দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোল কাস্টম হাউসে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১১ হাজার ২৯০ কোটি টাকা। তবে অর্থবছর শেষে আদায় হয়েছে মাত্র ৬ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা। ফলে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা, যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৪২ শতাংশ।
এদিকে আগের অর্থবছরের তুলনায় রাজস্ব আদায় কমেছে প্রায় ৪৭০ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৬ হাজার ৭০৫ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছিল ৭ হাজার ২১ কোটি ৫১ লাখ টাকা।
কাস্টমস কর্তৃপক্ষ রাজস্ব ঘাটতির জন্য আমদানি কমে যাওয়া, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ধীরগতি এবং শুল্ক কাঠামোর পরিবর্তনকে দায়ী করছে। তবে বন্দরসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন মহলের অভিযোগ, মিথ্যা পণ্য ঘোষণা, ডিজিটাল ওজনযন্ত্রে কারসাজি, উচ্চ শুল্কের পণ্য কম শুল্কে খালাস, শেড থেকে পণ্য আত্মসাৎ এবং ভুয়া এন্ট্রি পাস ব্যবহার করে সংঘবদ্ধভাবে শুল্ক ফাঁকির কারণেই সরকারের বিপুল রাজস্ব হারাতে হয়েছে।
কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, প্রথমে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৮ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। পরে তা বাড়িয়ে ১১ হাজার ২৯০ কোটি টাকা করা হয়। কিন্তু বছর শেষে আদায় হয় ৬ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা। একই সময়ে বন্দর দিয়ে ১৪ লাখ ২ হাজার ১৪৪ মেট্রিক টন পণ্য আমদানি হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১ লাখ ৯৭ হাজার মেট্রিক টন কম।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব অনেকটাই কমে এলেও এত বড় রাজস্ব ঘাটতি নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ চক্র ডিজিটাল ওজনযন্ত্রে কারসাজি, পণ্যের ভুল শ্রেণিবিন্যাস এবং মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আসছে। এতে সরকার যেমন বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে, তেমনি অসাধু চক্র অবৈধভাবে বিপুল অর্থের মালিক হচ্ছে। শুধু গত এক মাসেই মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে আমদানি করা প্রায় ১৫ কোটি টাকার বিভিন্ন পণ্যের চালান জব্দ করেছে কাস্টমস।
সাম্প্রতিক সময়ে একই ভারতীয় খালি ট্রাকের দুই ধরনের ওজন রেকর্ড, বেকিং পাউডারের ঘোষণার আড়ালে কোটি টাকার শাড়ি ও থ্রি-পিস আত্মসাৎ, ইরেজার ও পেনসিল ঘোষণার আড়ালে উচ্চ শুল্কের পণ্য জব্দ এবং কেমিক্যাল জোন থেকে পণ্য সরিয়ে নেওয়ার মতো একাধিক ঘটনা সামনে এসেছে। এসব ঘটনায় কাস্টমস ও বন্দর কর্তৃপক্ষ পৃথক তদন্ত শুরু করেছে।
শুল্ক ফাঁকি, পণ্য পাচার ও সরকারি মালামাল আত্মসাতের অভিযোগে সম্প্রতি কাস্টমস ও বন্দর কর্তৃপক্ষ পৃথক চারটি মামলা করেছে। মামলাগুলোতে কাস্টমস কর্মকর্তা, বন্দর কর্মকর্তা, আনসার সদস্য, নিরাপত্তাকর্মী ও ট্রাকচালকসহ মোট ৫৩ জনকে আসামি করা হয়েছে। এরই মধ্যে কয়েকজন কাস্টমস কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া বিজিবির এক অভিযানে সরকারি নিলাম করা পণ্য কাস্টমসের নিজস্ব গুদাম থেকে পাচারের সময় কাস্টমসের এক সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তাসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। যদিও মামলার অন্য আসামিদের এখনো গ্রেপ্তার করা যায়নি।
সম্প্রতি কাস্টমসের এক দাপ্তরিক চিঠিতে বন্দরের একটি ডিজিটাল ওজনযন্ত্রে একই ভারতীয় খালি ট্রাকের জন্য একই সময়ে দুই ধরনের ওজন দেখানোর তথ্য উঠে আসে। এ ঘটনায় বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট চালান জব্দ করে তদন্ত শুরু করেছে কাস্টম।
অনিয়মে জড়িত থাকার অভিযোগে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট হুদা ইন্টারন্যাশনাল, লিংক ইন্টারন্যাশনাল, করিম অ্যান্ড সন্স, এমি এন্টারপ্রাইজ এবং আলতাফ অ্যান্ড সন্সের লাইসেন্স সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে।
বেনাপোল ল্যান্ডপোর্ট ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান বলেন, বন্দরের শেডের ভেতরে পণ্য আত্মসাৎ বা শুল্ক ফাঁকির ঘটনা ঘটলে দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্টদের ভূমিকাও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা জরুরি। প্রকৃত দায়ীদের চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হলে ব্যবসায়ীদের আস্থা বাড়বে এবং স্বচ্ছ বাণিজ্য পরিবেশ নিশ্চিত হবে।
বেনাপোল স্থলবন্দরের পরিচালক (ট্রাফিক) শামীম হোসেন বলেন, কাস্টমসের অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ওজনযন্ত্রের তথ্য, নথিপত্র ও সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অনিয়মের প্রমাণ মিললে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বেনাপোল কাস্টম হাউসের কমিশনার মো. ফাইজুর রহমান বলেন, রাজস্ব ফাঁকি রোধে কাস্টম সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছে। ওজনযন্ত্রে কারসাজি, মিথ্যা ঘোষণা কিংবা শুল্ক ফাঁকির সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক, তদন্তে অভিযোগের সত্যতা মিললে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।

