বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে গবাদি পশু পালন একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু দেশি জাতের গরুর স্বল্প মাংস ও দুধ উৎপাদন ক্ষমতা অনেক সময় খামারিদের লাভের মুখ দেখতে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার আধুনিক বৈজ্ঞানিক সমাধান হলো ‘কৃত্রিম প্রজনন’। বর্তমানে সরকারের প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর এবং বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগে এটি সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে, যা গবাদি পশুর জাত উন্নয়নে বিপ্লব ঘটাচ্ছে।
কৃত্রিম প্রজনন আসলে কী?
সহজ কথায়, উন্নত জাতের ষাঁড় থেকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বীর্য সংগ্রহ করে তা প্রক্রিয়াজাত ও হিমাগারে সংরক্ষণ করা এবং পরবর্তীতে যখন গাভী প্রজনন ঋতুতে (হিটে) আসে, তখন বিশেষ যন্ত্রের সাহায্যে ওই সংরক্ষিত বীর্য গাভীর জরায়ুতে স্থাপন করার প্রক্রিয়াকেই কৃত্রিম প্রজনন বলা হয়।
উন্নয়নের মাইলফলক : কেন এটি সেরা?
প্রাকৃতিক প্রজননের তুলনায় কৃত্রিম প্রজনন কেন বেশি কার্যকর, তার কিছু শক্তিশালী কারণ রয়েছে:
১. উন্নত জাতের দ্রুত বিস্তার : একটি ষাঁড় থেকে প্রাকৃতিক উপায়ে বছরে সর্বোচ্চ ৬০-৭০টি গাভী প্রজনন সম্ভব। কিন্তু কৃত্রিম পদ্ধতিতে একটি ষাঁড়ের বীর্য দিয়ে বছরে হাজার হাজার গাভীকে গর্ভধারণ করানো যায়। ফলে ভালো জাতের গরুর সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
২. রোগব্যাধি প্রতিরোধ : প্রাকৃতিক প্রজননের মাধ্যমে অনেক সময় ছোঁয়াচে যৌন ব্যাধি ছড়িয়ে পড়ে। কৃত্রিম প্রজননে বীর্য ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করা হয় বলে রোগের ঝুঁকি প্রায় থাকে না।
৩. সাশ্রয়ী ও ঝুঁকিমুক্ত : উন্নত জাতের একটি ষাঁড় কেনা এবং লালন-পালন করা সাধারণ খামারির জন্য বেশ ব্যয়সাপেক্ষ ও কষ্টসাধ্য। কৃত্রিম প্রজননের ফলে সেই বাড়তি খরচ ও বড় ষাঁড় সামলানোর ঝুঁকি থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।
৪. পরিবহন সুবিধা : দূর-দূরান্তে ষাঁড় নিয়ে যাওয়া অসম্ভব হলেও একটি কনটেইনারে করে হাজার হাজার ডোজ হিমায়িত বীর্য দেশের যেকোনো প্রান্তের খামারির দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।
চ্যালেঞ্জ ও সীমাবদ্ধতা
সুবিধার পাশাপাশি এই পদ্ধতিতে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। যেমনÑ দক্ষ টেকনিশিয়ানের অভাব। অদক্ষ লোক দিয়ে প্রজনন করালে গাভীর জরায়ুতে ইনফেকশন হতে পারে। এ ছাড়া খামারি যদি গাভী হিটে আসার সঠিক সময় শনাক্ত করতে ভুল করেন, তবে গর্ভধারণের হার অনেক কমে যায়। সরঞ্জাম সংরক্ষণে তরল নাইট্রোজেনের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
খামারিদের প্রতি পরামর্শ
সফল কৃত্রিম প্রজননের জন্য গাভী হিটে আসার ১২ থেকে ১৮ ঘণ্টার মধ্যে অভিজ্ঞ এআই টেকনিশিয়ানের শরণাপন্ন হতে হবে। প্রজননের সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা এবং ভালো মানের জাত নির্বাচন করা জরুরি।
বাংলাদেশের ডেইরি শিল্পকে স্বাবলম্বী করতে এবং মাংসের চাহিদা মেটাতে কৃত্রিম প্রজননের কোনো বিকল্প নেই। সঠিক প্রশিক্ষিত জনবল এবং আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটাতে পারলে এই পদ্ধতির মাধ্যমেই আমাদের দেশি গরুগুলো একসময় বিশ্বমানের দুগ্ধ উৎপাদনকারী পশুতে রূপান্তরিত হবে। খামারিদের সচেতনতা এবং আধুনিক প্রযুক্তির গ্রহণই পারে গ্রামীণ অর্থনীতিতে সমৃদ্ধি আনতে।
লেখক : লাইভস্টক অ্যাসিস্ট্যান্ট, এসিআই অ্যানিমেল জেনেটিক্স, শ্রীপুর, কুমিল্লা

