ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গেছে। সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে আর ১২ দিন পর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত ভোট। এমন পরিস্থিতিতে দেশের অন্যান্য আসনের মতো জমে উঠেছে ঢাকা-১১ আসনের ভোটযুদ্ধও। রামপুরা, বাড্ডা ও ভাটারা থানা নিয়ে গঠিত এই আসনে ভোটারসংখ্যা ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৫৫। এর মধ্যে রয়েছে বিপুলসংখ্যক সংখ্যালঘু ভোটার। এখানে নারী ভোটার ২ লাখ ১৬ হাজার ১৯৮ ও পুরুষ ভোটার ২ লাখ ২২ হাজার ৮৭৭ এবং হিজড়া ভোটার রয়েছেন তিনজন। এটি জাতীয় সংসদের ১৮৪ নম্বর আসন।
এই আসনে অনেক প্রার্থীই লড়ছেন। তাদের মধ্যে হাতপাখা নিয়ে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মাওলানা ফজলে বারী মাসউদ, ট্রাক প্রতীক নিয়ে গণঅধিকার পরিষদের আরিফুর রহমান (আরিফ) এবং লাঙল প্রতীক নিয়ে জাতীয় পার্টির শামীম আহমেদ রয়েছেন। তবে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপির প্রার্থী দলটির ক্ষুদ্রঋণ বিষয়ক সম্পাদক এম এ কাইয়ুম ও ১১-দলীয় জোট মনোনীত প্রার্থী এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। এমনটাই মনে করছেন এলাকাবাসী।
সমমনা দলগুলোর মধ্যে আসন সমঝোতার অংশ হিসেবে এই আসনটি নাহিদ ইসলামকে ছেড়ে দেয় জামায়াতে ইসলামীসহ ১১-দলীয় জোটের অন্য শরিকরা। ফলে জামায়াত তাদের সম্ভাব্য প্রার্থী অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমানকে প্রত্যাহার করে নেয়।
এই আসনে নির্বাচনি তপশিল ঘোষণার আগে থেকেই বিএনপি প্রার্থী এম এ কাইয়ুম পরোক্ষ গণসংযোগ চালিয়ে গেছেন। তিনি এই এলাকার বাসিন্দা হওয়ায় আগে থেকেই এলাকাবাসীর সঙ্গে তার নিবিড় যোগাযোগ রয়েছে। তাদের সংকট-সম্ভাবনায় তিনি সব সময়ই পাশে থেকেছেন। মাঝখানে টানা ১৭ বছর আওয়ামী লীগ শাসনামলে কাইয়ুম ছিলেন স্বেচ্ছানির্বাসনে। এলাকাবাসী তাকে ভোলেননি। সে বিষয়ে অবগত বলেই এম এ কাইয়ুম আসন্ন নির্বাচন নিয়ে মোটামুটি নিশ্চিন্ত ও নির্ভার। এই সংসদীয় আসন ঘুরে ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে রূপালী বাংলাদেশের প্রতিবেদকের এমনটাই মনে হয়েছে। মাঝখানে বিএনপির এই প্রার্থীর দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয় নিয়ে বেশ আলোচনা-সমালোচনা হয়। সে সংকট এখন আর নেই। সব কিছু মিলিয়ে এম এ কাইয়ুম বর্তমানে টেনশনমুক্ত বলে জানা গেছে।
জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদ ব্যক্ত করে রূপালী বাংলাদেশকে এম এ কাইয়ুম বলেন, আমরা ব্যাপক কাজ করছি। প্রচুর সভা-সমাবেশ ও উঠান বৈঠক করছি, ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। ধারণা করছি, এবার ভোটকেন্দ্রে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ যাবে এবং ভোট দেবে। তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে আমরা অবিচল ছিলাম, কখনো আদর্শবিচ্যুত হইনি, সব সময় মানুষের পাশে থেকেছি।
কাইয়ুম বলেন, বিএনপির শাসনামলে ওয়ার্ড কমিশনার হিসেবে এলাকার ব্যাপক উন্নয়ন করেছি, গুলশান-বাড্ডা লিংক রোড আমরাই করেছি, আমরাই এলাকায় গ্যাস সংযোগ দিয়েছি, তাই ঢাকা-১১ আসনের মানুষ আমাদের ভোলেনি। তিনি আরও বলেন, নির্বাচিত হলে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এই এলাকাকে মাদকমুক্ত এলাকা হিসেবে গড়ে তুলব। আমরা সোসাইটিগুলোকেও সঙ্গী হিসেবে নেব। যেখানে সোসাইটি নেই, সেখানে সোসাইটি করে দিতে আমরা কাজ করছি। কাইয়ুম দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, অতীত অভিজ্ঞতা থেকে আমাদের নির্বাচনি অঙ্গীকার মানুষ বিশ্বাস করছে, তাই জনগণ এবার বিপুল ভোটে আমাদের জয়যুক্ত করবে ইনশা আল্লাহ। উন্নয়ন, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজ, মাদক এবং বৈষম্যমুক্ত সমাজ গড়া এম এ কাইয়ুমের অন্যতম অঙ্গীকার।
এবার গতানুগতিক ভোটের সমীকরণ বদলে দিতে নির্বাচনি মাঠে সমানতালে কাজ করে যাচ্ছেন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম নায়ক ১১-দলীয় জোটের প্রার্থী এনসিপির আহবায়ক নাহিদ ইসলাম। প্রথমে ভোটের মাঠে তার অবস্থান খুব একটা সুবিধাজনক ছিল না। তবে ধীরে ধীরে তিনি এগিয়ে এসেছেন। একপর্যায়ে জায়গা করে নিয়েছেন এবং এখন প্রার্থী হিসেবে তার অবস্থান মোটামুটি শক্ত। এ জন্য তাকে শ্রম-ঘাম ব্যয় করতে হয়েছে। তিনি বিভিন্ন মহল্লায় ছুটে যাচ্ছেন, সব শ্রেণির ভোটারের সঙ্গে কুশলবিনিময় করছেন, তাদের খোঁজখবর নিচ্ছেন, এলাকার উন্নয়নে তার রোডম্যাপ তুলে ধরছেন। তার এই কৌশল ভোটারদের মনে ধরেছে।
সরেজমিনে কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, তাকে নিয়ে ভোটারদের মধ্যে রীতিমত চর্চা চলছে। তার মিষ্টি হাসি, সুন্দর বাচনভঙ্গি আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছে। বিপুলসংখ্যক তরুণের পাশাপাশি বয়সি ও মাঝবয়সি মানুষও তার পেছনে একাট্টা হতে শুরু করেছেন। মহল্লা-মহল্লায় শোভা পাচ্ছে তার দৃষ্টিনন্দন নির্বাচনি ক্যাম্প ও পোস্টার-ব্যানার। নাহিদ ইসলাম লিফলেট আকারে একটি অঙ্গীকারনামাও বিলি করছেন। তাতে তিনি ভোটারদের কাছে সুশাসন, নিরাপত্তা পরিষেবা ও শিক্ষা-স্বাস্থ্যসহ বেশ কিছু অঙ্গীকার করেছেন। তার ভাষ্য মতে, সংসদ সদস্য হিসেবে সিটি করপোরেশন ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করার মাধ্যমে তিনি ঢাকার পূর্বাংশকে বর্তমান বিশ্বের উপযোগী স্বাস্থ্যকর, নিরাপদ, আরামদায়ক এবং নাগরিক সুবিধাসমৃদ্ধ একটি আবাসিক এলাকা হিসেবে গড়ে তুলতে চান। এসব কারণে নাহিদ ইসলামের গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে। এ ছাড়া তরুণসহ বিভিন্ন বয়সি ভোটারদের কিছু অংশ তার দিকে ঝুঁকছেন, এতে ভোটের ফলে শাপলাকলি বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা একেবারে নাকচ করে দেওয়া যায় না।
জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী নাহিদ ইসলাম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, আমরা আশা করি ১১-দলীয় ঐক্যজোট বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করবে। তিনি বলেন, জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা ধারণ করে সংস্কারের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে হলে ১১-দলীয় জোটের বিকল্প নেই। তিনি আরও বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জয়ী হয়ে আমরা সংসদে যেতে চাই- আমাদের সামনে এখন এটাই একমাত্র এজেন্ডা।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন