ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদের মাধ্যমে চাকরি পাওয়ার অভিযোগে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম ত্রিমুখী তদন্তের মুখে পড়েছেন। তার পিতা মোশাররফ হোসেনকে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে উল্লেখ করে লিখিত অভিযোগ দায়ের হওয়ার পর বেবিচক, গোয়েন্দা সংস্থা এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) পৃথকভাবে তদন্ত শুরু করেছে।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, চাকরির সময় শরিফুল ইসলামের জমা দেওয়া তার পিতা মোশাররফ হোসেনের মুক্তিযোদ্ধা সনদের যাচাই-বাছাই প্রায় শেষ পর্যায়ে। ইতোমধ্যে সেখানে কিছু অসঙ্গতির তথ্যও পাওয়া গেছে। পাশাপাশি গোপালগঞ্জ জেলার গেজেটভুক্ত ৬৪০ জন মুক্তিযোদ্ধার তালিকায়ও তার পিতার নাম পাওয়া যায়নি।
কর্মকর্তাদের ভাষ্য, শিগগিরই এ সংক্রান্ত তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।
বেবিচকের সদস্য (প্রশাসন) ও অতিরিক্ত সচিব এস এম লাবলুর রহমান বলেন, “গুরুতর এ অভিযোগটি আমরা খতিয়ে দেখছি। তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”
জানা যায়, সম্প্রতি ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ ব্যবহার করে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি নেওয়ার অভিযোগ ওঠে শরিফুল ইসলামের বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে অনিয়ম ও আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে পদোন্নতি লাভের অভিযোগও আনা হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়ে বেবিচক চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত আবেদন করা হয়।
এ ছাড়া বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) পৃথক অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছে। গুরুতর এ অভিযোগের পর বেবিচক নড়েচড়ে বসে। সংস্থাটির নিজস্ব তদন্তের পাশাপাশি দুদক ও গোয়েন্দা সংস্থাও তদন্ত কার্যক্রম শুরু করে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, মো. শরিফুল ইসলাম ২০০১ সালের ২৪ জানুয়ারি বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষে চাকরিতে যোগদান করেন। বর্তমানে তিনি সদর দপ্তরে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সিভিল) হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। তার পিতা মো. মোশাররফ হোসেনের মুক্তিযোদ্ধা সনদের ভিত্তিতে তিনি মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি পেয়েছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। তবে অভিযোগকারীদের দাবি, তার পিতা ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা এবং জালিয়াতির মাধ্যমে তিনি চাকরি লাভ করেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানান, শরিফুল ইসলামের সরবরাহ করা তার পিতা মোশাররফ হোসেনের নামে ১৯৯৯ সালের ২৬ অক্টোবর ইস্যুকৃত একটি মুক্তিযোদ্ধা সনদে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের চেয়ারম্যান আহাদ চৌধুরীর স্বাক্ষর রয়েছে। কিন্তু ওই সনদে প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষর থাকার বিষয়টি নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। তাদের মতে, এ ধরনের সনদে প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষর থাকা অস্বাভাবিক, যা সনদের সত্যতা নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি করেছে।
এ ছাড়া বর্তমানে প্রকাশিত গোপালগঞ্জ জেলার গেজেটভুক্ত ৬৪০ জন মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় মো. মোশাররফ হোসেন, পিতা মৃত মো. লোকমান মোল্লার নাম পাওয়া যায়নি। ফলে সংশ্লিষ্ট সনদের বৈধতা ও সত্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, “বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। তাই আমরা আরও বিস্তারিত তদন্ত করছি। সব প্রক্রিয়া শেষ করে খুব শিগগিরই তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।”
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধু চাকরি নয়, পদোন্নতি নিয়েও শরিফুল ইসলামের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগে বলা হয়, গোয়েন্দা সংস্থার আপত্তি থাকা সত্ত্বেও ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ ঘরানার কর্মকর্তা হয়েও তিনি পদোন্নতি লাভ করেন। একই সঙ্গে আর্থিক লেনদেন ও প্রশাসনিক অনিয়মের মাধ্যমে নির্বাহী প্রকৌশলী পদ থেকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে উন্নীত হয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে প্রকৌশলী শরিফুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

