× UCB Sticker Card
সোমবার, ২০ জুলাই, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

আসাদুজ্জামান বকুল

প্রকাশিত: মে ৬, ২০২৬, ০৬:৩৮ এএম

বন্যার আশঙ্কায় কৃষকের প্রস্তুতি

আসাদুজ্জামান বকুল

প্রকাশিত: মে ৬, ২০২৬, ০৬:৩৮ এএম

বন্যার আশঙ্কায় কৃষকের প্রস্তুতি

জলবায়ু পরিবর্তনের বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চল এখন ভয়াবহ পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে। টানা বর্ষণ এবং উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলের ফলে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা ইতোমধ্যেই প্রান্তিক কৃষকের মেরুদ- ভেঙে দিয়েছে। এর ওপর যোগ হয়েছে আগাম বন্যার অশনিসংকেত। কৃষিপ্রধান এই দেশে দুর্যোগ মানে কেবল জনপদের প্লাবন নয়, বরং তা খাদ্য নিরাপত্তার ওপর চরম আঘাত। বন্যার ক্রান্তিলগ্নে কৃষকের কঠোর পরিশ্রমের ফসল রক্ষা করতে হলে কেবল গতানুগতিক পদ্ধতি নয়, বরং বিজ্ঞানসম্মত ও গবেষণালব্ধ প্রস্তুতির প্রয়োজন। বিস্তারিত থাকছে লেখায়

বীজ ও কৃষি উপকরণের নিরাপত্তা

বন্যার পানি জনপদে প্রবেশের আগেই প্রথম এবং প্রধান কাজ হলো কৃষি উপকরণের সুরক্ষা। কৃষি প্রকৌশলীদের মতে, রাসায়নিক সার (বিশেষ করে ইউরিয়া) আর্দ্রতা পেলে দ্রুত গলে যায় এবং কার্যকারিতা হারায়। তাই পানি দেখা মাত্র বীজ, সার এবং ক্ষুদ্র কৃষি যন্ত্রপাতি পলিথিনে মুড়িয়ে উঁচু মাচা বা নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হবে। বিশেষ করে বীজের ক্ষেত্রে বায়ুরোধী পাত্র বা প্লাস্টিকের ড্রাম ব্যবহার করা শ্রেয়, যাতে দীর্ঘমেয়াদি জলাবদ্ধতায়ও বীজের অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা নষ্ট না হয়।

ভাসমান পদ্ধতির উপযোগিতা

বন্যার সময় প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় চারা তৈরি। প্লাবিত অঞ্চলে যখন সাধারণ জমি তলিয়ে যায়, তখন গবেষণালব্ধ ভাসমান বীজতলা পদ্ধতি হতে পারে কৃষকের জন্য রক্ষাকবচ। কলাগাছের ভেলা, বাঁশের চাটাই বা কচুরিপানার স্তূপের ওপর পলিমাটির আস্তরণ দিয়ে এই বীজতলা তৈরি করা যায়। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পদ্ধতিতে উৎপাদিত চারা মূল জমিতে রোপণের পর অত্যন্ত দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং প্রতিকূল পরিবেশ সহ্য করার ক্ষমতা রাখে।

প্লাবন পরবর্তী ব্যবস্থাপনা

বন্যার পানি সরে যাওয়ার পর ধানের চারা রক্ষায় বিশেষ সতর্কতার প্রয়োজন হয়। চারা যদি পলিমাটিতে ঢাকা পড়ে থাকে, তবে পরিষ্কার পানি ছিটিয়ে তা দ্রুত পরিষ্কার করতে হবে। পলিমাটি চারার সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়া ব্যাহত করে, যা চারাকে মেরে ফেলতে পারে। বন্যা পরবর্তী সময়ে চারার দ্রুত বৃদ্ধির জন্য পরিমিত পরিমাণে ইউরিয়া সার প্রয়োগ অত্যাবশ্যক। গবেষকরা পরামর্শ দেন যে, জমির ফাঁকা জায়গাগুলো সুস্থ চারা দিয়ে দ্রুত পূরণ করতে হবে। এ ছাড়া চারার ডগা বা পাতা ৮-১০ সেন্টিমিটার আগা কেটে দেওয়া এবং বালাইনাশক স্প্রে করা জরুরি, যাতে পচনশীল রোগব্যাধি আক্রমণ করতে না পারে।

