বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘদিনের প্রথাগত সহায়তানির্ভর সম্পর্ক থেকে সরে এসে বিনিয়োগ ও বাণিজ্যনির্ভর একটি শক্তিশালী কৌশলগত অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর একটি হোটেলে আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচ্যাম) আয়োজিত ‘অ্যাডভান্সিং ইউএস-বাংলাদেশ ইকোনমিক পার্টনারশিপ’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের নীতিসংলাপে এই নতুন রূপরেখার কথা উঠে আসে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্ক সুদৃঢ় করতে রপ্তানি বহুমুখীকরণ, বিশ্ববাজারে প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগ প্রবাহ জোরদারের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বাণিজ্য অংশীদার হলেও রপ্তানি খাতে এখনো তৈরি পোশাকের ওপর একমুখী নির্ভরতা বিদ্যমান, যা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ। এই ঝুঁকি কমাতে সরকার ওষুধশিল্প, চামড়া, কৃষিপণ্য, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং এবং দ্রুত বর্ধনশীল আইসিটি খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে রপ্তানি ভিত্তি সম্প্রসারণে কাজ করছে। বিশেষ করে ২০২৯ সালের নভেম্বরে এলডিসি থেকে বাংলাদেশের চূড়ান্ত উত্তরণ নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র এখন অতীতের ‘ব্যর্থ নীতি’ থেকে সরে এসে বাণিজ্য ও বিনিয়োগকেন্দ্রিক নতুন কৌশলে এগোচ্ছে। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, যুক্তরাষ্ট্র এখন সহায়তার বদলে প্রকৃত অংশীদারিত্বের ওপর জোর দিচ্ছে। সদ্য স্বাক্ষরিত পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি (এআরটি)-কে একটি রূপান্তরমূলক কাঠামো হিসেবে উল্লেখ করে তিনি জানান, এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশ ১৯ শতাংশ কম শুল্কে মার্কিন বাজারে প্রবেশাধিকার পাবে, যা অন্যথায় ৩৫ শতাংশ হতো। এর বিনিময়ে বাংলাদেশকে ৩.৫ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন কৃষিপণ্য আমদানির প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পাশাপাশি অশুল্ক বাধা কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে।
বিনিয়োগের পরিবেশ আরও উন্নত করতে রাষ্ট্রদূত কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের পরামর্শ দেন। তিনি চুক্তি বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা, নীতিনির্ধারণে স্থিতিশীলতা, স্বচ্ছতা এবং ব্যবসা পরিচালনায় আধুনিকায়নের ওপর জোর দেন। ক্রিস্টেনসেন উল্লেখ করেন, স্টারলিংক, গুগল পে এবং মাইক্রোসফটের মতো শীর্ষ মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী। এ ছাড়া ডিজিটাল লেনদেন সম্প্রসারণে ভিসা ও মাস্টারকার্ডের মতো প্রতিষ্ঠানের বড় সুযোগ রয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। প্রযুক্তির পাশাপাশি রেলপথ, বন্দর ও বেসামরিক বিমান চলাচল খাতের আধুনিকায়নেও যুক্তরাষ্ট্র সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতে প্রস্তুত।
বাণিজ্যমন্ত্রী তার বক্তব্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল রূপান্তরে যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদারিত্বের গুরুত্ব তুলে ধরেন এবং জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানান। সংলাপে স্বাগত বক্তব্য দেন অ্যামচ্যাম সভাপতি সৈয়দ এরশাদ আহমেদ। অনুষ্ঠানের শেষে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আগামী জুলাইয়ে আয়োজিত ‘আমেরিকা উইক’-এ অংশ নিতে বাংলাদেশের ব্যবসায়ী সমাজকে আমন্ত্রণ জানান মার্কিন রাষ্ট্রদূত। সব মিলিয়ে দুই দেশের প্রতিনিধিরাই একমত হন যে, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এখন এমন এক নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করছে যেখানে বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও যৌথ সমৃদ্ধিই হবে মূল লক্ষ্য।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন