ঢাকা সোমবার, ০১ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

মানসম্পন্ন বডিক্যাম ক্যামেরা সংগ্রহ নিয়ে সংশয়

মোস্তাফিজুর রহমান সুমন
প্রকাশিত: আগস্ট ৩১, ২০২৫, ০৮:৫২ এএম
ছবি- রূপালী বাংলাদেশ

আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সুষ্ঠু ভোটগ্রহণ ও কেন্দ্রের নিরাপত্তা জোরদার করতে সর্বাধুনিক বডি-ওর্ন ক্যামেরা (বডিক্যাম) ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নির্বাচনি দায়িত্বে নিয়োজিত পুলিশ কর্মকর্তা ও কনস্টেবলদের দেহে এসব ক্যামেরা বসানো থাকবে। সারা দেশে ৪৭ হাজার ভোটকেন্দ্রের জন্য এরই মধ্যে প্রয়োজনীয়সংখ্যক বডিক্যাম কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে ক্যামেরা কেনার প্রক্রিয়া এখনো খুব বেশি দূর অগ্রসর হয়নি। আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের আগে মানসম্পন্ন ও কার্যকর বডি-ওর্ন ক্যামেরা সংগ্রহ করা যাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে শিগগিরই সঠিক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন (ফিচার) ক্যামেরা নির্বাচন করা না হলে, শেষ সময়ে তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে নিম্নমানের যন্ত্র সরবরাহের আশঙ্কা তৈরি হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

স্বৈরাচার শেখ হাসিনার দোসর ২৪-এর জুলাই আন্দোলনে ছাত্র-জনতা হত্যাকারী আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সুবিধাভোগী আমলাদের সিন্ডিকেট এখনো সক্রিয় রয়েছে দুর্নীতির মাধ্যমে রাষ্ট্রের টাকা লুটপাট করতে। পলাতক সাবেক আইজিপি বেনজীরের ঘনিষ্ঠ বিতর্কিত এমডিএম বডি-ওর্ন ক্যামেরা (বডিক্যাম) ক্রয় টেন্ডারে অংশ নিয়ে নিম্নমানের যন্ত্র সরবরাহে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছেন।

আওয়ামী লীগের সাবেক অর্থমন্ত্রী লোটাস কামালের মেয়ে নাফিসা কামালের স্মার্ট টেকনোলজিস সিন্ডিকেটও সক্রিয়। পুলিশের দুর্নীতিবাজ একাধিক কর্মকর্তা যোগসাজশ করে গত সাড়ে ১৫ বছর লুটপাট করা কোম্পানিকে কাজ দিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা কমিশন খেতে চায়। পুলিশ টেলিকম বিভাগের মাধ্যমে বডিক্যাম ক্রয় টেন্ডারে স্বচ্ছতা না থাকলে এবং সরকার আগাম সতর্ক না হলে রাষ্ট্রের অর্থ নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন পুলিশ সদর দপ্তরের কর্মকর্তারা।

জানা গেছে, পুলিশের কাজে স্বচ্ছতা আনতে সর্বাধুনিক বডি ক্যামেরা সংযোজনের সুপারিশ করা হয়েছে। তার ভিত্তিতেই এই বডিক্যাম কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়ে এসব ক্যামেরা ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হয়েছে। কেন্দ্রে দায়িত্বে থাকা পুলিশ কর্মকর্তা ও কনস্টেবলদের বুকে এ যন্ত্র লাগানো থাকবে।  এসব ক্যামেরায় ভিডিও, অডিও, অ্যালার্ম সিস্টেম থাকবে। এ ডিভাইসের মাধ্যমে ভিডিও ধারণের পাশাপাশি সরাসরি দেখারও ব্যবস্থা থাকবে।

এর আগে ২০২১-২২ সালে পুলিশের জন্য প্রায় ১০ হাজার বডি-ওর্ন ক্যামেরা কেনা হয়েছিল। তবে স্থানীয় সরবরাহকারীরা চীনের প্রতিষ্ঠান ডয়িমন্তের তৈরি নিম্নমানের বডি ক্যামেরা গছিয়ে দেওয়ায় তা কাজে আসেনি। তারা ধাপে ধাপে এ ক্যামেরাগুলো সরবরাহ করেছিল। এবার যেন বডিক্যাম নিয়ে কোনো প্রশ্ন না ওঠে সরকার সে ব্যাপারটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভোটকেন্দ্রে পুলিশের বডি ক্যামেরার মাধ্যমে পাওয়া ভিডিও তিনটি স্থান থেকে পর্যবেক্ষণ করা হবে। এর মধ্যে সংশ্লিষ্ট থানা থেকে পুলিশ ফোর্সের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হবে। পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে জেলায় সক্রিয় সব বডি ক্যামেরা পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা থাকবে।

এ ছাড়া পুলিশ সদর দপ্তর সারা দেশে বডিক্যাম কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করবে। কোনো ভোটকেন্দ্র বা এলাকায় সমস্যা দেখা দিলে এ বডিক্যামের মাধ্যমে থানা, জেলা ও কেন্দ্রীয় মনিটরিং সেন্টারে সঙ্কেত পাঠাবে। শুধু তাই নয়, বডি ক্যামেরার মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করা সহজ হবে। এ প্রযুক্তির কারণে কেন্দ্রদখল, জাল ভোটসহ পেশিশক্তির মাধ্যমে ফলাফলে প্রভাবিত করার আশঙ্কা অনেকটা কমে যাবে।

তবে কাগজে-কলমে এত সব পরিকল্পনা করা হলেও সঠিক সময়ে মানসম্পন্ন বডি ক্যামেরা সংগ্রহ করা যাবে কি না, তা নিয়েই বেশ সংশয় তৈরি হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার ঘোষণা অনুযায়ী নির্বাচনের মাত্র ৬ মাস বাকি থাকলেও এখনো বডি ক্যামেরা ক্রয় প্রক্রিয়া একবারে প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। শুধু তাই নয়, ডিভাইস চূড়ান্ত না হওয়ায় বডি ক্যামেরা ব্যবহারে পুলিশ সদস্যদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রমও শুরু করা যাচ্ছে না।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রযুক্তিগত নানা দিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বডি ক্যামেরা চূড়ান্ত করার জন্য একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি কাজ করছে। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী খোদা বকশ চৌধুরী বিষয়টি তদারকি করছেন। বডি ক্যামেরা সংগ্রহের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে একটি প্রাথমিক কমিটি গঠন করা হয়। প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী খোদা বকশ চৌধুরী ও ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব ছাড়াও কমিটিতে আছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্ম সচিব, পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি (ফাইন্যান্স), অতিরিক্ত আইজিপি (লজিস্টিকস অ্যান্ড অ্যাসেট একুইজিশন), অতিরিক্ত আইজিপিসহ (পুলিশ টেলিকম) কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা এবং নির্বাচন কমিশনের প্রতিনিধি।

পুলিশ টেলিকম সূত্রে জানা গেছে, অতীতে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি কেনা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হওয়ায় বডি ক্যামেরা ক্রয় প্রক্রিয়ায় পুলিশ প্রশাসন সংশ্লিষ্ট হতে চাইছে না। 

জানা গেছে, এরই মধ্যে বডি ক্যামেরা সরবরাহের জন্য ৬টি প্রতিষ্ঠান আগ্রহ প্রকাশ করেছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- স্মার্ট টেকনোলজিস (হুয়াওয়ের প্রতিনিধি), এমডিএম (মটোরোলার প্রতিনিধি), হিকভিশন, হাইটেরা এবং ডাহুয়া সিকিউরিটি। স্মার্ট টেকনোলজিস (হুয়াওয়ের প্রতিনিধি) নিজস্ব কোনো বডিক্যাম নেই। তারা টিডিটেক থেকে বডিক্যাম তৈরি করে নেবে। এরই মধ্যে এসব প্রতিষ্ঠান তাদের প্রস্তাবনা উপস্থাপন ও যন্ত্র প্রদর্শন করেছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, বডিক্যাম সরবরাহে আগ্রহীদের মধ্যে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিতর্কিত প্রতিষ্ঠান স্মার্ট টেকনোলজি এবং এমডিএমও রয়েছে।

সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের যোগসাজশে এমডিএম (মটোরোলার প্রতিনিধি) পুলিশের রেডিও ডিভাইস-সংক্রান্ত যন্ত্রপাতি কেনাকাটায় অনিয়মের মাধ্যমে কয়েকশ’ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অথচ বিতর্কিত প্রতিষ্ঠানটি নতুন রূপে বডিক্যাম সরবরাহের কাজ পেতে তৎপর হয়ে উঠেছে। অভিযোগ উঠেছে, তারা অতীতের মতো এবারও ম্যানেজ করার চেষ্টা করছে।

উল্লেখ্য, প্রতিষ্ঠানটি সাবেক আইজিপি বেনজীরের আমলে পুলিশের টেলিকমের ৪২টি টেন্ডারের মধ্যে ৪১টির কাজ পেয়েছিল। আন্তর্জাতিক বিবেচনায় ৪-৫ গুণ বেশি মূল্যে মানহীন পণ্য দিয়ে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা লোপাট করেছে।

একইভাবে বডি ক্যামেরা সরবরাহের কাজ বাগিয়ে নিতে উঠেপড়ে লেগেছে সাবেক অর্থমন্ত্রী লোটাস কামালের মেয়ে নাফিসা কামালের সিন্ডিকেট হিসেবে পরিচিত প্রতিষ্ঠান স্মার্ট টেকনোলজিও। আওয়ামী লীগ আমলে আইসিটি-সংক্রান্ত কাজে এ প্রতিষ্ঠান আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। তাদের বিরুদ্ধে একের পর এক প্রকল্পের কাজ বাগিয়ে সরকারের বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নিলেও দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী কাজ না করার অভিযোগ রয়েছে। এই প্রতিষ্ঠান ২০১৪ সালে নির্বাচন কমিশনের জাতীয় পরিচয়পত্র প্রকল্পের কাজ পায়। এ ক্ষেত্রে বিদেশ থেকে উন্নত মানের কার্ড তৈরি করে আনার কথা থাকলেও স্থানীয়ভাবে নিম্নমানের কার্ড বানিয়ে সরবরাহ করে। সেগুলো এতই মানহীন ছিল, পরবর্তী সময়ে নির্বাচন কমিশন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে সেগুলো পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল। একই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নাফিসা কামালের সঙ্গে সিন্ডিকেট করে বিমা উন্নয়ন প্রকল্পের ৬ কোটি ৭০ লাখ ডলার বিদেশে পাচারের অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে বডি ক্যামেরা সরবরাহে আগ্রহ প্রকাশ করা কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান নিজেরা এ যন্ত্র উৎপাদন করে না। তারা কাজ পাওয়ার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হওয়ার পর প্রকৃত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করবে। এরপর প্রয়োজনীয় সংখ্যক ক্যামেরা তৈরি করে সরবরাহ করবে। এ ধরনের প্রতিষ্ঠান কাজটি পেলে একদিকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বডি ক্যামেরা না পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে, অন্যদিকে তড়িঘড়ি করে তৃতীয় পক্ষের কাছ থেকে মানহীন যন্ত্র সংগ্রহ করে সরবরাহের সুযোগ থাকবে।

প্রাপ্ত তথ্য বলছে, মালয়েশিয়া থেকে বডি ক্যামেরা আমদানি করে সরবরাহ করবে বলে জানিয়েছে একটি প্রতিষ্ঠান। এ ক্ষেত্রে তারা যে প্রতিষ্ঠানকে পার্টনার হিসেবে দেখিয়েছে, তাদের মালয়েশিয়ায় কোনো কারখানাই নেই। গত সরকারের আমলে প্রতিষ্ঠানটি পুলিশ টেলিকমের ওয়্যারলেস যন্ত্রাংশ সরবরাহের কাজ পেয়ে মালয়েশিয়ার লোকাল মার্কেট থেকে নকল পণ্য কিনে সরবরাহ করেছিল। এবারও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে পারে বলে আশঙ্কা অনেকের।

গত মঙ্গলবার পুলিশ টেলিকমের অতিরিক্ত আইজিপি এ কে এম আওলাদ হোসেন রূপালী বাংলাদেশকে জানান, বডি-ওর্ন ক্যামেরা ক্রয়সংক্রান্ত বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পুলিশ সদর দপ্তর তত্ত্বাবধায়ন করছে। এ বিষয়ে পুলিশ টেলিকম কোনো মন্তব্য করবে না। পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসেন রূপালী বাংলাদেশের লিখিত প্রশ্নের জবাব দেননি।