সবজি ও তুলা চাষ

বন্যাকবলিত এলাকায় বসতবাড়ির আঙিনায় বা কলার ভেলায় টব, মাটির চাড়ি, কাঠের বাক্স বা পলিব্যাগে ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো ও বেগুনের চারা উৎপাদন করা যেতে পারে। এটি কেবল বন্যার সময় সবজির জোগান দেয় না, বরং বন্যার পর আগাম সবজি বাজারে এনে কৃষকের আর্থিক ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সাহায্য করে। তুলা চাষের ক্ষেত্রে গবেষকরা ডিবলিং বা গর্ত করে বীজ বপন পদ্ধতির কথা বলেন। পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে পলিব্যাগে উৎপাদিত তুলার চারা মূল জমিতে স্থানান্তর করলে ফলন ব্যাহত হয় না।

পাট ও আখ সুরক্ষা পদ্ধতি

পাট ও আখের মতো অর্থকরী ফসল বন্যায় ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ে। পাটের ক্ষেত্রে ডগা কেটে মাটিতে পুঁতে দেওয়ার মাধ্যমে কাটিং পদ্ধতি অবলম্বন করে মানসম্মত বীজ উৎপাদন সম্ভব। অন্যদিকে, আখের জমি প্লাবিত হওয়ার আগে গোড়ায় মাটি দিয়ে শক্ত করে বেঁধে দেওয়া জরুরি। পানির স্রোতে আখ যেন হেলে না পড়ে, সে জন্য জমির আইলে ধনিঞ্চার মতো শক্ত কা-ের উদ্ভিদ রোপণ করা যেতে পারে। বন্যার পর আখের পুরাতন পাতা ছেঁটে ফেলা এবং অতিরিক্ত কুশি সরিয়ে দিয়ে সুস্থ ৫-৬টি কুশি রাখলে আখের বৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয়।

বিনা চাষে ফসল উৎপাদন

বন্যার পানি সরে যাওয়ার পর জমি দীর্ঘ সময় কাদাটে থাকে। এই সময় জো আসার অপেক্ষা না করে বিনা চাষে ফসল বপন একটি কার্যকর কৃষি কৌশল। গিমাকলমি, লালশাক, ডাঁটা, পালং, ধনিয়া এবং মাষকলাইয়ের মতো ফসল কাদা মাটিতেই ভালো জন্মে। আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত জমির ক্ষেত্রে মাটি আলগা করে ছাই মিশিয়ে দিলে জমির অতিরিক্ত রস দ্রুত শুকিয়ে যায়। এতে শেকড় পচা রোগের হাত থেকে ফসল রক্ষা পায়। স্থানীয় কৃষি অফিসের পরামর্শ অনুযায়ী নির্দিষ্ট মাত্রায় ইউরিয়া ও পটাস সার প্রয়োগ করলে মাটির উর্বরতা দ্রুত ফিরে আসে।

বৃক্ষ সুরক্ষা

ফলের চারার ক্ষেত্রে জলাবদ্ধতা সবচেয়ে বিপজ্জনক। রোপিত চারার গোড়ায় যেন পানি না জমে, সে জন্য দ্রুত নিকাশ নালা তৈরি করতে হবে। বানের স্রোতে চারা হেলে পড়লে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে সোজা করে দেওয়া এবং গোড়ায় পর্যাপ্ত মাটি দেওয়া আবশ্যক। মাটি শুকিয়ে গেলে সঠিক পরিমাণে সার প্রয়োগ করে গাছের জীবনীশক্তি ফিরিয়ে আনতে হবে।

দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা

কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্যোগকালীন কৃষি কেবল ব্যক্তিগত উদ্যোগ নয়, এটি একটি সমন্বিত প্রক্রিয়া। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট-এর বিজ্ঞানীদের মতে, বন্যাপ্রবণ এলাকায় কৃষকদের বন্যা সহনশীল জাতের ধান (যেমন- ব্রি-ধান ৫১, ব্রি-ধান ৫২) চাষে উৎসাহিত করা উচিত। আগাম বন্যার পূর্বাভাস পাওয়ামাত্রই পাকা ফসল (৮০ শতাংশ পাকলে) দ্রুত কেটে ঘরে তোলার পরামর্শ দেন তারা। বন্যা বা জলাবদ্ধতা প্রকৃতির অমোঘ নিয়ম হতে পারে, কিন্তু সঠিক প্রস্তুতি ও বৈজ্ঞানিক কৃষি পদ্ধতি অবলম্বন করলে ফসলের ক্ষতি ন্যূনতম পর্যায়ে নামিয়ে আনা সম্ভব। সরকারের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এবং মাঠ পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তাদের নিয়মিত তদারকি ও পরামর্শই পারে  দুর্যোগে কৃষকের মুখে হাসি ধরে রাখতে। দুর্যোগে ধৈর্য নয়, বরং সঠিক কর্মপরিকল্পনাই ভরসা।

 

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!