ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

উৎসবের আমেজ শেষে মাঠের ডাক

মিনহাজুর রহমান নয়ন
প্রকাশিত: জুন ৩, ২০২৬, ০৬:১৫ এএম

ঈদুল আজহার আনন্দ ও ত্যাগের মহিমা শেষে গ্রাম-বাংলার জনজীবনে আবার ফিরে এসেছে চিরচেনা ব্যস্ততা। ঈদের কোরবানি, আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে যাওয়া এবং উৎসবের আমেজ কাটিয়ে কৃষকেরা আবার তাদের চিরসবুজ চারণভূমি অর্থাৎ ফসলের মাঠে ফিরেছেন। গ্রামীণ অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলেনÑ আমাদের কৃষকেরা। তাদের উৎসবের ছুটিটা শহরের চাকরিজীবীদের মতো দীর্ঘ হয় না। কারণ প্রকৃতির নিয়ম আর ফসলের চক্র কোনো উৎসবের জন্য থমকে থাকে না। ঈদের পরদিনই অনেক চাষিকে দেখা গেছে লাঙল, জোয়াল কিংবা ট্রাক্টর নিয়ে মাঠে নেমে পড়তে। এই ফিরে আসা কেবলই জীবিকার তাগিদে নয়, এটি দেশের কোটি কোটি মানুষের খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করার এক নীরব ও মহান সংকল্প। উৎসবের ক্লান্তি ভুলে রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে মাঠের পর মাঠ সবুজ ফসলে ভরিয়ে তোলার এই যে চিরন্তন প্রচেষ্টা, তা সত্যিই অনন্য।

বর্ষার আবহে আউশ ও আমনের ব্যস্ততা

সাধারণত ঈদুল আজহার সময়টাতে প্রকৃতিতে বর্ষার আগমন ঘটে কিংবা বর্ষা পুরোদমে সক্রিয় থাকে। এই সময়ে কৃষকদের প্রধান ব্যস্ততা থাকে আমন ধানের বীজতলা তৈরি এবং আউশ ধান কাটার প্রস্তুতি নিয়ে। ঈদের রেশ কাটতে না কাটতেই কৃষকেরা তাদের জমিতে চাষ দিতে শুরু করেন। বৃষ্টির জমিনকে কাজে লাগিয়ে কাদা মাটি তৈরি করা এবং সেখানে আমনের চারা রোপণের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করাই এখন মাঠের প্রধান দৃশ্য। যারা আগেভাগেই বীজতলা তৈরি করেছিলেন, তারা এখন চারা তোলার কাজে ব্যস্ত। আবার কোথাও কোথাও দেরিতে হওয়া আউশ ধান কাটার ধুম পড়েছে। একদিকে ফসল ঘরে তোলার আনন্দ, অন্যদিকে নতুন ফসল বোনার ব্যস্ততাÑ এই দুইয়ের মেলবন্ধনে গ্রামীণ জনপদ এখন মুখরিত। উৎসবের পর অলস সময় কাটানোর কোনো সুযোগ কৃষকের নেই, কারণ সামান্য এক দিনের অবহেলা পুরো মৌসুমের ফলনে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

সবজি চাষে নতুন উদ্দীপনা

শুধু ধান চাষেই নয়, ঈদের পর মাঠের সবজি চাষিরাও সমান ব্যস্ত সময় পার করছেন। বর্ষাকালীন বিভিন্ন সবজি যেমন চালকুমড়া, ঝিঙে, চিচিঙ্গা, পটল, ঢ্যাঁড়শ এবং করলার পরিচর্যায় তারা দিনরাত পরিশ্রম করছেন। ঈদের দিনগুলোতে বাজারে সবজির সরবরাহ কিছুটা কম থাকলেও, উৎসব শেষ হতেই কৃষকেরা সতেজ সবজি বাজারে তোলার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠেছেন। মাঠ থেকে সদ্য তোলা তরতাজা সবজি ভ্যানে করে বা মাথায় করে স্থানীয় বাজারে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য এখন চোখে পড়ার মতো। তা ছাড়া, আগাম শীতকালীন সবজির চারা তৈরির জন্য অনেকেই এখন থেকেই উঁচু জমি প্রস্তুত করতে শুরু করেছেন। বৃষ্টি থেকে চারা রক্ষা করার জন্য পলিথিনের ছাউনি দেওয়া বা বিশেষ যতেœ বীজতলা আগলে রাখার কাজে ব্যস্ত সময় কাটছে তাদের।

গবাদি পশুর যতেœ নতুন অধ্যায়

ঈদুল আজহার সঙ্গে গবাদি পশুর একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। অনেক কৃষকই সারা বছর ধরে কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে গরু, মহিষ বা ছাগল পালন করেন। ঈদ চলে যাওয়ার পর তাদের গোয়ালঘরগুলো এখন অনেকটাই ফাঁকা। তবে কৃষকের খামার বা গোয়াল একদম শূন্য থাকে না। যেসব গাভী বা ছোট বাছুর রয়ে গেছে, সেগুলোর প্রতি এখন বাড়তি নজর দিতে হচ্ছে। কোরবানির হাটে ভালো দাম পাওয়ার পর কৃষকদের হাতে এখন কিছু নগদ অর্থ রয়েছে, যা তারা পরবর্তী মৌসুমের চাষাবাদ এবং নতুন করে গবাদি পশু কেনার পেছনে বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছেন। ঈদের ধকল কাটিয়ে উঠে খামারিরা আবার গোয়ালঘর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা, পশুর জন্য কাঁচা ঘাসের জোগান দেওয়া এবং বর্ষাকালীন পশুর রোগবালাই প্রতিরোধে টিকা দেওয়ার কাজে মনোযোগ দিচ্ছেন।

