ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের জনবল ও অবকাঠামো বাড়ানোর পাশাপাশি বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। গতকাল মঙ্গলবার পূর্বাচলে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স সপ্তাহ উপলক্ষে আয়েজিত অনুষ্ঠানে তিনি বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা বলেন। তিনি বলেন, সক্ষমতা ও সামর্থ্য বাড়াতে এরই মধ্যে ২০টি ফায়ার স্টেশন নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণের প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ চলমান। অ্যাম্বুলেন্স-সেবা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ১০০টি অ্যাম্বুলেন্স সংগ্রহের কাজও চলছে।
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর পূর্বাচল মাল্টিপারপাস ট্রেনিং গ্রাউন্ডে আয়োজিত ‘ফায়ার সার্ভিস সপ্তাহ, পদক বিতরণ ও পাসিং আউট প্যারেড’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, অতি সম্প্রতি ডুবুরিদের সক্ষমতা বাড়াতে ৭২টি পদ সৃজনের প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সারা দেশে ৫৩৮টি ফায়ার স্টেশনের মাধ্যমে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স সেবা প্রদান করে যাচ্ছে, যা চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট নয়। সেজন্য জনগুরুত্ব বিবেচনায় ২০টি ফায়ার স্টেশন নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণের প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ চলমান রয়েছে। অ্যাম্বুলেন্স সেবা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ১০০টি অ্যাম্বুলেন্স সংগ্রহের কাজও চলমান। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স একটি সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, গতি, সেবা ও ত্যাগের মন্ত্রে উজ্জীবিত এই বাহিনীর প্রতিটি সদস্য যেকোনো দুর্যোগ-দুর্ঘটনা ও সংকটময় মুহূর্তে সাধারণ জনগণের জান-মাল রক্ষায় নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষের কাছে তারা এখন নির্ভরতার প্রতীক হিসেবে নিজেদের তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন। বিভিন্ন অগ্নি দুর্ঘটনাসহ যেকোনো দুর্যোগে তাদের পেশাদারি মনোভাব, সাহস, ত্যাগ ও সেবামূলক কার্যক্রম জাতির আস্থা অর্জন করেছে। সব দুর্যোগে বিপদে পড়া মানুষের পাশে প্রথম ছুটে যাওয়া ‘স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্ত’ এই প্রতিষ্ঠান আমাদের কাছে একটি গর্বের বাহিনী হিসেবে স্বীকৃত।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, জনবল নিয়োগ সম্পন্ন হলে নৌযান দুর্ঘটনা মোকাবিলায় এ বাহিনীর সেবা সক্ষমতা বাড়বে। এ ছাড়া এই বাহিনীর ফায়ার স্টেশনের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী সদস্যসংখ্যা ৩০ হাজারের বেশি করার জন্য ফায়ার সার্ভিসের অর্গানোগ্রাম পুনর্গঠনের প্রস্তাবও বিবেচনাধীন। এ ছাড়া প্রশিক্ষণের মান উন্নয়নের জন্য মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স একাডেমি স্থাপনের জন্যও আমরা কার্যক্রম গ্রহণ করেছি। আমাদের নির্বাচনি ইশতেহারের আলোকে এরই মধ্যে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের সেবা সহজীকরণ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতকরণে অনলাইনভিত্তিক ই-ফায়ার লাইসেন্স প্রদানের কার্যক্রম গত ১ মে থেকে চালু করা হয়েছে। আমরা আশা করি, পরিকল্পনা অনুযায়ী বাস্তবায়ন সম্ভব হলে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সক্ষমতা বহুগুণ বাড়বে।
তিনি বলেন, জনগুরুত্বপূর্ণ এই প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর বিষয়েও বর্তমান সরকার সচেষ্ট রয়েছে। এ বাহিনীর সদস্যদের অন্যান্য বাহিনী ও সরকারি দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে আপগ্রেডেশন সংক্রান্ত বেশ কিছু প্রস্তাব বিবেচনাধীন। এই বাহিনীর সদস্যদের আবাসনের সমস্যা দূরীকরণে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য ঢাকার মিরপুর ও সদরঘাটে দুটি বহুতল আবাসিক ভবন নির্মাণের প্রকল্প বাস্তবায়ন পর্যায়ে রয়েছে। মিরপুরে তাদের সদর দপ্তর ভবন নির্মাণের কাজও চলমান। এ ছাড়া বাহিনীর সদস্যদের বিশেষ ভাতা হিসেবে ‘ফায়ার অ্যান্ড রেসকিউ ভাতা’ এবং ফ্রেশ মানির বিষয়ে চাহিদা রয়েছে। তা আমরা পর্যালোচনা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখব। এর মাধ্যমে ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ হবে বলে মনে করি। ফায়ার সার্ভিসের আবাসন সমস্যা দূর করতে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য ঢাকার মিরপুর ও সদরঘাটে দুটি বহুতল আবাসিক ভবন নির্মাণ প্রকল্প এবং মিরপুরে সদর দপ্তর ভবন নির্মাণের কাজ চলার তথ্য দেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ আরও বলেন, অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধারকাজে অংশ নিয়ে বিভিন্ন সময় এই প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা আত্মাহুতি দিয়েছেন, জীবন উৎসর্গ করেছেন। সর্বশেষ টঙ্গীর কেমিক্যাল অগ্নি দুর্ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের তিনজন কর্মী জীবন উৎসর্গ করেছেন। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সদস্যরা ২০২৫ সালে ২৭ হাজার ৫৯টি অগ্নিনির্বাপণ করে ৩ হাজার ২৬৩ কোটি টাকার সম্পদ উদ্ধার করেছে; ৭ হাজার ৮১৫টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯ হাজার ২৬৬ জন আহত ও ১ হাজার ৩৮ জন নিহত উদ্ধার করেছে; অ্যাম্বুলেন্সে রোগী পরিবহন করেছে ১০ হাজার। ৪৮০ জন; সচেতনতা বাড়াতে ১৪ হাজার ৯৮৭টি গণসংযোগ, ২ হাজার ৭৮টি ভবন সার্ভে, ১০ হাজার ৫৩৩টি ভবন পরিদর্শন করেছে; নতুন কমিউনিটি ভলান্টিয়ার তৈরি করেছে ১০৩৯ জনকে এবং ২ লাখ ৫৬ হাজার ১৬৫ জনকে অগ্নিনিরাপত্তাবিষয়ক প্রশিক্ষণ প্রদান করেছে; যা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এছাড়া ২০২৫ সালে অপারেশনাল দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এ বাহিনীর তিনজন সদস্য নিহত এবং ২৭ জন আহত হয়েছেন। তাদের এই বহুমাত্রিক বীরত্বপূর্ণ কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আজকের অনুষ্ঠানে পদক প্রদান করা হয়েছে, যারা পদক পেয়েছেন, আমি তাদের আন্তরিক অভিনন্দন জানাচ্ছি। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপু, বিশেষ অতিথি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল। মন্ত্রী বীরত্বপূর্ণ কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ৮৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হাতে পদক তুলে দেন। পদকপ্রাপ্তদের মধ্যে ২০২৩ সালের ৩৪ জন এবং ২০২৪ সালের ৫০ জন রয়েছেন।

