ঢাকা শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৬

শুল্কের চাপে বেনাপোলে মাছ আমদানিতে ধস

বেনাপোল (যশোর) প্রতিনিধি
প্রকাশিত: জুলাই ২৫, ২০২৬, ০৬:০৭ এএম

নতুন অর্থবছর (২০২৬-২৭) থেকে মাছ আমদানির ওপর শুল্ক বাড়ানোর সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়েছে দেশের সর্ববৃহৎ স্থলবন্দর বেনাপোলে। বাজেট কার্যকরের পর থেকেই ভারত থেকে মাছ আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। অতিরিক্ত শুল্কের কারণে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় লোকসানের আশঙ্কায় অনেক ব্যবসায়ী মাছ আমদানি স্থগিত বা সীমিত করেছেন। এতে ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি বন্দরের শ্রমিক, পরিবহন খাত এবং সরকারের রাজস্ব আদায়েও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

আমদানিকারকদের দাবি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মাছ আমদানির মোট শুল্কহার ৪৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭০ শতাংশ করা হয়েছে। নতুন বাজেট কার্যকরের পরদিন থেকেই বেনাপোল কাস্টমস নতুন হারে শুল্ক আদায় শুরু করে। এর পর থেকেই বন্দর দিয়ে ভারতীয় মাছের আমদানি দ্রুত কমতে থাকে। তাদের আশঙ্কা, এতে বাজারে মাছের দাম বাড়ার পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব আয়ও কমে যেতে পারে। তাই দ্রুত এ সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন তারা।

বেনাপোল কাস্টমস সূত্র জানায়, আগে প্রতি কেজি মিঠা পানির মাছ আমদানিতে ৮৬ টাকা ১০ পয়সা শুল্ক দিতে হলেও এখন তা বেড়ে হয়েছে ১৩১ টাকা ৬০ পয়সা। অর্থাৎ কেজিপ্রতি প্রায় ৪৬ টাকা বেশি শুল্ক দিতে হচ্ছে। একইভাবে সামুদ্রিক মাছ ও রুই মাছের ক্ষেত্রে শুল্ক ৪৩ টাকা ১০ পয়সা থেকে বেড়ে ৬৬ টাকা ১০ পয়সা হয়েছে, যা কেজিপ্রতি প্রায় ২৪ টাকা বেশি।

কাস্টমস হাউসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেনাপোল কাস্টমসের রাজস্ব আদায়ের প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা, পরে তা সংশোধন করে ১১ হাজার ২৯০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু অর্থবছর শেষে আদায় হয় ৬ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা। ফলে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৪২ শতাংশ। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, উচ্চ শুল্কের কারণে আমদানি আরও কমে গেলে এই ঘাটতি বাড়তে পারে।

মাছ আমদানিকারক রহমত আলী বলেন, দেশে ভারতীয় মাছের ব্যাপক চাহিদা থাকলেও অতিরিক্ত শুল্কের কারণে আমদানি ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। লোকসানের ঝুঁকিতে অনেক ব্যবসায়ী আমদানি কমিয়ে দিয়েছেন। এতে ব্যবসা-বাণিজ্য ও রাজস্ব আদায় উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বর্তমান শুল্কহার বহাল থাকলে আমদানি আরও কমবে, বাজারে মাছের দাম বাড়বে এবং সরকারের রাজস্বও কমে যাবে।

আরেক ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম বলেন, নতুন বাজেটে শুল্ক ৭০ শতাংশ হওয়ায় ভারত থেকে মাছ আমদানি করে লাভ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। প্রতি চালানে অতিরিক্ত বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ছোট ও মাঝারি আমদানিকারকদের ব্যবসা বন্ধ করে দিতে হবে।

মাছ আমদানি কমে যাওয়ায় বন্দরের শ্রমিকদের কাজও কমেছে। শ্রমিকদের ভাষ্য, আগে নিয়মিত মাছবোঝাই ট্রাক খালাসের কাজ থাকলেও এখন দিনের পর দিন অপেক্ষা করেও কোনো ট্রাক পাওয়া যাচ্ছে না। এতে তাদের আয়-রোজগার কমে গেছে এবং পরিবার নিয়ে দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে। একই দাবি জানিয়েছেন ট্রাকচালকরাও। তাদের মতে, শুল্ক কমানো হলে আমদানি আবার স্বাভাবিক হবে।

বেনাপোল ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান বলেন, ট্রাকে থাকা পণ্যের ওজনের পরিবর্তে ট্রাকের চাকার সংখ্যার ভিত্তিতে শুল্ক নির্ধারণের কারণে আগেই মাছ আমদানি কমে গিয়েছিল। নতুন বাজেটে মাছের ওপর আরও শুল্ক বাড়ানোয় ব্যবসায়ীরা বড় সংকটে পড়েছেন। এতে ব্যবসা-বাণিজ্য ও রাজস্ব আদায় উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। শুল্কহার পুনর্বিবেচনা না করলে আমদানি আরও কমে যাবে এবং এর প্রভাব বাজার, ব্যবসা ও সরকারের রাজস্ব আয়ে স্পষ্টভাবে পড়বে।

বেনাপোল ট্রান্সপোর্ট মালিক সমিতির সভাপতি আতিকুজ্জামান সনি জানান, আগে প্রতিদিন কমবেশি ৩০ ট্রাক মাছ আমদানি হলেও এখন তা কমে মাত্র ৪ থেকে ৫ ট্রাকে নেমে এসেছে। ফলে পরিবহন খাতের অনেক সদস্য কার্যত বেকার হয়ে পড়েছেন।

স্থলবন্দরের মৎস্য নিয়ন্ত্রণ ও মান নিয়ন্ত্রণ দপ্তরের পরিদর্শক আসাওয়াদুল ইসলাম বলেন, বাজেট ঘোষণার আগে প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০ ট্রাক বিভিন্ন ধরনের মাছ আমদানি হলেও বাজেটের পর তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। গত অর্থবছরে আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় এক হাজার টন মাছ কম আমদানি হয়েছে। এবার আমদানি আরও কমে আসবে বলে তিনি মনে করেন।

বেনাপোল কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার মুক্তা চৌধুরী বলেন, শুল্ক বৃদ্ধির প্রভাব সম্পর্কে আমদানিকারকরাই ভালো বলতে পারবেন। তবে গত অর্থবছরে বেনাপোল কাস্টমস দিয়ে এক কোটি ২৬ লাখ ৭ টন মিঠা পানির এবং ৭৪ লাখ ৮১ টন সামুদ্রিক মাছ আমদানি হয়েছে। নতুন বাজেট কার্যকরের পর এ পর্যন্ত ৩৮৬ টন মিঠাপানির ও ১৯৪ টন সামুদ্রিক মাছ আমদানি হয়েছে।

ব্যবসায়ীদের দাবি, মাছ আমদানির ওপর বাড়তি শুল্কের কারণে ব্যবসা, কর্মসংস্থান ও রাজস্ব আদায়Ñ সব ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। দেশের বাজার ও ব্যাবসায়িক স্বার্থ বিবেচনায় সরকার দ্রুত এ সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করবেÑ এমন প্রত্যাশাই সংশ্লিষ্টদের।