একসময় ছিল জনবসতিপূর্ণ একটি সমৃদ্ধ গ্রাম। বিস্তীর্ণ কৃষিজমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বসতবাড়ি ও স্বাভাবিক গ্রামীণ জীবনযাত্রায় মুখর ছিল চারপাশ। কিন্তু বিষখালী নদীর অব্যাহত ভাঙনে সেই চিত্র এখন শুধুই স্মৃতি। ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার রানাপাশা ইউনিয়নের চর ইসলামাবাদ গ্রামের একটি বড় অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে বর্তমানে বিচ্ছিন্ন এক দ্বীপে পরিণত হয়েছে। নদীর বুকে টিকে থাকা এই জনপদ এখন অস্তিত্ব সংকটে। প্রতিনিয়ত নদীভাঙনের আতঙ্কে দিন কাটছে বাসিন্দাদের।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৬ সালের ভয়াবহ নদীভাঙনে ইসলামাবাদ গ্রামের একটি অংশ মূল ভূখ- থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরপর থেকেই চারদিকে বিষখালী নদীর পানি বেষ্টিত অবস্থায় রয়েছে এলাকাটি। বর্তমানে নৌকা ও ট্রলারই দ্বীপবাসীর একমাত্র যাতায়াতের মাধ্যম। জরুরি প্রয়োজনে উপজেলা সদর কিংবা জেলা শহরে যেতে হলে তাদের নদীপথের ওপরই নির্ভর করতে হয়।
একসময় এলাকাটিতে শত শত একর আবাদি জমি ছিল। কিন্তু বছরের পর বছর নদীভাঙনে সেই জমি বিলীন হয়ে গেছে। অনেক পরিবার একাধিকবার ভাঙনের শিকার হয়ে বসতভিটা হারিয়েছে। কেউ এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেলেও অনেকে এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাস করছেন।
বর্তমানে দ্বীপ গ্রামটিতে প্রায় ৫৪টি পরিবার ও প্রায় ৫২০ জন মানুষ বসবাস করছে। উত্তর-দক্ষিণে দুই কিলোমিটারের বেশি এবং পূর্ব-পশ্চিমে প্রায় এক কিলোমিটার বিস্তৃত এই দ্বীপের আয়তনও প্রতি বছর কমে আসছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে অদূর ভবিষ্যতে পুরো জনপদই নদীগর্ভে হারিয়ে যাবে।
চর ইসলামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. কাইউম বাদশাহ বলেন, ‘একসময় বিদ্যালয়ে শতাধিক শিক্ষার্থী ছিল। এখন সেই সংখ্যা নেমে এসেছে ৪০ জনে। শিক্ষকও রয়েছে মাত্র দুজন। নদীভাঙনের কারণে অনেক পরিবার এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে গেছে।’ তিনি আরও বলেন, দ্বীপের উত্তর অংশে নদীভাঙনের মাত্রা সবচেয়ে বেশি। অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে ভাঙন আরও তীব্র হচ্ছে। তার অভিযোগ, নদীতে ১৫ থেকে ২০টি ড্রেজারের মাধ্যমে নিয়মিত বালু উত্তোলন করা হয়, যার নেতিবাচক প্রভাব তীরবর্তী এলাকায় পড়ছে।
শুধু শিক্ষা নয়, স্বাস্থ্যসেবাও দ্বীপবাসীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এলাকায় কোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্র নেই। অসুস্থ রোগীকে নৌকায় করে মূল ভূখ-ে নিতে হয়। বর্ষাকাল কিংবা বৈরী আবহাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে।
স্থানীয় বাসিন্দা আবদুস ছালাম বলেন, ‘আমরা সবসময় ভাঙনের ভয় নিয়ে থাকি। কখন যে ঘরবাড়ি নদীতে চলে যায়, সেই আতঙ্কে রাত কাটাতে হয়। বহু মানুষ এলাকা ছেড়ে চলে গেছে। যারা আছি, তারাও জানি না কতদিন টিকে থাকতে পারব।’
রানাপাশা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য খলিলুর রহমান বলেন, ‘নদীভাঙনে এ এলাকার মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। একসময় যাদের অনেক জমিজমা ছিল, এখন তাদের অনেকেই ভূমিহীন হয়ে পড়েছেন। বারবার ভাঙনরোধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানালেও কার্যকর উদ্যোগ দেখতে পাইনি।’
অভিভাবক বেলায়েত হোসেন বলেন, ‘যোগাযোগ সমস্যা, শিক্ষক সংকট ও জনসংখ্যা কমে যাওয়ার কারণে শিক্ষাব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ভাঙন বন্ধ না হলে বিদ্যালয়টিও ঝুঁকির মুখে পড়বে।’ স্থানীয় বাসিন্দা আবুল কালাম মোল্লা বলেন, ‘বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্যসেবা ও যোগাযোগÑ সব ক্ষেত্রেই আমরা পিছিয়ে আছি। ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের সময় দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়। আমরা চাই দ্রুত ভাঙনরোধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।’
স্থানীয়দের অভিযোগ, নদীর তলদেশ থেকে অপরিকল্পিত ও অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে ভাঙনের গতি বেড়েছে। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ পরিবর্তিত হওয়ায় তীরবর্তী এলাকায় স্রোতের চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং প্রতি বছর নতুন নতুন এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে।
সরকারি নলছিটি ডিগ্রি কলেজের অবসরপ্রাপ্ত সহযোগী অধ্যাপক সামছুল আলম খান বাহার বলেন, ‘বিষখালী নদীর ভাঙনে ইসলামাবাদের মানুষ বছরের পর বছর দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। দ্রুত ভাঙনরোধে ব্যবস্থা না নিলে একদিন পুরো এলাকাই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে। মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষায় সরকারকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, দক্ষিণাঞ্চলের নদীভাঙন শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, অনেক ক্ষেত্রে মানবসৃষ্ট কারণও এর জন্য দায়ী। অবৈধ বালু উত্তোলন, নদীর নাব্য পরিবর্তন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং দীর্ঘমেয়াদি নদী ব্যবস্থাপনার অভাব ভাঙনের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে।
নলছিটি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) রিজভী আহমেদ সবুজ বলেন, ‘বিষয়টি আমাদের নজরে রয়েছে। নদীভাঙন রোধ এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’ তবে এ বিষয়ে ঝালকাঠি পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী এ কে এম নিলয় পাশা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
স্থানীয়দের মতে, আশ্বাস নয়, এখন প্রয়োজন দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ। কারণ প্রতি বর্ষা মৌসুম তাদের জন্য নতুন আতঙ্ক নিয়ে আসে। নদীভাঙন শুধু তাদের জমি ও ঘরবাড়িই কেড়ে নিচ্ছে না, কেড়ে নিচ্ছে ভবিষ্যতের স্বপ্নও।
নদীভাঙনে সৃষ্ট চর ইসলামাবাদের এই দ্বীপ আজ এক কঠিন বাস্তবতার প্রতীক। দেশের উন্নয়নের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে শত শত মানুষ এখনো মৌলিক নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। ভাঙনরোধে কার্যকর ব্যবস্থা, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ এবং টেকসই নদী ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা না গেলে খুব শিগগিরই মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে পারে চর ইসলামাবাদের শেষ অস্তিত্বটুকুও।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন