ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই, ২০২৬

সংসদে অর্থমন্ত্রী

দুর্দশাগ্রস্ত পাঁচ ব্যাংকের গ্রাহকদের সুদসহ টাকা ফেরত দেওয়া হবে

রূপালী ডেস্ক
প্রকাশিত: জুলাই ৯, ২০২৬, ০৬:৩৯ এএম

আমানত ফেরত দিতে না পারা দুর্দশাগ্রস্ত পাঁচ ব্যাংকের গ্রাহকদের টাকা সুদসহ ফেরত দেওয়া হবে বলে সংসদে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

তিনি বলেছেন, সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর আমানতকারীদের ক্ষেত্রে কোনো ‘হেয়ারকাট’ হবে না। তবে এসব ব্যাংক লোকসানে থাকায় আমানত ফেরাতে সময় লাগবে।

গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদে কার্যপ্রণালি বিধি ৭১ অনুযায়ী জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণের নোটিসের জবাবে অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেন। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় একীভূত হওয়া সমস্যাগ্রস্ত পাঁচ ব্যাংকের আমানতকারীদের মুনাফা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। আমানতকারীদের গচ্ছিত অর্থের ওপর সুদ না দেওয়ার বিষয়টিই ব্যাংকিং ভাষায় ‘হেয়ারকাট’ হিসেবে পরিচিত।

তবে পরে সমালোচনা ও বিক্ষোভের মুখে এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের মুনাফা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানু ‘দেশের কয়েকটি ব্যাংকের লুট হওয়া টাকা ৭৫ লাখ গ্রাহকের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া এবং ওইসব ব্যাংক লুটেরাদের কঠোর শাস্তি প্রদান’ বিষয়ে অর্থমন্ত্রীর মনোযোগ আকর্ষণ করেন।

নোটিসে তিনি বলেন, কয়েকটি ব্যাংকে অনিয়ম, দুর্নীতি এবং মালিক পক্ষের অর্থ পাচারের কারণে লাখো আমানতকারী তাদের টাকা তুলতে পারছেন না। তিনি বলেন, একজন মানুষের টাকা ব্যাংকে পড়ে আছে। কিন্তু টাকার অভাবে সে চিকিৎসা করাতে পারছে না। সময়মতো টাকা না পাওয়ার কারণে অনেকের জীবন চলে গেছে।

তার নোটিসের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, বিষয়টির সঙ্গে আমি সম্পূর্ণ একমত। এটা একটি হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে বাংলাদেশে। একটি নির্বাচিত সরকার এ ব্যাপারে নীরব থাকতে পারে না।

অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের পর সম্পূরক প্রশ্নে রানু জানতে চান, গ্রাহকদের আমানতের ওপর ‘হেয়ারকাট’ প্রত্যাহার করে ৭৫ লাখ গ্রাহককে স্বস্তি দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা অর্থ মন্ত্রণালয়ের আছে কি না। জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, যারা আমানতকারী, তাদের আমানত সুদসহ ফেরত দেওয়া হবে, ইনশাআল্লাহ।

তিনি বলেন, একটু ধৈর্য ধরতে হবে। কারণ এই ব্যাংকগুলো সবগুলোই লোকসানের মধ্যে আছে এবং লোকসান কিন্তু প্রতিদিন বাড়ছে। লোকসানে থাকা ব্যাংক থেকে আমানত ফেরত দেওয়ার পাশাপাশি সুদ দেওয়া কঠিন কাজ হলেও সরকার আমানতকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণ করবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।

অর্থমন্ত্রী বলেন, এই ব্যাংকগুলোতে হেয়ারকাট থাকবে না। হেয়ারকাট হবে না। আমি যখন বলছি সুদসহ, সুতরাং হেয়ারকাটের তো প্রশ্ন আসছে না এখানে। মানুষ চিকিৎসার অভাবে মারা যাচ্ছে, মানুষ তার মেয়ের বিয়ে দিতে পারছে না। আমি প্রতিনিয়ত এই সমস্ত সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছি।

এই সমস্যা সমাধানে মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নেওয়ার কথা তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের আর্থিক খাতকে স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সরকার একটি সুসংগঠিত ও বহুমাত্রিক রেজুলেশন কাঠামো প্রতিষ্ঠা করেছে। এই কাঠামোর আইনি ভিত্তি হিসেবে ‘ব্যাংক রেজুলেশন আইন, ২০২৬’ প্রণয়ন করা হয়েছে। এই আইনের আওতায় সমস্যাগ্রস্ত পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’ গঠন করার কথা বলেন তিনি।

তবে রেহানা আক্তার রানুর বক্তব্যে একীভূত পাঁচ ব্যাংকের বাইরে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক ও আইএফআইসি ব্যাংকসহ কয়েকটি ব্যাংকের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ আসে।

অর্থমন্ত্রী তার জবাবে মূলত পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে গঠিত নতুন ব্যাংক, আমানত সুরক্ষা এবং অর্থ পুনরুদ্ধার কাঠামোর কথা বলেন। আমানত সুরক্ষা আইন ২০২৬-এর মাধ্যমে সুরক্ষিত আমানতের পরিমাণ সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে দুই লাখ টাকা করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

রেজুলেশনের আওতায় থাকা অবসায়নাধীন ব্যাংকগুলোর আমানতকারীরা বাংলাদেশ ব্যাংকের রেজুলেশন স্কিম অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে আমানতের অর্থ পাচ্ছেন বলেও জানান অর্থমন্ত্রী।

তিনি বলেন, আগে ফাইন্যান্স কোম্পানির আমানতকারীরা আমানত সুরক্ষা আইনের আওতায় ছিলেন না। এখন তাদেরও এই আইনের আওতায় আনা হয়েছে।

দায়ীদের শনাক্তে ‘ফরেনসিক অডিট’ : পাঁচ ব্যাংকের বিনিয়োগ অনিয়মে দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে ‘বিশেষ ফরেনসিক অডিট’ চলার কথা জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।

তিনি বলেন, অডিট প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তীতে সম্পদ পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে সৃষ্ট খেলাপি ঋণের টাকা এবং অবৈধভাবে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনতে ফৌজদারি মামলার পাশাপাশি দেওয়ানি পদ্ধতিও গ্রহণ করা হচ্ছে। অবৈধভাবে বিদেশে অর্থ পাচারের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ৩০টি ব্যাংক তাদের ঋণের অর্থ উদ্ধারের জন্য নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট স্বাক্ষর করে ৯টি আন্তর্জাতিক আইনি প্রতিষ্ঠানকে ‘নো উইন, নো ফি’ শর্তে নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।