শ্রমের বাজারে নতুন প্রাণের স্পন্দন

উৎসবের দিনগুলোতে গ্রামীণ বাৎসরিক দিনমজুর ও কৃষি শ্রমিকেরা নিজেদের পরিবার-পরিজনের সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন। ঈদ শেষ হতেই গ্রামীণ শ্রমের বাজারে আবার তীব্র প্রতিযোগিতা ও কর্মচাঞ্চল্য শুরু হয়েছে। সকালের আলো ফোটার আগেই কোদাল, কাস্তে হাতে মোড়ের মাথায় বা হাটে শ্রমিকদের জড়ো হতে দেখা যায়। গৃহস্থরা তাদের মাঠের কাজের জন্য দরদাম করে শ্রমিক নিয়ে যাচ্ছেন। এ সময়ে ধানের চারা রোপণ বা জমি নিড়ানি দেওয়ার জন্য অতিরিক্ত শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ যেমন বাড়ছে, তেমনি প্রতিটি মানুষের কর্মসংস্থানও নিশ্চিত হচ্ছে। উৎসবের আনন্দকে পুঁজি করে প্রত্যেকেই এক নতুন শক্তিতে কাজ করে যাচ্ছেন।

আবহাওয়ার চ্যালেঞ্জ ও কৃষকের লড়াই

ঈদের পর কাজে ফেরার এই সময়ে কৃষকদের প্রকৃতির সঙ্গে এক বড় রকমের যুদ্ধ করতে হয়। বর্ষার মরসুমে অসময়ের ভারি বৃষ্টিপাত, আকস্মিক বন্যা কিংবা তীব্র তাপপ্রবাহ কৃষকের কাজের গতিকে বাধাগ্রস্ত করে। অনেক সময় দেখা যায়, ঈদের পরপরই টানা বৃষ্টিতে নিচু জমিগুলো তলিয়ে গেছে, যার ফলে কষ্টের বীজতলা নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়। কিন্তু বাংলার কৃষক দমে যাওয়ার পাত্র নন। প্রতিকূল আবহাওয়ার মাঝেই তারা জমিতে কোমর বেঁধে নেমে পড়েন। অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনের জন্য নালা তৈরি করা, বাতাসে হেলে পড়া চারাগুলোকে সোজা করে দেওয়া কিংবা বৃষ্টির হাত থেকে ফসল বাঁচানোর জন্য পলিথিনের ব্যবহারÑ সব মিলিয়ে এক অবিরাম লড়াই চলে প্রকৃতির সঙ্গে। এই লড়াকু মনোভাবই দেশের কৃষিকে টিকিয়ে রেখেছে।

প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বদলে যাওয়া মাঠের চিত্র

আধুনিক যুগে ঈদের পর মাঠের কাজে ফেরার দৃশ্যপটে এসেছে এক বড় পরিবর্তন। ঐতিহ্যবাহী লাঙল-গরুর জায়গায় এখন ট্র্যাক্টর ও পাওয়ার টিলারের গর্জন মাঠজুড়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। ঈদের ছুটির পর যান্ত্রিক চাষাবাদের কারণে কৃষকেরা খুব দ্রুত তাদের জমি প্রস্তুত করতে পারছেন। ধান রোপণের জন্য রাইস ট্রান্সপ্লান্টার কিংবা ফসল কাটার জন্য কম্বাইন হারভেস্টারের ব্যবহার কৃষকের সময় ও শ্রম দুটোই বাঁচিয়ে দিচ্ছে।

প্রযুক্তির এই সহজলভ্যতার কারণে উৎসবের আমেজ কাটিয়ে মাঠে মানিয়ে নিতে কৃষকদের এখন খুব বেশি বেগ পেতে হচ্ছে না। দ্রুত কাজ শেষ করে তারা বাজারের চাহিদা অনুযায়ী ফসল উৎপাদনে বেশি মনোযোগ দিতে পারছেন।

সোনালি স্বপ্নের বুনিয়াদ ও ভবিষ্যতের প্রত্যাশা

ঈদুল আজহার পর কৃষকের এই মাঠে ফেরা কেবল একটি নিয়মিত রুটিন নয়, এটি আগামী দিনের সোনালি স্বপ্নের বুনিয়াদ। প্রতিটি বীজের ভেতরে লুকিয়ে থাকে একটি পরিবারের স্বপ্ন, সন্তানের পড়াশোনার খরচ আর সংসারের সচ্ছলতা। উৎসবের খরচ চুকিয়ে কৃষকেরা এখন তাকিয়ে আছেন মাঠের আসন্ন ফলনের দিকে। মাঠের সবুজ চারাগুলোর দিকে তাকালে কৃষকের চোখে ভেসে ওঠে এক সমৃদ্ধ আগামীর ছবি। তাদের এই অক্লান্ত পরিশ্রমের ওপর নির্ভর করেই দেশের মানুষের ভাতের থালা পূর্ণ হয়। ঈদ কেটে গেছে, কিন্তু কৃষকের উৎসব আসলে তখনই পূর্ণতা পায়, যখন মাঠের ফসল সুফলা হয়ে ওঠে এবং তা ন্যায্যমূল্যে ঘরে তোলা যায়। সেই সোনালি ভবিষ্যতের প্রত্যাশায় ঘাম ঝরানো হাসিমুখে মাঠের কাজে মগ্ন আমাদের কৃষক সমাজ।