরি’।

শিক্ষার্থীদের ওপর পড়াশোনার যে মানসিক চাপ থাকে, তা কমাতে প্রকৃতির কোনো বিকল্প নেই। ক্যাম্পাসের সবুজায়ন কেবল পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে না, বরং এটি আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের একটি বড় ওষুধ। আমরা যখন কোনো গাছের তলায় বসে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিই বা একা বই পড়ি, তখন আমাদের অজান্তেই গাছগুলো আমাদের কর্টিসল হরমোনের মাত্রা কমিয়ে দেয়। কর্টিসল হরমোন মূলত মানসিক চাপ তৈরি করে।

আক্ষেপের বিষয় হলো, আমরা আমাদের ক্যাম্পাসের অনেক প্রিয় জায়গার নাম জানি, কিন্তু যে গাছটির নিচে প্রতিদিন বসি, তার নাম হয়তো জানি না। এই গাছটি কি ওষুধি? এটি কি বিপন্ন কোনো প্রজাতি? এই প্রশ্নগুলো যখন একজন শিক্ষার্থীর মনে জাগবে, তখনই প্রকৃত শিক্ষার প্রসার ঘটবে। গাছ কেবল অক্সিজেন দেয় না, সে আমাদের ধৈর্য ধরতে শেখায়, ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে শেখায়।

ক্যাম্পাসে নতুন ভবন নির্মাণের প্রয়োজনে যখন কোনো শতবর্ষী গাছ কাটা পড়ে, তখন আমরা কেবল একটি কাঠই হারাই না, বরং হারিয়ে ফেলি একটি দীর্ঘ ইতিহাস এবং একটি জীবন্ত পাঠ্যবইকে।

ক্যাম্পাসকে ‘জীবন্ত পাঠশালা’ হিসেবে গড়ে তোলার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হতে পারে প্রথাগত শ্রেণিকক্ষকে চার দেয়ালের গ-ি থেকে বাইরে নিয়ে আসা। সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি সংকট বা তীব্র দাবদাহের মতো পরিস্থিতিতে আমরা দেখেছি, দেশের বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা বিকল্প হিসেবে খোলা আকাশের নিচে গাছের ছায়ায় ক্লাস করছেন। এটি কেবল কোনো সাময়িক সমাধান নয়, বরং শিক্ষার একটি অত্যন্ত আধুনিক ও মনস্তাত্ত্বিক পদ্ধতি। বিদেশের অনেক নামি বিদ্যাপীঠে ‘আউটডোর লার্নিং’ বা মুক্ত বাতাসের শিক্ষা এখন বেশ জনপ্রিয়। যখন একজন শিক্ষক বটতলায় বা কৃষ্ণচূড়ার ছায়ায় বসে পাঠদান করেন, তখন সেই স্নিগ্ধ পরিবেশ শিক্ষার্থীদের মনের একঘেয়েমি দূর করে এবং তাদের সৃজনশীলতাকে উসকে দেয়। প্রকৃতির এই সান্নিধ্য শিক্ষার্থীদের ক্লান্তি কমায় এবং শেখার প্রক্রিয়াকে আরও টেকসই ও প্রাণবন্ত করে তোলে। এভাবে ক্লাসরুমের সীমাবদ্ধতা ভেঙে প্রকৃতিকে সরাসরি পাঠ্যবইয়ের সঙ্গে যুক্ত করলে শিক্ষা আর শুধু মুখস্থ বিদ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।

ক্যাম্পাস সবুজায়ন মানে কেবল কিছু চারা রোপণ করা নয়, বরং আগামী প্রজন্মের জন্য একটি শেখার পরিবেশ তৈরি করা। গাছগুলো কথা বলতে পারে না ঠিকই, কিন্তু তারা আমাদের প্রতিনিয়ত ধরিত্রী এবং প্রাণের স্পন্দন সম্পর্কে শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছে। তাই ক্যাম্পাসের গাছকে কেবল সৌন্দর্যের মোড়ক হিসেবে না দেখে, একে শিক্ষার একটি অপরিহার্য অংশ হিসেবে গ্রহণ করার সময় এসেছে। আমাদের ক্যাম্পাসগুলো হোক একেকটি সবুজ লাইব্রেরি, যেখানে প্রতিটি পাতা হবে একটি করে নতুন শেখার গল্প।
লেখক : শিক্ষার্থী (উদ্ভিদবিজ্ঞান), ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজ, গাজীপুর।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!