× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

ড. ফোরকান আলী

প্রকাশিত: মে ২০, ২০২৬, ০৩:২৯ এএম

পলিথিনের বিষাক্ত শহরে শ্বাস নিচ্ছে  ভবিষ্যৎ

ড. ফোরকান আলী

প্রকাশিত: মে ২০, ২০২৬, ০৩:২৯ এএম

পলিথিনের বিষাক্ত শহরে শ্বাস নিচ্ছে  ভবিষ্যৎ

মাইক্রোপ্লাস্টিক! আজকের বিশ্বের এক আতংকের নাম। খাদ্যকণা, প্রাণিদেহ, উদ্ভিদ, মাটি, বাতাস বা সমুদ্রÑসবখানেই মিলছে এর অস্তিত্ব। প্লাস্টিক আমাদের জীবনযাত্রা সহজ করেছে সত্যি, কিন্তু বিনিময়ে পৃথিবীকে যে খেসারত দিতে হচ্ছে, তা আগে থেকে জানলে হয়তো প্লাস্টিক উদ্ভাবনই করতেন না কেউ। কার্বন-হাইড্রোজেনের বিশেষ গঠনে তৈরি এ যৌগের আণবিক গঠন ভীষণ শক্ত। বৈজ্ঞানিক ভাষায় এ ধরনের যৌগকে বলে হাইড্রো-কার্বন। প্লাস্টিক বিশেষ ধরনের হাইড্রোকার্বন। নানারকম প্লাস্টিক আছে। যেমন খুব পরিচিত একধরনের প্লাস্টিক হলো পলিথিন (পলিইথিলিন)। বেশ সহজে ভাঙে না বা ছেঁড়ে না। ইচ্ছেমতো আকার দেওয়া যায়, স্থিতিস্থাপক ধর্ম আছে। পানিতে নষ্ট হয় না। এক কথায় একটা বস্তুর সোনায় সোহাগা হতে যত গুণ দরকার, তার সবই আছে প্লাস্টিকের। আর সেটাই হয়েছে কাল। দীর্ঘ সময় পর প্লাস্টিকের কণা ভেঙে পরিণত হয় মাইক্রোপ্লাস্টিকে। প্রশ্ন হলো, মাইক্রোপ্লাস্টিকের পরে প্লাস্টিকের পরিণতি কী হয়? আমাদের দেশের জন্য এটি বড় হুমকি। প্লাস্টিক ও পলিথিনের কারণে দেশ যেন অবরুদ্ধ হয়ে গেছে। শহরের আনাচে-কানাচে গ্রামে-গঞ্জে যেখানেই তাকাই সেখানেই প্লাস্টিক বোতল ও পলিথিন ব্যাগ দেখতে পাওয়া যায়। খোলা মাঠে, নর্দমা, পুকুর, খাল, বিল নদী সর্বত্র পলিথিন ব্যাগের ছড়াছড়ি। পলিথিন ব্যাগ দামে সস্তা এবং পানিতে ভিজেও এটা নষ্ট হয় না; এ কারণেই মানুষ প্লাস্টিক বোতল ও পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার করছে। অথচ এই প্লাস্টিক বোতল ও পলিথিন মানুষের জীবনে যে কত বড় বিপদ ডেকে আনছে সেদিকে কারো কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। প্লাস্টিক বোতল ও পলিথিন কেবলমাত্রা মানুষের স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতিই করে না।

এটা মাটির উর্বরতা হ্রাস ও গাছের বৃদ্ধি হ্রাস করে দেয়। বাংলাদেশের মতো এত নি¤œ মানের পলিথিন বিশ্বের আর কোথাও ব্যবহার করা হয় না। উল্লেখ করা প্রয়োজন, প্লাস্টিক বোতল ও পলিথিন তৈরি হয় পলিমার বা হাইড্রোকার্বন উপাদান দিয়ে। এই পলিমার অণুগুলো এত শক্তভাবে গ্রন্থিত থাকে যে ক্ষদ্রাতিক্ষুদ্র ফাঙ্গাস বা ব্যাকটেরিয়াও এর ভেতরে প্রবেশ করতে পারে না। ফলে প্লাস্টিক বোতল ও পলিথিন শত শত বছর ধরে একইভাবে থাকতে পারে। প্লাস্টিক বোতল ও পলিথিন যেহেতু নষ্ট হয় না এবং যেহেতু পলিথিন বিনাশ করার কোনো ব্যবস্থা নেই; সেহেতু তা পুড়িয়ে ফেলা হয়। আর এই প্লাস্টিক বোতল পলিথিন পোড়ানোর ফলে বায়ু মারাত্মকভাবে দূষিত হয়। প্লাস্টিক বোতল ও পলিথিন পোড়ানোর পর এক ধরনের বিষাক্ত গ্যাস হাইড্রোজেন সায়ানাইট উৎপন্ন হয়। যা গ্যাস শ্বাস নালীতে গেলে মারাত্মক ব্যাধি হতে পারে।

পশ্চিমা দেশগুলোতে পলিথিনের মারাত্মক হুমকি থেকে রক্ষা পেতে পচনশীল প্লাস্টিক তৈরি করেছে। এ ধরনের প্লাস্টিক ব্যাকটেরিয়া দ্বারা বিভাজিত হয়ে মাটিতে এবং সূর্যের অতিরঞ্চিত রশ্মি দ্বারা নিঃশেষিত হতে পারে। প্রাপ্ততথ্যে জানা যায়, পচনশীল প্লাস্টিক তৈরিতে কিছু অতিরিক্ত সেলুলোজ অথবা স্টার্চ মেশাতে হয়। ভুট্টা বা চালের স্টার্চ যা মাটিতে ব্যাকটেরিয়া খেয়ে ফেলতে পারে। একবার এই প্রক্রিয়ার মধ্যে পড়লে অবশিষ্ট প্লাস্টিকের অনুগঠন ভেঙে যায়। এ ধরনের প্লাস্টিক পরিবেশের ক্ষতি করতে পারে না। পলিথিন ব্যাগ ব্যবহারের হুমকি সম্পর্কে এদেশের সাধারণ মানুষ অবগত নয়। তবে যারা জানে তারাও নির্দিধায় ব্যবহার করে চলেছে। প্লাস্টিক বোতল ও পলিথিনের ব্যবহার উন্নত দেশে দেখা গেলেও তা পরিবেশের ওপর কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না। অনুসন্ধানে জানা যায়, বাংলাদেশ প্রথম পলিথিন ব্যাগের ব্যবহার শুরু হয় আশির দশকে।

এর আগে মানুষ কাগজ, পাট ও কাপড়ের ব্যাগ ব্যবহার করত। দামে সস্তা এবং নষ্ট না হওয়ার কারণে পলিথিন ব্যাগ দ্রুত বাজার পেতে থাকে। একপর্যায়ে পলিথিন পাটের ব্যাগের স্থান দখল করে নেয়। একেবারে নি¤œ আয়ের লোক থেকে শুরু করে উচ্চ আয়ের লোকেরা পলিথিন ব্যবহার করছে। ব্যবহারের পর তা আবার যত্রতত্র ফেলে দিচ্ছে। এগুলো কোথাও না কোথাও জড়ো হয়ে মানুষের সমস্যার সৃষ্টি করছে। আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের এক রিপোর্টে জানা যায়, পলিথিন বা প্লাস্টিক যখন মাটির সংস্পর্শে আসে তখন উপকারী ব্যাকটেরিয়া, যা মাটির উর্বরতা বৃদ্ধিতে সহায়ক, সেগুলো মরে যায়। এর ফলে মাটি তার উর্বরতা হারায়। মাঠে বিচরণকারী গবাদিপশুর জন্যও পলিথিন বিপদ ডেকে আনতে পারে। এক হিসেবে জানা যায়, বর্তমান শুধু ঢাকা শহরেই প্রতিদিন প্রায় ৬০ লাখ পলিথিন ব্যবহৃত হয়।

এর মধ্যে মাত্র ২০ শতাংশ অপসারণ করা সম্ভব হয়। বাকিটা যত্রতত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু এই পলিথিনের কারণেই ধ্বংস হতে পারে পুরো বাংলাদেশ। পরিবেশবিদ এবং কৃষি বিজ্ঞানীদের মতে, কৃষি খাত থেকে শুরু করে দোকান থেকে কিনে আনা সামান্য পুরি-পেঁয়াজুতেও পলিথিনের ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, পলিথিনের সবচেয়ে বড় ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে মাটির স্তরে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়Ñ গ্রামের অনেক বাড়িতে কিংবা শহরের টং দোকানগুলোতে বৃষ্টির পানি আটকানোর জন্য উপরে প্লাস্টিক বা পলিথিন ব্যবহার করা হয়। কারণ, পলিথিন সহজে ফুটো হয় না। ঠিক তেমনি পলিথিন মাটিতে গেলে ক্ষয় হয় না বা মাটির সঙ্গে মিশে যায় না। মাটিতে পরার পর বা মাটির একটু নিচে চলে যাওয়ার পর সেই পলিথিনের মধ্য দিয়ে নিচের দিকে আর পানি যেতে পারে না। অর্থাৎ, মাটির স্তরে পানি প্রবেশ চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হয় পলিথিনের কারণে।

মাটিতে পানি ও প্রাকৃতিক পুষ্টি উপাদানের চলাচলকে বাধাগ্রস্ত করে। যার ফলে মাটির স্বাভাবিক কাজ ব্যাহত হয়। শস্যের ফলন কমে যায়। এমনকি শুধু মাটির নিচের ওসব পলিথিনের কারণে গাছও তার খাবার পায় না। গাছ দুর্বল হওয়া মানে কম অক্সিজেনের উৎপাদন। যার ফলে বাতাসে কার্বন-ডাই অক্সাইড, সিসা এসবের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া। কারণ গাছ এসব গ্যাস গ্রহণ করে ফেলে। অক্সিজেনের স্বল্পতার একটি অন্যতম প্রভাব হচ্ছে হাঁপানি কিংবা শ্বাসরোগ প্রভৃতি হওয়া। দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব হিসেবে বলা যায়, রাজধানীসহ সারা দেশে জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ অসচেতনতায় ফেলে দেওয়া উচ্ছিষ্ট সব পলিথিন। পলিথিনের কারণে অন্যসব আবর্জনাও জট পাকিয়ে থাকে।

একজন নাগরিক যখন একটি পলিথিন রাস্তায় ফেলছেন, ধরে নিতে হবে কয়েক বছর পরও সেই পলিথিন ঢাকার কোনো না কোনো ড্রেনে আটকে আছে কিংবা বুড়িগঙ্গায় গিয়ে জমা পড়েছে। বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক বর্জ্যে অনেক আগেই বিষাক্ত হয়ে গেছে বুড়িগঙ্গার পানি। বাতাসে ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। নদীর তলদেশে জমাট বেঁধেছে ৮ ফুট পুরু পলিথিনের স্তর। পুরু পলিথিনের স্তরের কারণে বুড়িগঙ্গার তলদেশের পানি একেবারেই নষ্ট হয়ে গেছে, নষ্ট হয়ে গেছে তলদেশের কয়েক ফুট মাটিও। তবে আশঙ্কাজনক একটি ক্ষতি হয়ে গেছে এই নদীর, যা খুব বেশি আলোচনায় আসে না, তা হলোÑ বুড়িগঙ্গার পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন বর্তমানে অনেক কম। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ও প্রাণিবিজ্ঞানীদের মতে মাছ ও জলজ প্রাণীর বসবাসের জন্য প্রতি লিটার পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ ৫ মিলিগ্রাম বা তার বেশি থাকা প্রয়োজন।

অপরদিকে দ্রবীভূত হাইড্রোজেন মাত্রা কমপক্ষে ৭ মিলিগ্রাম থাকা উচিত। অথচ বুড়িগঙ্গা নদীর পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণ প্রায় শূন্যের কোটায়। এমন পানিতে কোনো জলজপ্রাণী বাঁচতে পারে না। পলিথিনের সরাসরি ব্যবহারেও সমস্যা রয়েছে। এ ছাড়া গরম খাবার পলিথিনে নিলে সেই খাবার মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রকাশনায় উল্লেখ করা হচ্ছেÑ এটি মানুষ, প্রাণী এবং পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। পয়োনিষ্কাশনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে বন্যার কারণ হিসেবে দেখা দেয়। সাগর ও নদীর তলদেশে জমার কারণে মাটি, পানি, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং সামুদ্রিক জীবের ক্ষতি করে এবং যেসব প্লাস্টিক পুনরায় ব্যবহারের অনুপযোগী, তা মারাত্মকভাবে পরিবেশ দূষণ করে। প্লাস্টিক ব্যবহার জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি তৈরি করে এবং প্রজনন ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ধ্বংস করে, শ্বাস-প্রশ্বাসের অসুবিধা এবং ক্যানসারের কারণ হিসেবে দেখা দেয়।

বৈশ্বিক উঞ্চায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনেও রয়েছে পলিথিনের কুপ্রভাব। পরিবেশসংক্রান্ত জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির একটি পজিশন পেপার থেকে জানা যায়, পলিথিন বা প্লাস্টিক উৎপাদন প্রক্রিয়ায় গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ হয়, যা জলবায়ু পরিবর্তনে ভূমিকা রাখছে। এক সমীক্ষায় দেখা যায়, প্রতিবছর প্লাস্টিক উৎপাদনে প্রায় ১৭ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ব্যবহার করা হয়। এক কেজি প্লাস্টিক উৎপাদনে প্রায় দুই থেকে তিন কেজি পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হয়, যা বৈশ্বিক উঞ্চায়নে ভূমিকা রাখে। এর থেকে মুক্তি পেথে স্মার্ট বিন, রিসাইক্লিং অ্যাপ এবং অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে ময়লা ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক এবং কার্যকর করা যেতে পারে।

এ ছাড়া, ডেটা বিশ্লেষণ ও মনিটরিংয়ের মাধ্যমে ময়লা ব্যবস্থাপনার প্রক্রিয়াকে উন্নত করা যেতে পারে। বায়োডিগ্রেডেবল প্লাস্টিক এবং অন্যান্য পরিবেশবান্ধব উপকরণ ব্যবহারে কোম্পানিগুলোকে উৎসাহিত করতে হবে। আমাদের দেশে পলিথিন ব্যাগ ও প্লাস্টিকের বোতলের ব্যাপক ব্যবহার পরিবেশ এবং জনস্বাস্থ্যের উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। এর থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত প্রচেষ্টা এবং জনসচেতনতা। সরকার, বেসরকারি খাত, এনজিও এবং সাধারণ জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা একটি পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যকর সবুজ শহর গড়ে তুলতে পারি। এসবের পাশাপাশি জনগণকেও আরও সচেতন হয়ে এগিয়ে আসতে হবে। মানুষের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি করা ছাড়া বাজার থেকে পুরোপুরি পলিথিন বিদায় করা যাবে না। নীতিগত জায়গা থেকে আরও কিছু ভাবার রয়েছে। কিছু পণ্যের বাজারজাতকরণে পলিথিন ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া থাকলে, আর তা প্রস্তুতে কারখানা থাকলে, পলিথিন বন্ধ করা কঠিনসাধ্য হয়ে পড়বে। তাই এ বিষয়ে সমন্বিত সিদ্ধান্তের প্রয়োজন।

লেখক : গবেষক ও সাবেক অধ্যক্ষ

 

 

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!