× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

মীর আব্দুল আলীম, সাংবাদিক, কলামিস্ট

প্রকাশিত: মে ১৫, ২০২৬, ০৬:২৯ এএম

ধর্মনিরপেক্ষতার পিঠে রাজনীতির ছুরি : সীমান্তের ওপারে উগ্রতার আস্ফালন

মীর আব্দুল আলীম, সাংবাদিক, কলামিস্ট

প্রকাশিত: মে ১৫, ২০২৬, ০৬:২৯ এএম

ধর্মনিরপেক্ষতার পিঠে রাজনীতির ছুরি : সীমান্তের ওপারে উগ্রতার আস্ফালন

দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে ধর্ম ও রাজনীতি যখন সমান্তরাল রেখায় চলে, তখন তার প্রভাব কেবল একটি দেশের সীমান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। সম্প্রতি ভারতের পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের উদ্দেশ্যে ধর্মীয় মেরুকরণ এবং উগ্র সাম্প্রদায়িক বয়ান যেভাবে ছড়িয়ে পড়ছে, তা দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে শুভেন্দু অধিকারীর মতো নেতাদের আক্রমণাত্মক অবস্থান ও সংখ্যালঘুদের লক্ষ্য করে দেওয়া উসকানিমূলক বক্তব্য কেবল ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, বরং তা প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জনমনেও তীব্র মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে। আর এ বিষয়ের আলোকে ১৩টি পয়েন্টের বিস্তারিত পর্যালোচনায় যেতে চাই।

১. উগ্র সাম্প্রদায়িকতার রাজনৈতিক বিবর্তন ও ক্ষমতার মোহ : ভারতে বর্তমানে ধর্মকে রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের এক বিপজ্জনক প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। নির্বাচনি বৈতরণী পার হতে সংখ্যালঘুদের ‘শত্রু’ হিসেবে দাঁড় করানোর এই অপচেষ্টা গণতান্ত্রিক ভারতের দীর্ঘদিনের ধর্মনিরপেক্ষ ভাবমূর্তিকে বিশ্বদরবারে ধূলিসাৎ করছে। যখন কোনো রাজনৈতিক নেতৃত্ব জনসেবার চেয়ে বিভাজনের মন্ত্রকে গুরুত্ব দেয়, তখন রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো নড়বড়ে হয়ে পড়ে। যা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রযন্ত্রের কার্যকারিতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে।

২. পশ্চিমবঙ্গের ভূরাজনৈতিক স্পর্শকাতরতা ও সীমান্তের প্রভাব : পশ্চিমবঙ্গ বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী হওয়ায় এখানকার যেকোনো সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা সরাসরি আমাদের দেশে গভীর প্রভাব ফেলে। যখন কোনো দায়িত্বশীল রাজনৈতিক নেতা প্রতিবেশী দেশের সংবেদনশীলতা বিচার না করে উগ্রতা ছড়ান, তখন তা দুই দেশের সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় এক ধরনের অদৃশ্য উত্তেজনা তৈরি করে। এই উত্তেজনা কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করে।

৩. মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন ও নাগরিক নিরাপত্তাহীনতা :  রাজনীতির ময়দানে যখন বিশেষ কোনো ধর্মাবলম্বীদের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয় এবং তাদের ওপর প্রাতিষ্ঠানিক বা অপ্রাতিষ্ঠানিক নির্যাতন চালানো হয়, তখন তা মানবতার চূড়ান্ত পরাজয় হিসেবে গণ্য হয়। শুভেন্দু অধিকারীর মতো নেতাদের বক্তব্যে যেভাবে নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর ঘরবাড়ি ও জীবিকাকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে, তা কেবল অমানবিকই নয়, বরং সভ্য সমাজের কলঙ্ক। এই ধরনের নিপীড়ন মানুষকে অধিকারহীন করার মাধ্যমে তাদের মধ্যে এক গভীর ক্ষোভ ও বিদ্রোহী সত্তার জন্ম দেয় যা রাষ্ট্রীয় সংহতির জন্য হুমকি।

৪. দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক ছায়া ও আস্থার সংকট : বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিদ্যমান বাণিজ্যিক, সাংস্কৃতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক এই ধরনের উগ্রবাদী আচরণের ফলে ভয়াবহভাবে বাধাগ্রস্ত হতে পারে। সাধারণ জনগণের মধ্যে যখন ওপার বাংলার ভাইদের ওপর নির্যাতনের খবর পৌঁছায়, তখন দুই দেশের মধ্যকার স্বাভাবিক বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে ফাটল ধরে এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক সমঝোতাগুলো কার্যকর করা কঠিন হয়ে পড়ে। সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমতা, কিন্তু উগ্র সাম্প্রদায়িক রাজনীতি যখন সেই ভিত্তিকে আক্রমণ করে, তখন দশকের পর দশক ধরে গড়ে তোলা কূটনৈতিক অর্জনগুলো নিমিষেই ধুলায় মিশে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। যা কোনো দেশের জন্যই কল্যাণকর নয়।

৫. ঘৃণা ছড়ানোর ডিজিটাল অপকৌশল ও সাইবার উগ্রবাদ : আধুনিক যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে সুপরিকল্পিতভাবে ‘হেট স্পিচ’ বা ঘৃণা ছড়ানো হচ্ছে। এই ডিজিটাল উগ্রবাদ বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মনে বিষবাষ্প ছড়িয়ে দিচ্ছে, যারা ইতিহাসের সত্য না জেনে অন্ধভাবে বিদ্বেষের চর্চা করছে। উগ্র নেতারা যখন মাইক্রোফোন হাতে জনসভায় বিদ্বেষ ছড়ান, তা ইন্টারনেটের মাধ্যমে মুহূর্তেই কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে যায় এবং একটি কৃত্রিম বিভাজন তৈরি করে। এ ধরনের তথ্য-সন্ত্রাস কেবল সামাজিক শান্তি বিনষ্ট করে না, বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি মনস্তাত্ত্বিক ব্যাধি হিসেবে আবির্ভূত হয়, যা আগামী কয়েক দশকের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে। এটি সুস্থ সমাজ বিনির্মাণের প্রধান অন্তরায়।

৬. আঞ্চলিক নিরাপত্তার ঝুঁকি ও উগ্রবাদের চেইন রিঅ্যাকশন : সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বা অস্থিরতা কখনোই এক সীমান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। ভারতের অভ্যন্তরে এই উগ্রতা প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোতেও মৌলবাদী ও উগ্রপন্থি শক্তিকে সুপ্ত সুযোগ করে দিতে পারে। কোনো এক অঞ্চলের রাজনৈতিক অস্থিরতা আগুনের স্ফুলিঙ্গের মতো ছড়িয়ে পড়ে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতেও অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে পারে, যা সামগ্রিক আঞ্চলিক নিরাপত্তাকে এক ভয়াবহ হুমকির মুখে ফেলে।

৭. অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার পথে অন্তরায় ও বিনিয়োগের ক্ষতি : অস্থির রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক পরিবেশে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। ভারত ও বাংলাদেশের বিশাল বাজার যখন ধর্মীয় উত্তেজনায় ম্লান হয়ে যায়, তখন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান এবং উন্নয়নের গতিপথ নি¤œমুখী হতে বাধ্য। ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য প্রয়োজন একটি শান্তিপূর্ণ ও স্থিতিশীল সামাজিক পরিবেশ, কিন্তু ক্রমাগত দাঙ্গা ও বিদ্বেষের হুমকি বিনিয়োগকারীদের আস্থায় ফাটল ধরায়।

৮. ধর্মনিরপেক্ষতার দার্শনিক সংকট ও সাংবিধানিক অবক্ষয় : ভারতের সংবিধানের মূল ভিত্তি ধর্মনিরপেক্ষতা আজ এক ঐতিহাসিক সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। রাজনৈতিক নেতাদের মুখে যখন ধর্মের দোহাই দিয়ে প্রকাশ্যে বিভাজন করা হয়, তখন রাষ্ট্রের বিচার বিভাগ, পুলিশ ও প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে গভীর সংশয় তৈরি হয়। সংবিধান যখন কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকে এবং ক্ষমতার জোরে একদেশদর্শী আইন বা আচরণের প্রচলন শুরু হয়, তখন রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি ধসে পড়ে।

৯. মনস্তাত্ত্বিক বিভাজন ও প্রতিবেশীর প্রতি আস্থার বিনাশ : সাধারণ হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে যুগের পর যুগ ধরে চলা সামাজিক আস্থা আজ রাজনীতির বলিকাষ্ঠে পরিণত হচ্ছে। রাজনৈতিক নেতার একটি উসকানিমূলক উক্তি প্রতিবেশীদের মধ্যে সন্দেহের দেয়াল তুলে দিচ্ছে, যারা হয়তো একে অপরের উৎসব-পার্বণে যুগ যুগ ধরে শামিল হতো। এই মনস্তাত্ত্বিক ক্ষত সারিয়ে তোলা অত্যন্ত দুঃসাধ্য কাজ, কারণ ভীতি ও ঘৃণা একবার হৃদয়ে স্থান পেলে তা সহজে মুছে যায় না।

১০. আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়বদ্ধতা ও নীরবতার পরিণাম : দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি বজায় রাখতে হলে এই উগ্র সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে বৈশ্বিক জনমত গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র দাবিদার দেশটিতে যখন মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়, তখন আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর নীরবতা বিস্ময়কর। শান্তি রক্ষার দায়িত্ব কেবল রাষ্ট্রের নয়, বরং বিশ্বের সচেতন প্রতিটি মানুষের বিবেকী দায়িত্ব।

১১. ভারত সরকারের নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়বদ্ধতা : সংবিধানের মর্যাদা রক্ষায় ভারত সরকারের উচিত তার সংবিধানের ৪২তম সংশোধনীর মাধ্যমে যুক্ত ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ (ঝবপঁষধৎ) শব্দটির মর্যাদা যেকোনো মূল্যে রক্ষা করা এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তম্ভে তার প্রতিফলন ঘটানো। উসকানিমূলক বক্তব্যের বিরুদ্ধে আইনি কঠোরতা অবলম্বন করা উচিত রাষ্ট্রের। 

 ১২. সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ : প্রশাসনের উচিত ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের জানমাল ও উপাসনালয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, যাতে রাষ্ট্রের ওপর জনগণের আস্থা অটুট থাকে। ভারতের জনগণের সচেতনতা ও সংহতিও জরুরি। সাধারণ ভারতীয়দের মনে রাখা উচিত যে, ভারতের শক্তি তার বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য (টহরঃু রহ উরাবৎংরঃু); তাই বিভাজনের রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করে প্রতিবেশী সুলভ সৌহার্দ্য বজায় রাখা তাদের নাগরিক দায়িত্ব। ভোটের অঙ্কে ধর্মকে ব্যবহারকারী নেতাদের চিনে নেওয়া এবং উন্নয়নের রাজনীতির পাশে দাঁড়ানোই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান।

১৩. বাংলাদেশের জনগণের ধৈর্য ও দায়িত্বশীল আচরণ : কোনো উসকানি কিংবা বাজে প্ররোচনায় পা না দেওয়া। ভারতের অভ্যন্তরীণ কোনো ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে কোনো ধরনের সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বা অনাকাক্সিক্ষত প্রতিক্রিয়া দেখানো থেকে বিরত থাকাতে হবে। বাংলাদেশের ঐতিহ্যই হলো সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি; তাই ওপারে যা-ই ঘটুক না কেন, এদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষায় সাধারণ মানুষকে অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করতে হবে।

রাজনীতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের কল্যাণ, সহাবস্থান ও ভ্রাতৃত্ব ঘৃণা বা বিভাজন নয়। প্রতিবেশী ভারতের কোনো অংশে যখন রাজনৈতিক স্বার্থে মানবিক মূল্যবোধকে বিসর্জন দেওয়া হয়, তখন তা গোটা অঞ্চলের জন্য এক কালো মেঘের অশনিসংকেত বয়ে আনে। সংঘাত কোনো সমস্যার সমাধান হতে পারে না; বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আলোচনার মাধ্যমেই একটি শান্তিময় দক্ষিণ এশিয়া গড়া সম্ভব।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!