ঈদের ছুটিতে বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির সিলেটে এসে এই অঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত রূপান্তরের এক যুগান্তকারী মহাপরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। সিলেটের আইটি খাত, শিল্পায়ন ও প্রবাসী বিনিয়োগের পাশাপাশি সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, ভারত-বাংলাদেশ বিমান যোগাযোগ এবং অভ্যন্তরীণ সড়ক নেটওয়ার্ক নিয়ে সরকারের সুদূরপ্রসারী রোডম্যাপের কথা জানান তিনি।
সিলেট-১ আসন থেকে নির্বাচিত এই মন্ত্রী ও সরকারের নীতিনির্ধারক স্পষ্ট করেন, প্রথাগত উন্নয়নের বাইরে গিয়ে সিলেটকে একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক ‘হাব’ হিসেবে গড়ে তোলাই সরকারের মূল লক্ষ্য। সিলেটের একাধিক সুধী সমাবেশ ও মতবিনিময় সভায় মন্ত্রী সরকারের এসব প্রধান প্রধান পরিকল্পনার কথা জানান।
খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির জানান, সিলেটের দীর্ঘদিনের দাবি ও প্রবাসীদের যাতায়াত সহজ করতে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানের মেগা এয়ারপোর্টে রূপান্তর করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। মন্ত্রী জানান, বিমানবন্দরের চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলো দ্রুত শেষ করার পাশাপাশি কার্গো স্টেশন ও রানওয়ের আধুনিকায়ন করা হবে। ফলে সিলেট থেকে সরাসরি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আরও বেশি ফ্লাইট পরিচালনা করা সম্ভব হবে, যা প্রবাসী ও ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি দূর করবে।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর (সেভেন সিস্টার্স) সঙ্গে বাণিজ্য ও পর্যটন সম্পর্ক জোরদারে সিলেট-গোয়াহাটি বিমান রুট চালুর বিশেষ পরিকল্পনার কথা জানান বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, আসামের রাজধানী গোয়াহাটির সঙ্গে সিলেটের এই সরাসরি বিমান যোগাযোগ চালু হলে দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। বিশেষ করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ব্যবসায়ীরা সিলেটকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করতে পারবেন এবং সিলেটের পর্যটনশিল্পে এক বিশাল জোয়ার আসবে।
এ ছাড়া সিলেট নগরীর ট্রাফিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন এবং যানজট নিরসনে একটি মেগা সড়ক প্রকল্পের ঘোষণা দিয়েছেন খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি জানান, নগরীর ভেতরে ভারী যানবাহনের চাপ কমাতে এবং যাতায়াত সহজ করতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সাহেব বাজার থেকে টিলাগড় পর্যন্ত একটি আধুনিক বাইপাস সড়ক নির্মাণ করা হবে। এই বাইপাস সড়ক চালু হলে সিলেট শহরের পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক বড় ধরনের বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। গত রোববার সিলেট সদর উপজেলা পরিষদ অডিটোরিয়ামে সিলেট সদর উপজেলা প্রশাসন ও সর্বস্তরের জনগণের পক্ষ থেকে আয়োজিত এক সুধী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন বাণিজ্যমন্ত্রী। এই অনুষ্ঠানে তিনি মূলত সিলেটের অভ্যন্তরীণ অবকাঠামো, কর্মসংস্থান এবং আইটি খাতের উন্নয়ন নিয়ে কথা বলেন।
এই অনুষ্ঠানে তরুণ প্রজন্মকে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার উপযোগী করে তুলতে সিলেটে একটি আন্তর্জাতিক মানের এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সেন্টার প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন মন্ত্রী। তিনি জানান, সিলেটের আইটি পার্কের পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার নিশ্চিত করে এই সেন্টারের মাধ্যমে স্থানীয় যুবসমাজকে গ্লোবাল টেকনোলজি মার্কেটের জন্য দক্ষ করে তোলা হবে। মন্ত্রী তার নির্বাচনি ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, সিলেটের প্রধান সমস্যাগুলোর একটি হলো তরুণদের কর্মসংস্থানের অভাব। স্থানীয় শিল্পকারখানাগুলোর আধুনিকায়ন এবং নতুন নতুন এসএমই ও ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আগামী কয়েক বছরে সিলেটে লাখো তরুণের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার।
সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি কনফারেন্স হলে গতকাল সোমবার সকালে সিলেটের ব্যবসায়ী ও প্রবাসীদের শীর্ষ সংগঠন সিলেট চেম্বার অব কমার্সের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় মিলিত হন বাণিজ্যমন্ত্রী। এই সভায় তিনি সিলেটের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিমান রুট এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির ওপর জোর দিয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দেন।
বাণিজ্যমন্ত্রী প্রবাসীদের সিলেটে নিরাপদ ও লাভজনক বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়ে বলেন, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সব ধরনের প্রশাসনিক আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বা ‘লাল ফিতার দৌরাত্ম্য’ শতভাগ দূর করা হবে। প্রবাসীরা যাতে কোনো ধরনের হয়রানি ছাড়া দ্রুত ব্যবসা বা শিল্পপ্রতিষ্ঠান শুরু করতে পারেন, সে জন্য বিশেষ ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ ও নীতি-সহায়তা দেবে সরকার। খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির জোর দিয়ে বলেন, রাজনৈতিক সংস্কৃতির গুণগত পরিবর্তন এবং প্রশাসনে স্বচ্ছতা আনা সরকারের অন্যতম মূল লক্ষ্য। দল-মত নির্বিশেষে সিলেটের সর্বস্তরের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে একটি সুখী, সমৃদ্ধ এবং চাঁদাবাজি ও দুর্নীতিমুক্ত জবাবদিহিমূলক সিলেট গড়ে তোলা হবে।
বাণিজ্যমন্ত্রীর যুগোপযোগী, বৃহৎ এবং সুদূরপ্রসারী অবকাঠামোগত পরিকল্পনাগুলোকে স্বাগত জানিয়েছেন সিলেটের ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ও সুধী সমাজ। তারা মনে করছেন, এই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে সিলেট একটি অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন