বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের প্রশিক্ষণার্থী নারী পাইলটকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে পাইলট সাদিফ হোসেনের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী চিফ অব ট্রেনিং ক্যাপেটন সাজ্জাদের কাছে অভিযোগ করার পরও কোনো প্রতিকার মিলেনি। উল্টো ক্যাপটেন সাজ্জাদ তাকে দোষারোপ করেন এবং তার ট্রেনিং নিয়ে জটিলতা তৈরি হবে বলে ভয় দেখান।
অভিযুক্ত পাইলট সাদিফ হোসন পতিত আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী চিফ অব প্ল্যানিং অ্যান্ড শিডিউলিং ক্যাপ্টেন ইশতিয়াক হোসেনের ছেলে।
এ বিষয়ে ওই নারী পাইলট রূপালী বাংলাদেশকে জানান, সাদিফ তাকে মৌখিক ও আচরণগত অসদাচরণের পাশাপাশি শারীরিকভাবেও আক্রমণ করেন, এমনকি একাধিকবার যৌন হয়রানির ইশারা-ইঙ্গিত করেন। এ ছাড়া বারবার অবাঞ্ছিত ফোন কলের মাধ্যমে তাকে ক্রমাগত বিরক্ত করেন। এ থেকে পরিত্রাণ পেতে তিনি চিফ অব ট্রেনিং ক্যাপেটন সাজ্জাদের কাছে অভিযোগ করার পরও কোনো প্রতিকার মেলেনি। উল্টো ক্যাপটেন সাজ্জাদ তাকে দোষারোপ করেন এবং তার ট্রেনিং নিয়ে জটিলতা তৈরি হবে বলে ভয় দেখান। এ বিষয়ে পাইলট সাদিফ হোসেনের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি পরিচয় পেয়ে প্রথমে ফোন কেটে দেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত বিমানের ২৮৫তম বোর্ড সভায় সিদ্ধান্ত হয় যে, ২৪ মাসে ধাপে ধাপে মোট ৪৮ জন ক্যাডেট পাইলট নিয়োগ দেওয়া হবে। অর্থাৎ, প্রতি ছয় মাসে ১২ জন করে চারটি ধাপে এই নিয়োগ সম্পন্নের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। সভার কার্যবিবরণী বোর্ডের চেয়ারম্যান স্বাক্ষর করে অনুমোদন দেন। এই সিদ্ধান্ত তৎকালীন চিফ অব প্ল্যানিং অ্যান্ড স্কেজিউলিং ক্যাপ্টেন শাহাদাত হোসেনের প্রস্তাবের ভিত্তিতে এবং ফ্লাইট অপারেশনস অধিপ্তরের মাধ্যমে উপস্থাপিত হয়। এটি একটি বাস্তবসম্মত ও কার্যকর সিদ্ধান্ত ছিল। কারণ এতে ধাপে ধাপে যোগ্য প্রার্থী বাছাই, প্রতিযোগিতামূলক নিয়োগ এবং প্রশিক্ষণ বিভাগের সক্ষমতার মধ্য থেকে দক্ষ পাইলট তৈরির সুযোগ নিশ্চিত করা হয়েছিল। নিয়োগ প্রক্রিয়াটি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল, যাতে যোগ্য প্রার্থীদের বাছাই করা যায় এবং যারা প্রথমবার নির্বাচিত হবেন না, তারা ভবিষ্যতে আবারও সুযোগ পেতে পারেন। পাশাপাশি প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলমান রেখে ধাপে ধাপে নতুন পাইলট প্রস্তুত করার পরিকল্পনা ছিল। তৎকালীন সিপিপিএস অনুযায়ী, একজন ক্যাডেট পাইলটকে সম্পূর্ণ প্রস্তুত করতে প্রায় এক বছর সময় লাগে।
ফলে একসঙ্গে বড় সংখ্যায় ক্যাডেট নিয়োগ দিয়ে তাৎক্ষণিক প্রয়োজন পূরণ করা সম্ভব নয়। কিন্তু পরবর্তীতে ক্যাপ্টেন ইশতিয়াক হোসেন চিফ অব প্ল্যানিং অ্যান্ড স্কেজিউলিং হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর বোর্ডের এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের উদ্যোগ নেন। সে সময় তার ছেলে সিপিএল অর্জন করেননি, ফলে তিনি নিয়োগ প্রক্রিয়া বিলম্বিত করতে আগ্রহী ছিলেন, যাতে তার ছেলে পরবর্তীতে অংশগ্রহণ করতে পারেন। তৎকালীন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় তিনি সাময়িকভাবে গারুদা ইন্দোনেশিয়া থেকে পাইলট নিয়োগ এবং পরবর্তীতে একসঙ্গে বড় সংখ্যায় ক্যাডেট পাইলট নিয়োগের প্রস্তাব দেন। মন্ত্রী তাকে এই প্রস্তাব বোর্ডে উপস্থাপন করে অনুমোদন নেওয়ার পরামর্শ দেন। এই প্রস্তাবের ফলে নিয়োগ প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়, ক্রুর সংকট তৈরি হয় এবং বিমানের অনেক ফ্লাইট বাতিল করতে হয়।
একই সঙ্গে বিদেশি পাইলট (গারুদা ইন্দোনেশিয়া থেকে) যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়া নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে, যেখানে স্থানীয় বাজারে বিশেষ করে বি-৭৩৭ পাইলটের প্রাপ্যতা থাকা সত্ত্বেও বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করা হয়েছে। তার ছেলে সিপিএল অর্জন করার পর একসঙ্গে বড় সংখ্যায় ক্যাডেট নিয়োগের জন্য চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল, যাতে অধিকাংশ প্রার্থীকে অন্তর্ভুক্ত করা যায়। এতে পেশাগত মান ক্ষুণœ হয়েছে এবং যোগ্য প্রার্থীরা বঞ্চিত হয়েছে। আগে তিনি নিজেই বলেছেন একজন ক্যাডেট পাইলটকে প্রস্তুত করতে প্রায় এক বছর সময় লাগে, কিন্তু পরবর্তীতে তিনি বোর্ডের ধাপে ধাপে ১২ জন করে নিয়োগের সিদ্ধান্তের বিপরীতে একসঙ্গে বড় সংখ্যায় নিয়োগের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন, যা তার নিজ বক্তব্যের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক।
উল্লেখ্য, ক্যডেট পাইলট সাদিফের মা অর্থাৎ, ক্যাপেটন শাহানা ২০০৪ সালে সিলেটে ফকার-২৮ বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় পাইলট ইন কমান্ড হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। একই ফ্লাইটে আব্দুল মুয়ীদ চৌধুরী, যিনি কিনা পরবর্তীতে বিমানের চেয়ারম্যান ছিলেন, তাকে দুর্ঘটনা-পরবর্তী উদ্ধার অভিযানে ককপিট থেকে পাওয়া যায়। পরবর্তীতে ক্যাপটেন ইশতিয়াক গত বছর বিমান চেয়ারম্যান মুইদ চৌধুরীর সহযোগিতায় ক্ষমতার অপব্যবহার করে স্বেচ্ছায় অবসরে চলে যাওয়া নিজ স্ত্রী ক্যাপ্টেন শাহানাকে বিমানে অন্তর্ভুক্ত করান। বিমান বিধ্বস্তের মতো স্পর্শকাতর ঘটনার পরও কীভাবে ক্যাপ্টেন শাহানা বিমানে নিয়োগ পেলেন, তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে। ক্যাপেটন ইশতিয়াক হোসেন ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের সময় শেখ হাসিনার বোন শেখ রেহানাকে লন্ডন থেকে দেশে আনতে বিমান নিয়ে মরিয়া হয়ে ওঠেন। ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট নিজের ফ্লাইট না থাকা সত্ত্বেও বদলি ফ্লাইটে নিজের ক্ষমতার (চিফ অব শিডিউলিং) অপব্যবহার করে শেষ মুহূর্তে নিজের নাম লন্ডন ফ্লাইটে অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে শেখ রেহানাকে দেশে নিয়ে আসেন আওয়ামীপন্থি এই ক্যাপ্টেন ইশতিয়াক হোসেন।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন