দেশে এপ্রিল মাসে ৫২৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৫১০ জনের প্রাণহানি এবং ১২শর বেশি মানুষ আহত হয়েছেন বলে তথ্য এসেছে বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির দুর্ঘটনা মনিটরিং সেলের পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন। সড়কে নিহতদের মধ্যে ৯৯ জন বিভিন্ন যানের চালক, ৮২ জন পথচারী, ৫৬ জন শিক্ষার্থী, ৫২ জন নারী, ৪৭ জন শিশু এবং ২৫ জন পরিবহন শ্রমিক রয়েছেন।
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ পর্যালোচনা করে যাত্রীকল্যাণ সমিতি এই প্রতিবেদন তৈরি করেছে। বাস্তবে নিহতের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে মনে করছে সংগঠনটি। গতকাল বুধবার সমিতির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে পরিবহন খাতের পরিচালনা পদ্ধতি ‘আপাদমস্তক’ সংস্কারের দাবি জানান সংগঠনের মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এপ্রিলে সড়ক, রেল ও নৌপথ মিলিয়ে এপ্রিলে মোট ৫৮৬টি দুর্ঘটনায় মোট ৫৬৩ জন নিহত এবং ১ হাজার ২৭৯ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে শুধু সড়কে প্রাণ গেছে ৫১০ জনের, আহত হয়েছেন ১২৬৮ জন।
বিবৃতিতে মোজাম্মেল হক বলেন, আমলাতন্ত্রের পরিবর্তে দেশি-বিদেশি পরিবহন বিশেষজ্ঞদের নিয়ন্ত্রণে পরিবহন খাত পরিচালনা করা গেলে সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, যাতায়াতের দুর্ভোগ নিরসন এবং প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুর মিছিল থামানো সক্ষম হবে। সরকারকে পুরোনো পরিবহন পরিচালনা পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে আসারও আহ্বান জানান তিনি।
যাত্রীকল্যাণ সমিতির তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিলে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রাম বিভাগে। সেখানে ১৩৫টি দুর্ঘটনায় ১৩৭ জন নিহত এবং ২৬৩ জন আহত হয়েছেন। সবচেয়ে কম দুর্ঘেটনা ময়মনসিংহ বিভাগে। সেখানে ১৭টি দুর্ঘটনায় ১৮ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। এ মাসে ১৩৯টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৪২ জন নিহত এবং ১২৪ জন আহত হয়েছেন, যা মোট সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ২৭.৮৪ শতাংশ।
সড়কে নিহতদের মধ্যে ৯৯ জন বিভিন্ন বাহনের চালক, ৮২ জন পথচারী, ৫৬ জন শিক্ষার্থী, ৫২ জন নারী, ৪৭ জন শিশু এবং ২৫ জন পরিবহন শ্রমিক রয়েছেন। এ ছাড়া চিকিৎসক, শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী, রাজনৈতিক নেতাকর্মী এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন।
প্রতিবেদনে দুর্ঘটনাকবলিত ৮০৫টি যানবাহনের পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ২৬.৪৫ শতাংশ ট্রাক-পিকআপ-কাভার্ড ভ্যান ও লরি, ২১.৮৬ শতাংশ মোটরসাইকেল এবং ১৫.২৭ শতাংশ ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক। এ ছাড়া ১৪.২৮ শতাংশ বাস এবং ৬.৯৫ শতাংশ সিএনজিচালিত অটোরিকশা দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে।
দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত মাসে সংঘটিত মোট দুর্ঘটনার ৪১.১৭ শতাংশই ছিল মুখোমুখি সংঘর্ষ। এ ছাড়া ২৮.০৮ শতাংশ পথচারীকে গাড়িচাপা বা ধাক্কা দেওয়ার ঘটনা এবং ২৩.৭১ শতাংশ যান নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ার ঘটনা ঘটেছে। মোট দুর্ঘটনার ৩৮.৫১ শতাংশ জাতীয় মহাসড়কে, ৩১.৪৯ শতাংশ আঞ্চলিক মহাসড়কে এবং ২২.৯৬ শতাংশ ফিডার রোডে সংঘটিত হয়েছে। সারা দেশে সংঘটিত মোট দুর্ঘটনার ৫.৬৯ শতাংশ ঢাকা মহানগরীতে, ০.৭৫ শতাংশ চট্টগ্রাম মহানগরীতে ও ০.৫৬ শতাংশ রেলক্রসিংয়ে সংঘটিত হয়েছে।
সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছে যাত্রীকল্যাণ সমিতি। এর মধ্যে রয়েছেÑ মহাসড়কে মোটরসাইকেল, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অটোরিকশার অবাধ চলাচল, রোড সাইন ও ডিভাইডার না থাকা, মহাসড়কের নির্মাণ ত্রুটি, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অদক্ষ চালক এবং বেপরোয়া গতি। এ ছাড়া সড়কে চাঁদাবাজি ও চালকের অতিরিক্ত কর্মঘণ্টাকেও দায়ী করা হয়েছে।
দুর্ঘটনা প্রতিরোধে বিভিন্ন সুপারিশ করেছে সংগঠনটি : সড়কে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং ভাড়া আদায়ে স্মার্ট পদ্ধতি চালু। মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত রিকশার আমদানি ও নিবন্ধন বন্ধ করা। দক্ষ চালক তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ এবং ডিজিটাল পদ্ধতিতে গাড়ির ফিটনেস প্রদান। পরিবহন খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করে মালিক সমিতির একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ বন্ধ করা। চালকদের বেতন ও কর্মঘণ্টা সুনিশ্চিত করা এবং সড়কে চাঁদাবাজি বন্ধ করা। বিআরটিএ-এর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সড়ক পরিবহন। মন্ত্রণালয়ে ‘সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইউনিট’ চালু করা।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন