বাংলাদেশ যখন ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে স্মার্ট ইকোনমির দিকে এগোচ্ছে, তখন ২০২৬ সালে প্রবর্তিত তিনটি যুগান্তকারী আইন, সাইবার সুরক্ষা আইন, ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা আইন এবং টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) অধ্যাদেশ, দেশের ডিজিটাল কমার্স খাতের গতিপথ সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। তবে ৫ আগস্ট পরবর্তী রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিবর্তনের ফলে দেশের শীর্ষ ব্যবসায়িক সংগঠন ই-ক্যাব যে নেতৃত্ব সংকটে পড়েছে এবং বর্তমানে প্রশাসক দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে, তাতে এই আইনগুলোর সুফল পাওয়া এবং প্রয়োগের ক্ষেত্রে এক গভীর ও বহুমুখী সংকট তৈরি হয়েছে।
আইনি কাঠামো : উদ্যোক্তাদের জন্য কতটা সহায়ক?
ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা আইন : তথ্যের সার্বভৌমত্ব বনাম উদ্যোক্তার দায়
এই আইনটি নাগরিকের গোপনীয়তা রক্ষার বর্ম হলেও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য এটি এক ধরনের আইনি জটিলতা তৈরি করেছে। আইনের ধারা ৮ ও ৯ অনুযায়ী, প্রতিটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানকে ‘ডেটা ফিড-সিয়ারি’ বা তথ্যের জিম্মাদার হিসেবে গণ্য করা হবে। তথ্যের কোনো অপব্যবহার বা চুরি হলে তার দায়ভার এককভাবে উদ্যোক্তার ওপর বর্তাবে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো ধারা ৩৩, যেখানে তথ্য সুরক্ষায় ব্যর্থ হলে প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক টার্নওভারের ১% থেকে ৫% পর্যন্ত জরিমানা করার কঠোর বিধান রাখা হয়েছে। সেন্টার ফর ডিজিটাল কমার্স রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি (ঈউঈজঅ)-এর সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশে জরিমানার পরিমাণ সুনির্দিষ্ট থাকলেও, আমাদের এখানে টার্নওভারভিত্তিক জরিমানা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের দেউলিয়া করে দেওয়ার ঝুঁকি রাখে। বিশেষ করে ৫ লাখ ফেসবুকভিত্তিক (ঋ-পড়সসবৎপব) উদ্যোক্তার জন্য এটি একটি বিশাল আতঙ্ক, কারণ একটি সাধারণ স্মার্টফোন হারিয়ে গেলে বা হ্যাক হলেও তারা আইনের কঠিন মারপ্যাঁচে জড়িয়ে পড়তে পারেন।
সাইবার সুরক্ষা আইন : ডিজিটাল বিশ্বাস ও জালিয়াতি রোধ
এই আইনে জালিয়াতি রোধে ধারা ২৬-এ কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে, যা ক্রেতার আস্থা বাড়াবে। তবে সরবরাহকারী বা ডেলিভারি পার্টনারের ভুলের দায়ে বিক্রেতা যেন হয়রানির শিকার না হন, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যদিকে, ধারা ৩৫ অনুযায়ী মিথ্যা অভিযোগের বিরুদ্ধে বিক্রেতাকে যে আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে, তা প্রশংসার দাবি রাখে। ঈউঈজঅ-এর পরিসংখ্যান বলছে, সঠিক প্রয়োগে এ খাতে বছরে প্রায় ১,২০০ কোটি টাকার লেনদেন ঝুঁকি অন্তত ৬০% কমানো সম্ভব।
টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) অধ্যাদেশ : লজিস্টিকস ও নিরাপত্তা
ধারা ১৪ অনুযায়ী কুরিয়ার সার্ভিসের নজরদারি এবং ‘কল মাস্কিং’ প্রযুক্তি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এটি নারী গ্রাহকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করলেও কারিগরি বাস্তবায়নে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য বড় ধরনের ব্যয়ের কারণ হতে পারে।
আইসিটি সংগঠনগুলোর সংকট ও সম্মিলিত প্রচেষ্টার প্রয়োজনীয়তা
২০২৬-এর এই আইনগুলো কেবল ই-ক্যাব নয়, বরং ইঅঝওঝ, ইঅঈঈঙ, ওঝচঅই, ইঈঝ এবং নবগঠিত ইওঝঅ-এর জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। বর্তমানে প্রত্যেকটি সংগঠনের নিজস্ব ধারা বা পদ্ধতি রয়েছে সরকারের সঙ্গে আলোচনার জন্য। কিন্তু এই প্রেক্ষাপটে আলাদাভাবে কথা বলার চেয়ে একটি ‘কমন প্ল্যাটফর্ম’ বা আইসিটি স্টেকহোল্ডার এলায়েন্স থেকে দাবি তোলা এখন সময়ের দাবি।
সহযোগিতা বনাম নির্ভরশীলতা : একটি কৌশলগত পর্যালোচনা
আইটি ও ই-কমার্স খাতের বর্তমান বাস্তবতায় ই-ক্যাব বা বেসিসের মতো প্রতিষ্ঠিত সংগঠনগুলোর জন্য কোনো একক নতুন সংগঠনের ওপর পুরোপুরি ‘নির্ভরশীল’ হওয়া কোনো টেকসই সমাধান নয়।
অংশীদারিত্বের প্রয়োজনীয়তা : নির্ভরশীলতার চেয়ে সংগঠনগুলোর মধ্যে একটি শক্তিশালী কৌশলগত অংশীদারিত্ব বেশি কার্যকর। বড় নীতিনির্ধারণী সংকটে তারা এক টেবিলে বসবে, কিন্তু নিজেদের সাংগঠনিক স্বকীয়তা ও প্রশাসনিক স্বাধীনতা অক্ষুণœ রাখবে।
ভারসাম্য রক্ষা : প্রতিটি সংগঠনের নিজস্ব বিশেষজ্ঞ ক্ষেত্র (ঊীঢ়বৎঃরংব) রয়েছে। কোনো একক সংগঠনের ওপর নির্ভরতা নেতৃত্বের বিকেন্দ্রোয়নকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। সমাধান হওয়া উচিত একটি ‘কমন মিনিমাম এজেন্ডা’র ভিত্তিতে জোটবদ্ধ হওয়া, যেখানে প্রতিটি সংগঠন একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে।
ই-ক্যাব-এর নেতৃত্ব সংকট ও পরিসংখ্যানগত ঝুঁকি
৫ আগস্টের পর থেকে ই-ক্যাব প্রশাসক দ্বারা পরিচালিত হওয়ায় ৫ লাখ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা বর্তমানে অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছেন। ঈউঈজঅ-এর সংগৃহীত তথ্য মতে, ই-ক্যাব সদস্যদের বাইরে থাকা এই বিশাল উদ্যোক্তা গোষ্ঠী দেশের মোট ই-কমার্স খাতের প্রায় ৪০% জোগান দেয়। প্রশাসককে কেবল রুটিন মাফিক নির্বাচনের আয়োজন করলেই চলবে না; বরং এই ক্রান্তিকালে সদস্যদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকারের সঙ্গে জোরালো আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে।
উত্তরণের উপায় ও আমার সুপারিশ
১. ডিজিটাল বিজনেস আইডি (উইওউ) সহজীকরণ : আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে ৫ লাখ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাকে দ্রুত আইনি বৈধতার আওতায় আনতে হবে।
২. যৌথ আইনি সহায়তা কেন্দ্র : ইঅঝওঝ, ব-ঈঅই, ইঅঈঈঙ এবং ইওঝঅ যৌথভাবে একটি লিগ্যাল সেল গঠন করতে পারে, যা উদ্যোক্তাদের আইনের জটিল ধারাগুলো সহজ বাংলায় ব্যাখ্যা করবে।
৩. স্মার্ট ট্যাক্স সুবিধা ও ডিজিটাল কর্তৃপক্ষ : আইন মান্যকারী উদ্যোক্তাদের ট্যাক্স রিবেট দেওয়া এবং প্রস্তাবিত ‘ডিজিটাল কমার্স অথরিটি’তে স্টেকহোল্ডারদের সরাসরি প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা।
৪. যৌথ সাইবার বিমা : ডেটা ব্রিচ বা জালিয়াতির আর্থিক ঝুঁকি মোকাবিলায় একটি সাশ্রয়ী জাতীয় সাইবার ইন্স্যুরেন্স স্কিম চালু করা।
৫. মেটা-র সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনা : আইসিটি জোটের মাধ্যমে ফেসবুক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করে স্থানীয় আইন অনুযায়ী সহজতর তথ্য সুরক্ষা ফিচার তৈরি করা।
৬. ব্যক্তিগত সচেতনতা ও প্রস্তুতি : আইন এখন চূড়ান্ত বাস্তবতা, তাই প্রস্তুত হওয়ার জন্য প্রথম এক বছর ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য একটি ‘সংশোধনমূলক’ বা গ্রেস পিরিয়ড দেওয়া উচিত।
২০২৬ সালের এই আইনগুলো যেন উদ্যোক্তাদের দমনের অস্ত্র না হয়ে উন্নয়নের হাতিয়ার হয়। সরকার এবং ই-ক্যাব-এর বর্তমান প্রশাসনকে মনে রাখতে হবে ৫ লাখ ক্ষুদ্র প্রাণের জীবিকা আর কোটি গ্রাহকের আস্থা এই ভারসাম্যের ওপরই টিকে আছে। তথ্যের স্বচ্ছতা এবং আইনের মানবিক প্রয়োগই হবে স্মার্ট বাংলাদেশের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।

