মানব পাচারকারী চক্রের সদস্য এস এম রহমান তনু নামের রিক্রুটিং এজেন্সির এক ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তিনি চাকরির আশ^াসে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর কথা বলে ১ হাজার ৩৮৪ ব্যক্তির কাছ থেকে ১৬ কোটি টাকারও বেশি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পর আত্মগোপনে চলে যান। গতকাল বুধবার ভোরে মানব পাচার এবং অর্থ আত্মসাতের একাধিক মামলায় তাকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর আল জমজম ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড নামে রিক্রটিং এজেন্সির এমডি তনুকে আদালতে হাজির করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দুদিনের রিমান্ড হেফাজতে নেয় পুলিশ।
পুলিশ জানিয়েছে, এসএম রহমান তনুর নামে ৮ থেকে ১০টি মামলা রয়েছে। দীর্ঘদিন মালয়েশিয়ায় পালিয়ে থাকার পর গতকাল ভোরে সে মালয়েশিয়া থেকে বাংলাদেশে আসে। গোপন তথ্যে বিমানবন্দর থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃত তনু কয়েক হাজার ব্যক্তিকে মালয়েশিয়ায় বিভিন্ন কাজের ভিসা দেওয়ার কথা বলে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে। এর মধ্যে কিছু লোককে মালয়েশিয়া পাঠালেও তাদের কাজ দিতে পারেনি। তাদের অধিকাংশ জেল খেটে দেশে ফিরেছে। অন্যদিকে দেশে থাকা যেসব ব্যক্তিকে পাঠানোর কথা ছিল তাদের কেউ আর মালয়েশিয়ায় যেতে পারেনি। এর মধ্যে এমন লোকও আছে যারা ঋণ নিয়ে অথবা জমি, ভিটে বিক্রি করে টাকা দিয়েছেন।
পুলিশ জানায়, জিএমজি ট্রেডিং নামে একটি রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক গোলাম মাওলার প্রতিষ্ঠান এসএম তনুর প্রতিষ্ঠান জমজম ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় লোক পাঠানোর জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়। গোলাম মাওলা ১ হাজার ৩৩৮ জনের বিপরীতে এসএম তনুকে বিভিন্নভাবে ১৬ কোটি ৪৯ লাখ টাকা দেয়। প্রতিটি ভিসার ১ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত নেয় জমজম ইন্টারন্যাশনালের এমডি তনু। বিপরীতে ৬৫৯ জনকে মালয়েশিয়ায় পাঠায়। ২০২২ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬৫৯ জনের বিপরীতে জনপ্রতি ১ লাখ ৩৯ হাজার ৭শ টাকা করে ৯ কোটি ২০ লাখ ৬০ হাজার টাকা নিয়ে নেয়। কিন্তু যেসব বাংলাদেশিকে শ্রমিক হিসেবে মালয়েশিয়ায় পাঠিয়েছে তাদের কাউকে কাজ দিতে পারেনি। এমনকি থাকা-খাওয়ারও ব্যবস্থা করেনি। এদের মধ্যে অর্ধেকের বেশি শ্রমিকের ভিসার মেয়াদও শেষ হয়ে যায়। ফলে তাদের জেলে যেতে হয়। জেল খেটে ওই শ্রমিকরা বাংলাদেশে ফিরে আসে।
পুলিশ জানিয়েছে, চুক্তি অনুযায়ী, যেসব শ্রমিককে মালয়েশিয়ায় পাঠানো হয়েছে তাদের থাকা-খাওয়া এবং চাকরির ব্যবস্থা জমজম ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের এমডি তনু দায়িত্ব নিয়েছিলেন। কিন্তু শ্রমিকরা মালয়েশিয়ায় যাওয়ার পর তাদের সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। এরপর আরও ৭২৫ শ্রমিকের কাছ থেকে ৭ কোটি ৩৮ লাখ ৪২ হাজার টাকা নিলেও তাদের ভিসা দিতে পারেনি। একপর্যায়ে সে মালয়েশিয়ায় গিয়ে আত্মগোপন করে। দেশে থাকা শ্রমিকরা অনেকেই ঋণ নিয়ে জমিজমা বিক্রি করে টাকা দিলেও কেউ মালয়েশিয়ায় আর যেতে পারেননি। অন্যদিকে ফিরে আসা শ্রমিকদের টাকা ফেরত দেওয়া হয়নি। ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকরা জিএমজি ট্রেনিংয়ের গোলাম মাওলাকে টাকার জন্য চাপ দিতে থাকেন। কিন্তু তিনি যোগাযোগ করলে জমজম ইন্টারন্যাশনালের এমডি এসএম রহমান তনু যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। এরপর থেকে তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। তার প্রতিষ্ঠানটিও বন্ধ পাওয়া যায়।
জানতে চাইলে জিএমজি ট্রেডিং লিমিটেডের এমডি গোলাম মাওলা জানান, প্রতারক এসএম রহমান তনু, তার সহযোগী বাবুল হোসেন, নুর মোহাম্মদ তালুকদার, আলতাফ খান মিলে একটি চক্র গড়ে তুলেছে। আমি দীর্ঘদিন ধরে সুনামের সাথে রিক্রুটিং ব্যবসা করে আসছিলাম। জমজম ইন্টারন্যাশনালের এমডি তনু ও তার সহযোগিতা ১ হাজার ৩৮৪ জন লোককে মালয়েশিয়া পাঠানোর কথা বলে টাকা নিয়েছে। কিন্তু তারা সাড়ে ৮শ লোক পাঠাতে পারেনি। যাদের পাঠিয়েছে তাদের অর্ধেকের বেশি কাজ না পেয়ে ফেরত এসেছে। এ ঘটনায় আমি গুলশান থানায় মামলা করেছি। দীর্ঘদিন তনু মালয়েশিয়ায় পলাতক ছিল। গতকাল তাকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। তার সহযোগীরা এখনো পলাতক রয়েছে।

