× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

মিনহাজুর রহমান নয়ন

প্রকাশিত: মে ৬, ২০২৬, ০৬:৩৯ এএম

হাওর এলাকায় বিকল্প কৃষি ব্যবস্থা

মিনহাজুর রহমান নয়ন

প্রকাশিত: মে ৬, ২০২৬, ০৬:৩৯ এএম

হাওর এলাকায় বিকল্প  কৃষি ব্যবস্থা

বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি জেলা নিয়ে বিস্তৃত হাওরাঞ্চল দেশের এক অনন্য ভৌগোলিক ও আর্থ-সামাজিক জনপদ। এই বিশাল নীলাভ জলরাশি যেমন অফুরন্ত প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ, তেমনি এর কৃষি ব্যবস্থা অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং প্রকৃতি-নির্ভর। হাওরের অর্থনীতি মূলত ‘একফসলি’ বোরো ধানের ওপর নির্ভরশীল। বছরের প্রায় সাত মাস জলমগ্ন থাকা এই অঞ্চলে কৃষকরা তাদের সারা বছরের স্বপ্ন বুনে দেন কেবল একটি ফসলের ওপর। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অসময়ে আকস্মিক বন্যা, শিলাবৃষ্টি এবং পাহাড়ি ঢল প্রায় প্রতি বছরই কৃষকের সেই স্বপ্নকে ম্লান করে দেয়।

ধান চাষের এই উচ্চ ঝুঁকির কারণে হাওরবাসীর জীবনযাত্রায় স্থবিরতা নেমে আসে এবং দারিদ্র্য বৃদ্ধি পায়। এই প্রেক্ষাপটে, কেবল একটি ফসলের ওপর নির্ভর না করে হাওরের বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদকে কাজে লাগিয়ে বিকল্প কৃষির পথ খোঁজা এখন সময়ের দাবি। বর্ষাকালে জলমগ্নতাকে অভিশাপ মনে না করে একে ভাসমান সবজি চাষ, আধুনিক মৎস্য খামার বা পর্যটনের মতো লাভজনক খাতে রূপান্তর করা সম্ভব। আধুনিক প্রযুক্তি ও স্থানীয় জ্ঞানের সমন্বয় ঘটিয়ে যদি হাওরের বৈচিত্র্যময় পরিবেশকে কাজে লাগানো যায়, তবে এটি কেবল কৃষকের ভাগ্য বদলাবে না, বরং দেশের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে। মূলত প্রথাগত কৃষির সীমাবদ্ধতা ভেঙে বহুমুখী আয়ের উৎস তৈরি করাই হলো বর্তমান সময়ে হাওর অঞ্চলের কৃষির প্রধান চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা। নি¤েœ হাওরাঞ্চলের বিকল্প কৃষি ব্যবস্থা আলোচনা করা হলো-

ভাসমান বেডে সবজি চাষ : মাটির অভাব জয়

হাওরে বছরের প্রায় সাত থেকে আট মাস পানি থাকে, ফলে সমতল ভূমির অভাব এখানে প্রকট। এই সমস্যা সমাধানে ‘বেড’ বা ‘ধাপ’ পদ্ধতি হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর বিকল্প। কচুরিপানা, দুলালী লতা ও বাঁশের কাঠামো দিয়ে তৈরি ভাসমান বেডে অনায়াসেই ঢ্যাঁড়শ, করলা, টমেটো, লালশাক এবং শসা চাষ করা সম্ভব। এই পদ্ধতির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, বন্যার পানি বাড়লে ফসলের বেডটিও ভেসে ওঠে, ফলে ফসল ডুবে যাওয়ার কোনো ভয় থাকে না। এটি কেবল কৃষকের পারিবারিক পুষ্টির চাহিদাই মেটায় না, বরং বাণিজ্যিকভাবেও অত্যন্ত লাভজনক।

সমন্বিত মৎস্য ও মুক্তা চাষের বিপ্লব

হাওর মানেই মাছের আধার। তবে প্রথাগত মাছ ধরার বাইরে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মৎস্য চাষ এখন নতুন দিগন্ত খুলে দিচ্ছে।

খাঁচায় মাছ চাষ : নদীর প্রবাহমান পানিতে বা হাওরের স্থির পানিতে জালের খাঁচা তৈরি করে পাঙ্গাস, তেলাপিয়া বা পাতি মাগুর চাষ করা যায়। এতে কম খরচে অধিক উৎপাদন সম্ভব।

মুক্তা চাষ : হাওরের মিষ্টি পানিতে প্রচুর প্রাকৃতিকভাবে ঝিনুক জন্মে। এই ঝিনুকগুলোকে কাজে লাগিয়ে বাণিজ্যিকভাবে মুক্তা চাষ করা সম্ভব। বর্তমানে বাংলাদেশে নকশা করা মুক্তার চাহিদা বাড়ছে, যা হাওরবাসীর জন্য একটি উচ্চমূল্যের বিকল্প আয়ের পথ হতে পারে।

হাঁস পালন ও পোল্ট্রি শিল্পের বাণিজ্যিকীকরণ

হাওরের বিশাল উন্মুক্ত জলাভূমি হাঁস পালনের জন্য প্রাকৃতিক স্বর্গ। এখানে হাঁসগুলো প্রাকৃতিকভাবে শামুক, ঝিনুক ও জলজ পোকামাকড় খেয়ে বড় হয়, ফলে খাদ্যের খরচ অর্ধেকের নিচে নেমে আসে। খাকি ক্যাম্পবেল বা জিংডিং জাতের হাঁস পালন করে দৈনিক ডিমের উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। এ ছাড়া হাওরের কান্দা বা উঁচু জায়গায় ছোট ছোট পোলট্রি ফার্ম স্থাপন করে মুরগির মাংস ও ডিমের স্থানীয় চাহিদা মেটানো যেতে পারে।

আধুনিক শুঁটকি ও মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র

বর্ষা মৌসুমে হাওরে প্রচুর পরিমাণে ছোট ও মাঝারি দেশি মাছ পাওয়া যায়। সংরক্ষণের অভাবে অনেক সময় জেলেরা ন্যায্যমূল্য পান না। স্বাস্থ্যসম্মত ড্রায়ার পদ্ধতিতে (যেমন- সোলার ড্রায়ার) শুঁটকি তৈরি করলে এর দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব বাড়ে এবং বাজারে চড়া মূল্যে বিক্রি করা যায়। এ ছাড়া মাছের ফিলেট বা ফ্রোজেন ফিশ প্রসেসিং ইউনিট স্থাপন করা গেলে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং অপচয় কমবে।

ইকো-ট্যুরিজম ও রিভার-বেসড ইকোনমি

টাঙ্গুয়ার হাওর, নিকলী বা হাকালুকির মতো পর্যটন কেন্দ্রগুলো এখন ভ্রমণপিপাসুদের প্রধান আকর্ষণ। কৃষিকাজের মন্দা মৌসুমে স্থানীয় কৃষকরা পর্যটন খাতে যুক্ত হতে পারেন। আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন হাউসবোট পরিচালনা, স্থানীয় লোকজ সংস্কৃতি প্রদর্শন এবং পর্যটকদের জন্য ঐতিহ্যবাহী খাবারের ব্যবস্থা করার মাধ্যমে বিশাল একটি অর্থনৈতিক খাত তৈরি হয়েছে। এটি হাওরের মানুষকে শুধু কৃষির ওপর নির্ভরশীল থাকা থেকে মুক্তি দিচ্ছে।

৬. রবি শস্য ও স্বল্পমেয়াদি ফসলের প্রসার

বোরো ধানের পাশাপাশি বা এর আগে-পরে স্বল্পমেয়াদি ফসলের চাষ বাড়ানো প্রয়োজন। সরিষা, সূর্যমুখী, বাদাম এবং বিভিন্ন ডাল জাতীয় শস্য বন্যার পানি আসার আগেই সংগ্রহ করা সম্ভব। এ ছাড়া আধুনিক উচ্চফলনশীল ও আগাম জাতের ধান চাষ করলে বন্যার ঝুঁকি অনেককাংশেই কমিয়ে আনা যায়।

হিজল-করচের বন ও প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষা

হাওরের ঢেউ বা ‘আফাল’ থেকে গ্রাম ও ফসলি জমি রক্ষায় হিজল, করচ, বরুণ ও জলসহিষ্ণু গাছের বন সৃজন করা জরুরি। এই গাছগুলো পানির নিচে কয়েক মাস টিকে থাকতে পারে। এগুলো কেবল ঢেউয়ের ঝাপটা থেকে গ্রাম রক্ষা করে না, বরং মাছের প্রাকৃতিক অভয়াশ্রম হিসেবে কাজ করে এবং জ্বালানি কাঠের জোগান দেয়।

সমন্বিত উদ্যোগই পরিবর্তনের চাবিকাঠি

হাওরের কৃষি আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা করে টিকে থাকতে হলে প্রথাগত ধান চাষের পাশাপাশি আমাদের এই বিকল্পগুলোর দিকে ঝুঁকতেই হবে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষি ঋণ এবং আধুনিক বিপণন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারলে হাওর অঞ্চল দেশের জন্য এক সমৃদ্ধ অর্থনৈতিক করিডর হয়ে উঠবে। প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে নয়, বরং প্রকৃতিকে কাজে লাগিয়েই হাওরবাসীর ভাগ্যের পরিবর্তন আনা সম্ভব।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!