বর্ষায় যেখানে শুধু পানি আর পানি, সেই বিস্তীর্ণ জলরাশিই শুষ্ক মৌসুমে পরিণত হয় সোনালি ধানের মাঠে। হাওর এই অনন্য ভূপ্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করেই জীবন ও জীবিকা গড়ে তুলেছেন সুনামগঞ্জের লাখো কৃষক। ২০২৬ সালেও সেই চিরচেনা সংগ্রাম আর আশার গল্প নতুন করে লেখা হচ্ছে কখনো হাসিতে, কখনো অশ্রুতে।
এক ফসলেই ভরসা, তবু সোনালি স্বপ্ন : জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সুনামগঞ্জের ১৩৭টি হাওরে এবার ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে হাওরের গভীর অংশে ১ লাখ ৬৫ হাজার ২৭৫ হেক্টর এবং তুলনামূলক উঁচু অংশে ৫৮ হাজার ২৩৬ হেক্টর। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন। হাওরাঞ্চলের কৃষি মূলত এক ফসলনির্ভর বোরো ধানই এখানে জীবনরেখা। দেশের খাদ্য ভান্ডারে এই অঞ্চলের অবদান বিশাল। মাঠে ধানের ফলন ভালো হলেও কৃষকদের মুখে পুরোপুরি হাসি নেই খরচ বেড়েছে, লাভ কমেছে, আর অনিশ্চয়তা আগের মতোই রয়ে গেছে।
আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে হাওর : মার্চ-এপ্রিল এলেই বাড়ে দুশ্চিন্তা। পাহাড়ি ঢল নামলেই মুহূর্তে তলিয়ে যেতে পারে পুরো ফসল। এ বছরও মার্চের শুরুর দিকে আগাম বন্যার শঙ্কা তৈরি হয়। প্রশাসনের সতর্কতায় অনেক কৃষক আগেভাগেই ধান কেটে ফেলেন। হাওরপাড়ের কৃষক নজির হোসেনের ভাষায়, একটা ঝড়, এক দিনের বন্যা সব শেষ করে দিতে পারে। কিন্তু সবার পক্ষে সেই আগাম প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব হয়নি। বৃষ্টি ও উজানের পানিতে অনেক খেত এখনো ডুবে আছে।
ডুবে যাওয়া স্বপ্ন: সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার বংশীকুন্ডা এলাকার কৃষক হানিফ মিয়ার কণ্ঠে হাওরের বাস্তবতা আরও নির্মম ‘সব তলায়া গেছে। কিছুই পাই নাই। ধারদেনা কইরা সার, বীজ, কীটনাশক কিনছিলাম। কেমনে শোধ অইবো, জানি না। গত কয়েকদিনের ভারী বৃষ্টিতে প্রতিদিনই নতুন নতুন জমি পানির নিচে চলে যাচ্ছে। প্রায় পাকা ধান তলিয়ে যাচ্ছে, আর যেসব ধান তড়িঘড়ি করে কাটা হয়েছে, সেগুলোও রোদ না থাকায় পচে যাওয়ার ঝুঁকিতে।
এখনো প্রায় ১৮ হাজার হেক্টর জমি পানির নিচে। হাওর এলাকায় প্রায় ৭১ শতাংশ জমির ধান কাটা সম্ভব হলেও, সার্বিকভাবে (হাওর ও হাওরের বাইরের এলাকা মিলিয়ে) গড়ে ৬০ শতাংশ ধান ঘরে তোলা গেছে। অর্থাৎ এখনো প্রায় ৪০ শতাংশ ধান মাঠে ঝুঁকির মধ্যে। এই আকস্মিক বন্যায় কৃষকদের প্রায় ২০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কৃষক জয়নাল আবেদীনের কণ্ঠে বাস্তবতা আরও স্পষ্ট ‘ধান ভালো হইছে, কিন্তু পানি বাড়ায় মেশিন নামানো যায় না। শ্রমিক নাই, মজুরি বেশি। লাভ আগের মতো নাই, তবু কিছু ফসল ঘরে তুলতে পারছি এইটাই বড় কথা।’
তবুও আশাবাদী : সব চ্যালেঞ্জের মাঝেও হাওর নিয়ে আশাবাদী বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, টেকসই বাঁধ নির্মাণ ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, আধুনিক জল ব্যবস্থাপনা, ধানের পাশাপাশি বিকল্প ফসলের চাষ, সংরক্ষণ ও বাজার ব্যবস্থার উন্নয়ন, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে হাওরের কৃষিতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
যন্ত্রের ছোঁয়ায় বদলাচ্ছে হাওর : তবুও আশার আলো একেবারে নিভে যায়নি। এবার কিছু জায়গায় প্রযুক্তির ব্যবহার কৃষকদের স্বস্তি দিয়েছে। কম্বাইন হারভেস্টারের মাধ্যমে দ্রুত ধান কাটা, উন্নত মানের বীজ সরবরাহ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ এসব উদ্যোগ মাঠপর্যায়ে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাও সরাসরি মাঠে গিয়ে কৃষকদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন, দিচ্ছেন প্রয়োজনীয় পরামর্শ।
জলবায়ুর নতুন সমীকরণ : জলবায়ু পরিবর্তন হাওরের কৃষিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে। এখন আর বন্যার সময় নির্দিষ্ট নেই, বৃষ্টিপাত হচ্ছে অনিয়মিত, হঠাৎ তাপমাত্রা বাড়ছে। ফলে কৃষকদের নতুন বাস্তবতায় খাপ খাইয়ে নিতে হচ্ছে নতুন কৌশল শিখে। আগের অভিজ্ঞতা আর পুরোপুরি কাজে লাগছে না প্রতিটি মৌসুম যেন এক নতুন পরীক্ষা।
সংগ্রামের মাঝেই ভবিষ্যৎ, হাওর মানে শুধু পানি নয়, এটি বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার এক বড় ভরসা। সুনামগঞ্জের কৃষকরা প্রতিদিন প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে যে ফসল ফলান, তা শুধু তাদের জীবিকা নয়, পুরো দেশের প্রাণ। এই লড়াইয়ের গল্পে আছে স্বপ্ন, আছে বেদনা, আছে অদম্য সাহস। প্রযুক্তির বিস্তার, সময়োপযোগী সহায়তা এবং টেকসই পরিকল্পনা নিশ্চিত করা গেলে, জলের বুকেই লেখা হবে বাংলাদেশের কৃষির সবচেয়ে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ।
লেখক : মধ্যনগর (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন